পটেশ্বরী বৌঠানের কথা মনে পড়তেই ভূতনাথের যেন কেমন অশ্বস্তি হতে লাগলো। মনে হলো—-অনেকদিন যেন দেখেনি ছোটবৌঠানকে। আর যদি কখনও দেখা না হয়! এখনি ছুটে যেতে পারলে যেন ভালো হতো! অন্ততঃ বড়বাড়িতে যেতে পারলেও শান্তি পাওয়া যেতো। কিছুটা তত কাছাকাছি। দেখতে না-পাওয়া যাক। একটু সান্নিধ্য। একই বাড়ির ঘেরাও-এর মধ্যে। এক ছাদের তলায়। একই আবহাওয়ার মধ্যে। অন্ততঃ বংশীর কাছে থাকতে পারলেও যেন ভালো হতো। বংশী মুখে ছোটবৌঠানের কথা শুনতে। এ-যেন এক অপূর্ব আকর্ষণ! মাত্র দু’দিনের দেখা। তা-ও অত অল্প সময়ের জন্যে। কিন্তু মনে হলো বৌঠানের কাছে
গেলে সে যেন বাঁচবে না। সে শুধু একবার গিয়ে বলবে—ছোটবৌঠান—সব মিথ্যে—সব মিথ্যে কথা। মোহিনী-সিঁদুরে’ কিছু কাজ হয় না।
ভূতনাথ হঠাৎ বললে—আগে তবে বললানি কেন যে মোহিনীসিঁদুরে’ কিছু হয় না। সব তোমাদের বুজরুকি। কেন তবে বললানি আমাকে?
জবা ভূতনাথের এই কথায় কেমন যেন অবাক হয়ে গেল। কিন্তু সান্ত্বনার সুরে বললে—বাবার কথা বিশ্বাস করে মিছিমিছি কেন মন খারাপ করছেন। বাবার কি এখন মাথার ঠিক আছে, মা মারা যাবার পর থেকেই বাবা কেবল ওই কথা বলছেন?
ভূতনাথ যেন বুঝতে পারলে না। বললে–মা? তোমার মা?
–আপনি শোনেন নি? মা তো মারা গিয়েছেন!
–সে কি? কবে? কী হয়েছিল? জবা বললে—এখনও পনেরো দিনও হয়নি হঠাৎ হার্টফেল করলেন, রাত্রে যেমন শুয়ে থাকেন বিছানায় তেমনি শুয়ে ছিলেন, ঠিক এই ঘরেই…সকাল বেলা জানতে পারলুম—রাত্রে কেউ টেরও পাইনি। কাউকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে যাননি। বলতে বলতে জবার চোখ দিয়ে যেন জল পড়বার উপক্রম হলো।
ভূতনাথ বললে-কই! আমি তো কিছুই জানতুম না, বাবাও কিছু বলেন নি—অন্তত ব্যবহারেও কিছু জানতে দেন নি।
জবা বললে–বাবাকে আপনি চিনলেন না, যে দিন মা মারা গেলেন সেদিনও বাবা সমাজে গিয়ে রোজকার মতো প্রার্থনা করে এসেছেন, সকলের সঙ্গে কথা বলেছেন, কেউ বুঝতে পারেনি আমাদের এত বড় দুর্ঘটনার কথা, রাত্রে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেয়েছি বাবা যেন কেবল জপ করছেন—“ত্বমেকং জগৎকারণং বিশ্বরূপং’—“ত্বমেকং জগৎকারণং বিশ্বরূপং’-পরের দিন আমাকে সেই বাবার প্রিয় ব্ৰহ্ম সঙ্গীতটি গাইতে বলেছেন
-নাথ, তুমি ব্ৰহ্ম, তুমি বিষ্ণু, তুমি ঈশ, তুমি মহেশ
তুমি আদি, তুমি অন্ত, তুমি অনাদি, তুমি অশেষ—
আমি আপন মনেই গেয়ে চলেছি আর বাবা হাতে চৌতালে তাল দিয়ে চলেছেন। শেষে আমার সঙ্গেই গলা মিলিয়ে গাইতে লাগলেন। আমি গান থামালুম, বাবা তখনও গাইছেন—
জল স্থল মরুত ব্যোম পশু মনুষ্য দেবলোক
তুমি সবার সৃজনকার হৃদাধর ত্রিভুবনেশ…
বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না বাবাকে দেখে, বেশ স্বাভাবিক মানুষ কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমূল বদলে গিয়েছেন। কেবল বলেন, লোক-ঠকানোর পাপেই আমার এই ঘটলো—এ ব্যবসা আমি তুলে দেবো মা।
কথা বলতে বলতে জবা যেন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে এল ভূতনাথের। ভূতনাথ আস্তে আস্ত জবার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে ধরলো। জবা কোনো আপত্তি করলে না। তারপর কি জানি কোন্ অজ্ঞাত আকর্ষণে ভূতনাথ জবার হাতটা নিয়ে নিজের ঠোটে স্পর্শ করলে। তবু যেন জবার কোনো সম্বিত নেই। জবা যেন নিষ্প্রাণ প্রস্তর-প্রতিমা। ভূতনাথ অনেকক্ষণ তেমনি করে জবার স্পর্শের সান্নিধ্য আস্বাদ করতে লাগলো।
জবা হাত না সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলে—’মোহিনী-সিঁদুর’ উঠে গেলে আপনার ভয় কেন? চাকরি যাবে বলে?
