ও-পাশের হ-ঘর থেকে ওদের গলার শব্দ কানে আসছে। জবা কথায় কথায় হাসছে। জবা এত হাসতে পারে। এত হাসির কথা হচ্ছে কার সঙ্গে। একবার মনে হলো চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখে আসে। আজ সবে ভাত খেয়েছে সে এতদিন পরে! এটুকু পরিশ্রমে কিছু ক্ষতি হবে না তার। কিন্তু লজ্জাও হলো। যদি ধরা পড়ে যায়। হঠাৎ মনে হলো যেন চেনা চেনা গলার আওয়াজ। যেন ননীলালের গলা! ঠিক সেইরকম কথার ভঙ্গী! ভারী কৌতূহল হলো দেখবার!
উঠতেই যাচ্ছিলো ভূতনাথ। আস্তে আস্তে নিঃশব্দে উঁকি দিয়ে দেখে আসতে যাচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ রতন আবার ঘরে ঢুকলো। কী একটা জিনিষ নিয়ে চলে যাবে। ভূতনাথ ডাকলো।
রতন ঘাড় ফেরালো-আমায় ডাকছেন নাকি কেরানীবাবু?
—হাঁ, শোনো এদিকে, কাছে এসো।
রতন কাছে সরে এল।
ভূতনাথ গলা নিচু করে জিজ্ঞেস করলেও-ঘরে কে এসেছে।
রতন বললেও খোকাবাবু।
—খোকাবাবু? খোকাবাবু কে? এ-বাড়ির কে হয়?
–এ-বাড়ির জামাইবাবু হবে, দিদিমণির সঙ্গে বিয়ে হবে!
–ওর আসল নামটা কী?
—তা জানিনে আমি—বলে রতন চলে গেল।
সেদিন রাত্রে শোবার আগে জবা একবার ঘরে এল। বললে। —ওষুধটা খাননি কেন?
ভূতনাথ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। কোনো জবাব দিলে। জবা ওষুধের শিশিটা নিয়ে কাছে এল। বললে-জ্বর ছেড়ে গিয়েছে বলে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন নাকি? নিন হাঁ করুন—
ভূতনাথের কী মনে হলো কে জানে। নিঃশব্দে ওষুধটা খেয়ে নিলো। কোনো ওজর-আপত্তি করলে না। কিন্তু হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসলো।
জবা ওষুধ খাইয়ে চলেই যাচ্ছিলো। হঠাৎ ভূতনাথ শাড়ির আঁচল চেপে ধরতেই কাঁধ থেকে কাপড়টা খসে পড়লে জবার।
একটি মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু এক মুহূর্তে দুজনই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। এক নিমেষের মধ্যে যেন একটা খণ্ড প্রলয় ঘটে গেল।
জবার মুখটা কঠিন হয়ে উঠেছে। ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে বললে—অভদ্র নীচ কোথাকার—বলে আর দ্বিরুক্তি না করে ঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।
পরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভাঙলো। কিম্বা হয় তো সারা রাত ঘুমই হয়নি ভূতনাথের। নিজের মনের মধ্যে সারারাত কেবল একটা দুশ্চিন্তাই জেগেছে যে, এ-বাড়িতে সে জবার কাছে মুখ দেখাবে কেমন করে। জবা তো শুধু নারী নয়, সে যে একাধারে তার মনিব। মাসে মাসে সাত টাকা মাইনে আর এক বেলা খাওয়ার পরিবর্তে সে এখানে দাসত্ব করে। মানুষের পক্ষে যা অপরাধই মাত্র, তার পক্ষে যে তা ঘোরতর অপরাধের সামিল।
যথারীতি সুবিনয়বাবু রোজ ভোরবেলা একবার ঘরে এসে কুশল প্রশ্ন করেন। সেদিনও এলেন। তখনও ভালো করে সকাল হয়নি। কিন্তু এসে বললেন—ভূতনাথবাবু তোমার একটা চিঠি আছে।
চিঠি! চিঠি ভূতনাথের বড় একটা আসে না কখনও। চিঠি তাকে কে লিখতে গেল। বিশেষ করে এই ঠিকানায়। সুবিনয়বাবু বললেন—একটি লোক চিঠি নিয়ে এসেছে—নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
চিঠিটা খুলে পড়তেই ভূতনাথের সমস্ত শরীরে রোমাঞ্চ হলো। ছোটবৌঠানের চিঠি!
