—পায়রা?
–হ্যাঁ শালাবাবু, পায়রা, গেরোবাজ পায়রা, পশ্চিম থেকে নিলেমে কিনেছিল ভৈরববাবু দেড় শ’ টাকা দিয়ে একজোড়া, সেই পায়রা তিনবার লড়াই-এ জিতেছিল, ক’দিন থেকে পাওয়া যাচ্ছিলো না তাদের, মেজবাবু সকালবেলা উড়িয়ে দিয়েছে রোজকার মতে, বার কয়েক আকাশে চক্কর মেরে তারা যেমন ঘুরে আসে রোজ, সেদিন আর তেমন এল না, শ্যামবাজারের দিকে উড়ে গিয়েছিলো, তারপর কোথায় মিলিয়ে গেল—সন্ধ্যে পর্যন্ত দেখা নেই, মেজবাবুর মেজাজ খারাপ রইল ক’দিন ধরে, বেণীও সামনে যেতে ভরসা পায় না। শেষে পাওয়া গিয়েছে ছেনিবাবুর হাটখোলার মেয়েমানুষের ঘরে।
—সে কি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ শালাবাবু, পুলিশ এল, মামলা হলো, দু’ শ’ টাকা আদালতে গুণে দিয়েছে ছেনিবাবু-পরশু যে আমাদের বড়বাড়িতে তাই ধুমধাম হলো খুব, বেণীর দু’ টাকা বকশিশ হয়ে গিয়েছে, চাকরদের কাপড় হলো একখানা করে, মেজবাবু দলবল নিয়ে গঙ্গায় পানসি চালাতে গেলেন, সঙ্গে বড়মাঠাকরুণ, মেজমাঠকরুণ, ছোটমাঠাকরুণ সবাই গিয়েছিলো, নাচ-গান-বাজনা খানা-পিনা করে সমস্ত রাত কাটিয়েছেন, কিন্তু আমার মনটা ভালো ছিল না। কেবল ভাবছিলাম শালাবাবুর কী হলো!
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে-বদরিকাবাবুর খবর কী?
—তাকেও শুধোলাম আজ্ঞে, অত যে হৈ চৈ, তিনি সেই বৈঠকখানা ঘরে শেতলপাটির ওপর চিৎপটাং হয়ে শুয়ে আছেন, বললেন—ছোকরা বেঁচে গিয়েছে খুব, ভেগেছে নির্ঘাৎ—বলে টাকঘড়িটা একবার বড়ঘড়িটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নিলেন। পাগল না পাগল-কিন্তু আর দেরি নয়, আপনি চলুন আজ্ঞে, অনেক কাজ ফেলে এসেছি, ওদিকে আবার ছুটুকবাবুর বিয়ের তোড়জোড় হচ্ছে।
ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল। ছুটুকবাবুর বিয়ে?
—আজ্ঞে হ্যাঁ শালাবাবু, বড়মা ধরে বসেছেন, তার ভারী ইচ্ছে, নিজের তো ছুচিবাই, কবে আছেন কবে নেই, সখ হয়েছে বউ দেখে যাবেন, অধর ঘটকী ক’দিন ধরে যাতায়াত করছে, সিন্ধু বলছিল আসছে মাসে নাকি হবে। তা এখন থেকে তো তৈরি হতে হবে, ঘর-বাড়ি সাফ করা, কেনা-কাটা হাতে আর সময় কই বলুন।
রতন ঘরে এল। বললে-দিদিমণি বললেন, আপনার ওষুধ খাবার সময় হয়েছে কেরানীবাবু।
ওষুধ! ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কিন্তু দিদিমণি কোথায়?
—দিদিমণি ভাঁড়ার বার করে দিচ্ছেন।
—একবার ডেকে দিতে পারো? কিন্তু তারপর কী ভেবে বললে—আচ্ছা থাক, বাবু কোথায়?
—বাবুকে ডাকবে? বলে রতন চলে গেল। ভূতনাথ বংশীর দিকে ফিরে বললে—বড়বাড়ির আর কী খবর?
কী জানি ছোটবৌঠানের কথা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করতে কেমন লজ্জা করতে লাগলো ভূতনাথের। আর কখনও তার কাছে যাবার সুযোগ মিলবে কিনা কে জানে। আর একবার যদি তার কাছে যাওয়া যেতো।
বংশী বললে—লোচন ক’দিন ধরে আপনার খোঁজ করছিল।
—আমার খোঁজ করে কেন সে?