ভূতনাথ দুই হাতে জবার হাতটা তখনও তেমনি করে ধরে আছে। মুখ আর বুকের মাঝামাঝি জায়গায় হাতটা লাগিয়ে রেখে বললে—ঠিক তা নয়–আগে জানতে পারলে ছোটবৌঠানকে অন্তত আমি বিশ্বাস করে ‘মোহিনী-সিঁদুর’ দিতাম না।
—ছোটবৌঠান আবার আপনার কে? কী হয়েছিল তার?
একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিল ভূতনাথ পটেশ্বরী বৌঠানের কাছে যে, এ-কথা কাউকে বলবে না। এমন কি জবাকেও না। কিন্তু এই মুহূর্তে সে-প্রতিজ্ঞা ভুলে গেল ভূতনাথ। বললে—তার কথা তত তোমায় বলেছি, বড়বাড়ির ছোটবউ। ছোটকর্তা রাত্রে বাড়ি আসেন না—তাকে বশ করবার জন্যে ‘মোহিনী-সিঁদুর’ কিনে দিয়েছিলাম।
জবা যেন কি ভাবলো। তারপর বললে—আপনার ছোটবৌঠানের বয়েস কত?
–তোমার চেয়ে বড়, আমার চেয়ে কিছু ছোট।
জবা হেসে বললে—ছোটবৌঠানের জন্যে আপনার এতখানি দরদ তো ভালো নয়?
ভূতনাথ কিন্তু হাসতে পারলে না। বললে—পটেশ্বরী বৌঠানকে দেখলে তুমি এ-কথা বলতে পারতে না জবা।
জবা তেমনি হেসে বললে—আমি না দেখলেও কল্পনা করে নিতে পারি।
ভূতনাথ বললে—আর সবাইকে কল্পনা করা যায় কিন্তু ছোটবৌঠান কল্পনার বাইরে। তাকে না দেখলে কল্পনা করা শক্ত, দেখবার আগে আমারও সেই ধারণাই ছিল।
জবা বললে—তা হলে দেখছি জল অনেকদূর গড়িয়েছে। তারপর একটু থেমে বললে—‘মোহিনী-সিঁদুর’ কখনও বিফল হয় না জানতুম।
ভূতনাথ বললে—তার মানে?
-তার মানে, বড়লোকের বাড়ির স্বামী পরিত্যক্তা রূপসী বউ, আপনার…হঠাৎ জবা হাত টেনে নিলে। রতন ঘরে ঢুকেছে।
রতন বললে—দিদিমণি খোকাবাবু এসেছেন।
জবা বিছানা ছেড়ে উঠে বললে-বসতে বল হ-ঘরে, আর চা করে আন—আমি আসছি। বলে এক নিমেষে জবা পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভূতনাথ যেন হতবাকের মতো অসহায় অপ্রস্তুত হয়ে শুয়ে পড়ে রইল। কিছু যেন করবার নেই। নিরূপায় সে। কে এ খোকাবাবু! কিন্তু সে যে-ই হোক এই মুহূর্তেই কি তাকে আসতে হয়! যেন অনেক কথা বলবার ছিল জবাকে, সবে মাত্র সূচনা হয়েছিল, কিন্তু বলা হলো না।