সুবিনয়বাবু বললেন—তা হলে রতনকে বলছি ওকে ডেকে দিক এ-ঘরে-বলে সুবিনয়বাবু চলে গেলেন।
ভূতনাথের সমস্ত শরীর কাঁপছিল। চিঠিটা আবার পড়লো সে।
“প্রাণাধিক ভূতনাথ,
পরে বংশীর নিকট এইমাত্র তোমার সংবাদ পাইলাম। কেমন আছো এখন। বড় উদ্বেগ বোধ করিতেছি। বংশীকে তোমার নিকট পাঠাঁইলাম। যদি সম্ভব হয় এখানে চলিয়া আসিবে। পাল্কি পাঠাঁইলাম। আশীর্বাদ জানিবে।
তোমার ছোটবৌঠান”
বার বার চিঠিটা পড়ে যেন তৃপ্তি হলো না ভূতনাথের। এমন করে পটেশ্বরী বৌঠান যে তাকে চিঠি লিখবে এ যেন কল্পনাও করা যায় না। ভূতনাথের জীবনে এই সামান্য কাগজের একটা টুকরো যেন এই মুহূর্তে এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে হলো। ক্ষমতা থাকলে এখনি উঠে বসতো ভূতনাথ। তারপর বিশ্বশুদ্ধ লোককে এই চিঠিখানা দেখাতো।
বংশী এল। ভূতনাথকে দেখবার জন্যে তারও যেন আগ্রহের শেষ নেই। এসেই বললে—শালাবাবু, এ কী চেহারা হয়েছে আপনার আজ্ঞে।
ভূতনাথ যেন এতদিনে একজন নিতান্ত আপনার লোক পেয়ে গিয়েছে। শুধু বললে—বংশী তুই…।
বংশী বললে—ক’দিন থেকেই খবর করছি—শালাবাবু কোথায় গেল—ছোটমা’ও অস্থির-থানায় তোক পাঠান, বড়বাড়ির চাকরবাকর সবাইকে শুধোই, ভৈরববাবু দশ জায়গায় ঘোরেন, তাকেও শুধোলাম, তিনি বললেন—কেল্লার গোরারা বোধহয় জখম-টখম করে দিয়েছে দেখ—মধুসূদনকে শুধোলাম— সে বললে—আপদ গিয়েছে তো বাঁচাই গিয়েছে, তার গায়ের জ্বালা আছে কিনা আপনার ওপর।
ভূতনাথ বললে—কেন, তার গায়ের জ্বালা কেন রে আমার ওপর।
–ওই যে আপনি হলেন গিয়ে আমাদের তরফের লোক, ওর সুবিধে হচ্ছে না, আপনি আসার পর থেকে তেমন বাব আদায় হচ্ছে না, আর ঝি-চাকরে ঝগড়া হলে তো ওরই লাভ, বা এনে নতুন লোক বসিয়ে দেবে, বা নেবে, তারপর চাকরি করে দিলে এক টাকা করে মাইনে থেকে কেটে নেবে—সেটা পুরোপুরি হচ্ছে না।
ভূতনাথ বললে—আমি তো আর ওর পাওনায় ভাগ বসাতে যাচ্ছি নে।
—ভাগ বসাতে যাবেন কেন, কিন্তু ওর ভয় তো আছে, আপনি যদি ছোটমা’কে বলে দেন, ছুটুকবাবুর সঙ্গে আপনার পেয়ার আছে, দেখেছে আপনি ছুটুকবাবুর আসরে গান-বাজনা করতে যান—যদি বলে দেন? ও সব জানে যে, সব দেখে যে—চোখজোড়া ছোট হলে কী হবে—নজর যে আছে আঠারো আনা।
হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বংশী বললে—ওদিকে এক কাণ্ড হয়েছে শোনেন নি—না আপনি আর শুনবেন কী করে, ঠনঠনের দত্তবাবুরা মেজবাবুর পায়রা চুরি করেছিল।
