–তা কি আমি জানি? না ছোটমা জানেন! ছোটমা আমাকে বললে—যা বংশী তুই একবার জানবাজারে যা একবাটি জল নিয়ে আর দেখে আসিস বাবু কেমন আছেন। তা সেই অন্ধকারেই গেলাম আজ্ঞে জানবাজারে। গেলাম মরতে মরতে গিয়ে দেখি সে এক কাওছোটবাবু শুয়ে আছে পা ভেঙে, খুব বেশি নাকি খেয়ে ফেলেছিলেন, মাথার ঠিক ছিল না, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা ফস্কে পড়ে গিয়েছেন—আমাকে দেখে কী রাগ, বললেন—বংশী তোকে বারণ করেছি না-এ-বাড়িতে আবার এসেছিস।
ছোটবাবুর রাগের মাথায় কিছু উত্তর দিতে নেই। তা হলেই আরো রেগে যাবেন। কিছুই বললাম না, চুপ করে রইলাম। আস্তে আস্তে পায়ের কাছে বাটিটা নিয়ে ধরলাম গিয়ে। ছোটবাবু পা সরিয়ে নিলেন। বললেন—কে তোকে আসতে বলেছে এখেনে? বেরো এখান থেকে—তবু কিছু উত্তর দিলাম না। মাথা হেঁট করে চুপ করে বসে রইলাম। জানি কথা বললে আরো রাগ চড়ে যাবে। তারপর খানিক পরে ছোটবাবু বললেন—পায়ে একটু হাত বুলিয়ে দে তো।
বুঝলাম এবার ঘুম আসবে। তারপর ছোটবাবু যেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছেন, অমনি পায়ের আঙুলটা টপ করে জলে ছুঁইয়ে নিলাম আজ্ঞে—কিন্তু জলটা নিয়ে চলে আসছি হঠাৎ দেখি সামনে নতুন-মা
ভূতনাথ বললে-নতুন-মা কে?
—আজ্ঞে ওই চুনী দাসী, ওকে আমরা নতুন-মা বলি কি না, তা আমাকে দেখেই নতুন-মা বলে উঠলো-বংশী তুই কখন এলি?
বললাম—বাবু কাল বাড়ি যাননি তাই দেখতে এসেছিলাম আজ্ঞে।
—হাতে কী?
–আজ্ঞে ছোটমা’র আজ নীলের উপোস গিয়েছে কি না।
নতুন-মা’র হাতে ছিল পানের ডিবে। দিনরাত পান খায় নতুন-মা, এক মুখ পান, ভালো করে চেয়ে দেখলাম নতুন-মা যেন আরো ফরসা হয়েছে, আরো মোটা হয়েছে, এক গা গয়না, নাকে নাকছাবিটা চকচক করছে।
নতুন-মা খানিক ভেবে বললে—হ্যাঁ রে বংশী তোর ছোটমা শুনেছে আমি মোটরগাড়ি কিনছি?
বললাম-হাওয়া-গাড়ি? কই শুনিনি তো?
—তোর ছোটমাও গাড়ি কিনবে নাকি? শুনেছিস কিছু?
সে-কথার উত্তর না দিয়ে চলেই আসছিলাম। ছোটমা বাড়িতে না-খেয়ে বসে আছেন। তাড়াতাড়ি সিঁড়ির কাছে এসেছি, নতুন-মা আবার ডাকলে-বংশী শুনে যা একবার!!
কাছে যেতেই নতুন-মা বললে—এই রাস্তা দিয়েই তো যাচ্ছিস, যাবার পথে ওই মোড়ের দোকানে একবার খবর দিয়ে যাবি তো, বলবি আরো পনেরোটা সোডার বোতল যেন পাঠিয়ে দেয়, আজ রাতটা ওতেই চলে যাবে। কাল সকালবেলা আবার খবর দেবো, আর দু’ সের বরফ ওই সঙ্গে। এই নে টাকা—বলে তিনটে টাকা দিলে আমার হাতে।
ভূতনাথ বললে—পনেরো বোতল সোড়া! অত সোড়া কী করবে বংশী?
