—আজ্ঞে তা বলতে পারিনে। বহুদিন আসছেন না তিনি। চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এ-বাড়ির।
সে কি!
আকাশ থেকে পড়লো যেন ভূতনাথ। তার সঙ্গে এ-বাড়ির সম্পর্ক তো ব্ৰজরাখালকে কেন্দ্র করেই। ব্রজরাখালই যদি চলে গেল তা হলে এখানে থাকবে সে কোন্ অধিকারে। ওদিকে ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসও যদি উঠে যায় তা হলে সে যে সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে! কেমন যেন অসহায় বোধ করলো ভূতনাথ নিজেকে। আবার সেই গ্রামে ফতেপুরেই ফিরে যেতে হবে নাকি। খাবে কী সে সেখানে। থাকবেই বা কোথায়। এতদিনে সে বাড়ি কী অবস্থায় আছে কে জানে। পাশের বিপিন কলুদের তেঁতুল গাছের জঙ্গল বোধহয় আরো বেড়ে বেড়ে তাদের বাড়িটাও গ্রাস করে নিয়েছে। সেইখানে বাঘের আড্ডা হয়েছে হয় তো। হয় তো সাপ ক্ষোপের বাসা হয়েছে। রান্নাঘরটা তো ছিল বাঁশঝাড়ের লাগোয়া। বাঁশগুলো কে আর কাটছে! বাঁশগুলো সব হয় তো নুয়ে পড়েছে খড়ের চালের মাথায়। উই টিপিতে ঢেকে গিয়েছে দাওয়া। পিসীমা’র অত যত্নের রান্নাঘর। গোবর লেপে লেপে কী সুন্দরই বাহার করতে পিসীমা। তারপর গোবর লেপা হলে মাটির দাওয়ার ওপর ঘুটের আগুনে পোরের ভাত চাপিয়ে দিতো। কত বছর খায়নি পপারের ভাত। কাঁঠাল বিচি ভাতে, পোরের ভাত আর সরের ঘি!.. কিন্তু সে কথা থাক, ব্রজরাখাল তাকে ফেলে গেল কোথায়? কেনই বা গেল। বংশীকে জিজ্ঞেস করলে সে-ও বিশেষ কিছু বলতে পারে না।
ওই ঘরটার মধ্যেই কাটলো সমস্তটা দিন।
একবার ডাক্তারবাবু এসে দেখে গেল ভূতনাথকে। কোট ধুতি বুট জুতো পরা ডাক্তার। কী একটা ওষুধও বুঝি নিয়ে এল বংশী। বললে—খেয়ে ফেলুন দিকি ওষুধটা বেশি তেতো লাগলে এই ফলগুলো খাবেন—বেদানা, আঙুর, নাশপাতি কুঁচিয়ে কেটে এনেছে রেকাবিতে। বললে—আপনার জন্যে আজ্ঞে বকুনি খেতে হলো ছোটমা’র কাছে।
–কেন?
বংশী বললে—আমার হয়েছে জ্বালা শালাবাবু, চিন্তা কাজ করবে না তা-ও আমার দোষ, এই যে আপনি রুগী মানুষ বাড়িতে এসেছেন, ফলগুলো কুঁচিয়ে রাখতে পারে না ও, ভাড়ারে গিয়ে যদি রাঙাঠাকমাকে বলি তত শত হেনস্থা হবে আমার, ফিরিস্তি দাও কি হবে, কে খাবে, কেন খাবে, কী অসুখ, শালাবাবু তোর ছোটমা’র কে হয়। হ্যাঁ ত্যান, ছোটমা তাই চিন্তাকে দিয়েছিল ফল কুঁচোতে, অথচ ওর কাজ কী বলুন, আমার মতো কাজ করতে হতো তো বুঝতো। মেয়েমানুষের সোয়ামী থাকলে সেও কি বসিয়ে খাওয়াতে ওকে—না কি বলুন শালাবাবু—অন্যায্য কিছু বলেছেন ছোটমা।
ভূতনাথ ঢক ঢক করে ওষুধ খেয়েই মুখটা বিকৃত করে উঠলো। বললে-বড়ো তেতো ওষুধ বংশী।
—আজ্ঞে, খাঁটি ওষুধ তত তেতো হবেই, শশী ডাক্তারের সব খাটি ওষুধ কিনা, ছোটমা বলেছেন যত টাকা লাগে সব দেবো আমি, রোগ সারা চাই—সস্তা ওষুধ হলে চলবে না। তা ছোটমা’রও তো ক’দিন থেকে মেজাজ ভালো যাচ্ছে না কি না।