—আজ্ঞে আয় কমে গিয়েছে যে তার, তামাক আর কেউ খাচ্ছে, ছুটকবাবুর আসরে বরাদ্দ ছিল তিন সের তামাক হপ্তায়, তাও এদানি বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন—তামাক কেউ খায় না, বিড়ি খায় সবাই, তা সবাই যদি বিড়ি-সিগারেট ধরে, ওর চলে কী করে আজ্ঞে, লোচন আমাকে বলছিল সেদিন—শালাবাবুর সঙ্গে তোর এত ভাব, ওকে তামাক ধরাতে পারিস না, না হয় মাসে আটটা করে পয়সাই নেবো আমি—আর ওদিকে ইব্রাহিমেরও ভারী ভয় লেগে গিয়েছে।
-কেন?
বংশী হাসতে লাগলো। বললে—যে-যার ভাবনা নিয়ে আছে শালাবাবু, আমার ভাইটাকে আমি যেমন বড়বাড়িতে ঢোকাবার কত চেষ্টা করছি কিছুতেই পারছি না, ওরও তেমনি–
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলেও আবার কাকে চাকরিতে ঢোকাবে?
-আজ্ঞে চাকরিতে ঢোকাবে আর কাকে, নিজের চাকরি তাই-ই থাকে কিনা দেখুন, মুখ একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে ভাবনায়, অমন বাবরি চুল, পাঠানী দাড়ি, তাই বলে আর ভালো করে আঁচড়াচ্ছে না…
-কেন?
০০আজ্ঞে খবর সব পেয়েছে ও, খবর তো আর জানতে কারো বাকি নেই, বাবুরা যে হাওয়া-গাড়ি কিনছে, সে গাড়ি চালাতে তো আর কোচোয়ান লাগবে না, ঘোড়াও লাগবে না, হাওয়ায় চলবে, বিলেতে একরকম গাড়ি উঠেছে শোনেন নি?
—হাওয়া-গাড়ি। বাবুরা কিনবে নাকি হাওয়া-গাড়ি? কার কাছে শুনলি তুই?
বংশী বলতে গিয়েও যেন থেমে গেল। শেষে বললে—আজ্ঞে শুনেছি আমি ভালো লোকের মুখ থেকেই, চুনী দাসী—ছোটবাবুর মেয়েমানুষ…
চুনী দাসী! রূপো দাসীর মেয়ে। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে গিয়েছিলি নাকি চুনী দাসীর বাড়িতে?
—আজ্ঞে হ্যাঁ শালাবাবু, গিয়েছিলাম, ছোটবৌঠান যেতে বলেছিল বলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু না গেলেই ভালো হতো আজ্ঞে।
–কেন?
—আজ্ঞে ছোটমা’র সেদিন উপোস, উনি পুজো-আচ্ছা করেন তো মাঝে মধ্যে, নীলের উপোস ছিল সেদিন, নির্জলা একেবারে, সারাদিন ধকল গিয়েছে নিজের পূজোয়, রূপলাল ঠাকুর এসে যশোদাদুলালের পূজো করে গিয়েছে, দুপুর বেলা চিন্তা সেই নৈবিদ্যির থালা বারকোষে সাজিয়ে বার-বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে সরকারী পূজোবাড়ির সিধে পত্তোর সব নিয়ে একসঙ্গে বারবাড়ির লোক গিয়ে রূপলাল ঠাকুরের বাড়ি দিয়ে আসবে। আমি যেমন গিয়েছি সন্ধ্যেবেলা, দেখি ছোটমা’র মুখ একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে—তখনও জল খাওয়া হয়নি। বরাবর উপোসের পর আমি গিয়ে ছোটবাবুর কাছে জলের বাটি নিয়ে যাই, ছোটবাবু পায়ের বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে দেন, তারপর সেই জলটুকু খেয়ে ছোটমা উপোস ভাঙেন, কিন্তু ছোটবাবু সেদিন বাড়ি আসেন নি, ছোটমা’রও কিছু পেটে পড়েনি।
-কেন, ছোটবাবু বাড়ি আসেন নি কেন?