বংশী হাসলো। বললে—মদ খাবে আজ্ঞে, কপালে ভাত জুটতো না যার এককালে, এখন সেই লোকের আজ ছোটবাবুর দৌলতে—
হঠাৎ সুবিনয়বাবু ঘরে ঢুকলেন—আমাকে ডাকছিলে নাকি ভূতনাথবাবু? না, না, উঠতে হবে না।
ভূতনাথ উঠে বসে বললে—আমি তো একটু ভালো হয়েছি, বড়বাড়ি থেকে ওঁরা পাল্কি পাঠিয়েছেন—তাই ভাবছি
সুবিনয়বাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন—তা হলে বেশ তো …কিন্তু জবা মাকে একবার খবর দাও। তার অনুমতিটা একবার-–ওরে রতন।
সেদিন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিস থেকে পাল্কি করে যেতে যেতে বার-বার মনে হয়েছিল বটে যে, জবা যাবার সময় একবার দেখা করতেও এল না! কিন্তু আর একটা দুর্বার আকর্ষণে ভূতনাথ তখন সে-অপমানও ভুলতে পেরেছে। অসভ্য ছোটলোকের মতনই তো ব্যবহার করেছে সে জবার সঙ্গে। অমন ব্যাপারের পর ভূতনাথেরও তো লজ্জার আর সীমা ছিল না।
মাধববাবুর বাজার পেরিয়ে ভূতনাথের পাল্কি তখন দুলতে দুলতে চলেছে। পাল্কি-বেহারাদের মুখের সেই বোল এখনো যেন এত বছর পরেও কানে এসে বাজে—হি-তাল, হি-তাল, হিন-তাল, হিন্-তাল,—হি-তাল, হি-তাল, হিন্-তাল হিন্-তা–ল—ল…
পাল্কি এসে সদর দরজা দিয়েই ঢুকলে বটে। কিন্তু তারপর কোথা দিয়ে কোথায় চললো ঠিক ধরা গেল না। আস্তাবলবাড়ি, রান্নাবাড়ি, ভিস্তিখানা পেরিয়ে গিয়ে থামলো একেবারে বাড়ির দক্ষিণে। সে দিকটায় গিয়ে নজরে পড়ে থোপাদের কাপড় কাচবার জায়গা, বাগান, পুকুর। এদিকে কখনও আসেনি ভূতনাথ আগে।
বংশীর গলা কানে এল—এইবার পাল্কি নাবাও হলধরা। পাল্কি নামালে ওরা।
বংশী এসে দরজা ফাঁক করে মখমলের ঝালর-দেওয়া পর্দা সরিয়ে দিলে। মুখ বাড়িয়ে বললে—শালাবাবু এখানেই নামতে হবে আজ্ঞে।
দুর্বল শরীরটা ঠিক যুৎসই হয়নি এখনও। একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথাটা ঘুরে যায়। বংশী ধরলো এক পাশে। তারপর বললে—আমার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে চলুন।
প্রথমটা সিঁড়ির মুখে অন্ধকার। ছোটো ছোটো সিঁড়ি ভালো ঠাহর পাওয়া যায় না। তারপর ভেতরে ঢুকে বেশ ফুটফুটে। চলতে চলতে একটা জায়গায় উঠে বংশী একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলে। ছোটখাটো ঘরটা। এককালে বুঝি সাজানো ছিল এ ঘর। এখনও পালঙ আছে একটা। দেয়ালে পঙ্খের কাজ করা। উড়ন্ত পরী, বেশ-বাস অবিন্যস্ত। কোথাও পাখী উড়ে যাচ্ছে, মুখে তার রঙিন চিঠি। আরো কত কী আঁকা। দেয়ালের বালি খসে গিয়েছে জায়গায় জায়গায়। তবু ছবিগুলো ঠিক রুচিশীল বলা যায় না। চারদিকে চেয়ে দেখে ভূতনাথের দৃষ্টিতে কেমন কৌতূহল ফুটে উঠলো।
বংশী বললে—ছোটমা এই ঘরটাতেই আপনার থাকবার ব্যবস্থা করছেন আজ্ঞে। কোনো অসুবিধে হবে না আপনার এখেনে।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু ব্ৰজরাখাল যদি খোঁজে তোমাদের মাস্টারবাবু?
বংশী বললে—মাস্টারবাবু? তিনি তো আর আসেন না এখানে।
—সে কি! ব্রজরাখাল কোথায় গেল?