–কেন? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে।
—ছোটমা যে নেকাপড়া জানা মেয়ে শালাবাবু, মেজমা’র মত নয় তো.যে দিন-রাত কেবল বাঘবন্দি খেলবে, কি বড়মা’র মতন নয় যে, দিনের মধ্যে চৌষট্টিবার চানই করছে কেবল, কেবল সাবান আর জল ঘটছে, ছোটমা হলো মনিষি যাকে বলে—কিন্তু পড়েছেন আজ্ঞে ছোটবাবুর মতন মানুষের হাতে, কপালের লেখন কে খণ্ডাবে বলুন। এই যে এতদিন পরে বাড়ি এলেন, মানুষটা পড়েছিলেন বাড়ির বাইরে সেই জানবাজারে নতুন-মা’র বাড়িতে, কেমন আছেন, ছোটমা’র দেখতেও তো ইচ্ছে হয়, কিন্তু না-ডেকে পাঠালে সে-হুশও নেই, শেষে ডেকে আনলুম ছোটমা’র ঘরে। ছোটবাবু তখন বেরোচ্ছেন, কাপড় কুঁচিয়ে দিয়েছি, জুতো পরিয়ে দিয়েছি, রুমাল দিয়েছি, আংটি দিয়েছি, টাকাকড়ি গুছিয়ে দিয়েছি, সব শেষে বললুম—ছোটমা একবার ডাকছিলেন আপনাকে ওপরে।
ছোটবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন। বললেন—কেন?…আচ্ছা চল যাচ্ছি—যাবার মুখে এলেন ঘরে। আমিও এলুম পেছন পেছন। সব শুনলুম আড়ি পেতে। ছোটবাবু বললেন-ডেকেছিলে নাকি আমাকে? ছোটমা গলায় আঁচল দিয়ে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে পেন্নাম করলেন। বললেন—কেমন আছো?
ছোটবাবু জিজ্ঞেস করলেন—কিছু দরকার আছে কি?
—না, দরকার আর কি, এমনি একবার দেখতে ইচ্ছে হলো, অনেকদিন দেখিনি। আজ আমার হিতসাধিনী ব্রত।
ছোটবাবু হো হো করে হাসলৈন।—আবার তোমার সেই ন্যাকামি আরম্ভ হলো।
ছোটমা কিছু কথা বললেন না। ছোটবাবু রেগে গেলেন বুঝি। বললেন—সেই কান্না আর কান্না, কেন, হাসতে পারো না, হাসতে পারে না আর সব বউদের মতে, দেখো তত বড়বৌঠান, মেজবৌঠান সবাই কেমন হেসে খেলে আছে, হাসোগাও–যা খুশি করে—যা দু’চক্ষে দেখতে পারি না তা-ই হয়েছে।
—কিন্তু হাসি যে আমার আসে না।
—কেন আসে না? কী হয়েছে তোমার?
—কিন্তু তুমিই কি হাসো-এ-ঘরে তোমার হাসি তো দেখিনি কখনও? অথচ শুনতে পাই তুমি ভারী আমুদে লোক, আমি কী দোষ করলুম বলতে পারো?
—তার কৈফিয়ৎ তোমার কাছে দিতে হবে নাকি আমি, চললুম। এখন সময় নেই তোমার ন্যাকামি শোনবার বলে ছোটবাবু ফিরছিলেন।
ছোটমা সরে এসে তাড়াতাড়ি ছোটবাবুর চাদরের খুটটা ধরলেন। বললেন–না গেলেই নয়?
ছোটবাবুর ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছিলো বোধ হয়। ল্যাণ্ডোগাড়ি জোতা রয়েছে, একবার উঠলেই টগবগ করে ছুটতে আরম্ভ করকে ঘোড়া দুটো। ওদিকে নেশার সময় বয়ে যাচ্ছে, জানি তো সব, নতুন-মা গেলাশ সাজিয়ে বসে থাকবে কি না, আর ছোটবাবুও মেজাজী লোক, সব কাজ ঘড়ি ধরে, নেশা মাথায় চড়ে গেলে আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না আজ্ঞে। তা ছোটবাবু একবার শুধু ফিরে তাকালেন ছোটমা’র দিকে। ছোটমা আবার বললেন-না-ই বা গেলে আজ সেভেনে।
