বড়বাড়ির কথাও মনে পড়ে। ব্ৰজরাখাল আর তাকে দেখতে আসেনি। কত কাজ ব্রজরাখালের। কখন সে আসবে। কোথায় ফুলবালা দাসীর ভেদবমি, কার অসুখের ওষুধ, আলমবাজারের মঠ, দক্ষিণেশ্বরের আশ্রম, নিজের যোগসাধনা। তারপর আছে চাকরি। তবু যে কেন চাকরি করে ব্রজরাখাল! কাদের জন্যে! বড়বাড়ির ছেলেদের রাত্রে পড়ানো তো সব দিন হয় না। প্লেগের যেবার হিড়িক হলো—কি কাণ্ডটাই না করলো সে ক’দিন। কলকাতার বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে সেই অমানুষিক সেবা আর অমিত পরিশ্রম। এখনও মনে আছে ভূতনাথের। লম্বা লম্বা ছুচের মতো যন্ত্র নিয়ে ইনজেকশন দিতে আসতো। বড়বাড়ির চাকর-ঝি কেউ বাদ গেল না। কি ব্যথা হয়েছিল হাতে ক’দিন ধরে। রাস্তায় রাস্তায় যাকে দেখতে পায় তাকেই দেয় ছুঁচ ফুটিয়ে। হাত ফুলে ঢোল হয়ে ওঠে। দলে দলে প্লেগের ভয়ে পালাতে শুরু করলো লোক। শেয়ালদা’ স্টেশনে নাকি ভিড়ের জন্যে টিকিট কাটাই দায়। সারাদিন পরিশ্রমের পর ব্রজরাখাল যখন রাত্রে ফিরতে কি চেহারা তার!
ভূতনাথ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল—আপিস যাচ্ছে না ব্রজরাখাল, তোমার চাকরি থাকবে তো?
ব্ৰজরাখাল বলেছিল—চাকরি বড় না মানুষের প্রাণ বড়। তারপরে একটু থেমে বলেছিল—আর পারছিনে বড়কুটুম—এ সাহেব আসে স্যালিউট দাও, ও সাহেব আসে স্যালিউট দাও একটু স্যালিউট দিতে ভুল হয়েছে কি চাকরি নট—কিন্তু আমিও ঠিক করেছি এক ঠাকুর ছাড়া কারুর কাছে মাথা নোয়বো না বড়কুটুম—বলে ঠাকুরের ছবিটার দিকে চেয়ে চোখ বুজে অনেকক্ষণ ধরে প্রণাম করেছিল।
ভূতনাথ বলেছিল কিন্তু তবে কেন তোমার ছাই চাকরি করা?
ব্ৰজরাখাল নিজের মনেই বলেছিল—সাধ করে কি আর চাকরি করি বড়কুটুম!
ভূতনাথও জানতে সে-কথা। ক’দিন ব্ৰজরাখাল বাড়িতে না এলেই লোকের পর লোক এসে হাজির। এ এসে জিজ্ঞেস করে—ব্রজরাখালবাবু আছেন? ও এসে জিজ্ঞেস করে—ব্রজরাখালবাবু আছেন? মাসের প্রথম দিকটা অনেকগুলো লোক হাঁ করে বসে থাকে ব্ৰজরাখালের পথ চেয়ে।
বড়বাড়ির কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে যায় ছোটবৌঠানের কথা। সেই তেতলার ঘরখানার কথা। উঁচু পালঙ্ক। কড়িকাঠ থেকে একটা রঙিন মশারি ঝুলছে। দিনের বেলায় চূড়ো করে বাঁধা। এতখানি পুরু গদির ওপর শাখের মতো সাদা চাদর পাতা। সারা দেয়ালে পটের ছবি। শ্রীকৃষ্ণের পায়স-ভক্ষণ। গিরিগোবর্ধনধারী যশোদাদুলাল। দময়ন্তীর সামনে হংসরূপী নলের আবির্ভাব। ঠোটে একটা ভাঁজ করা চিঠি। মদন ভস্ম। শিবের কপাল ফুড়ে ঝাটার মতন আগুনের জ্যোতি বেরিয়ে আসছে। পাশের কাচের আলমারিতে পুতুল। বিলিতি মেম—ঘাগরা পরা। গোরাপল্টন-মাথায় টুপি।
চোখ বুজলেই সব নিখুত মনে পড়ে যায়। আর মনে পড়ে যায় ছোটবৌঠানের আলতা-পরা পা-জোড়া। টোপাকুলের মতো টলটলে আঙুলগুলো। মোহিনী-সিঁদুরে’ কিছু কাজ হয়েছে কি না কে জানে। অনেকদিন তো হয়ে গেল। ছোটকর্তা কি আজো সেইরকম নিয়ম করে বিকেলবেলা ল্যাণ্ডোলেট চড়ে বনমালী সরকার লেন পেরিয়ে চলে যায়। কড়ির মতো সাদা ঘোড়া দুটো টগবগ করতে করতে কি তেমনি বড়বাড়ির গেট পেরিয়ে ছুটতে শুরু করে।
সুবিনয়বাবু সেদিন এলেন ঘরে। বললেন—এখন কেমন আছো ভূতনাথবাবু?
ভূতনাথ বললে—একটু ভালো বোধ করছি—আর কিছুদিন বাদেই কাজ আরম্ভ করতে পারবো ভাবছি।
–কীসের কাজ?
-আপিসের কাজ-ভূতনাথ বললে।
—কোন্ আপিসের কাজ?
ভূতনাথ হঠাৎ এ-প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারলে না। তারপর বললে—আপনি একলা সব পেরে উঠেছেন না।
–ও-ও-ও-সুবিনয়বাবু যেন এতক্ষণে বুঝতে পারলেন। বললেন—না ভূতনাথবাবু, ভাবছি, ও আমি তুলে দেবো-ও বুজরুকি আর করবো না, বিবেকে বাধছে, অর্ধ শিক্ষিত অশিক্ষিতের দেশ, এখনও ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র কাটতি আছে এবং কাটতি আরো বাড়ছে, বোধকরি যতদিন চালাবে ততদিন চলবে, আমার অর্থ সম্পত্তি সব দিয়েছে ওই ‘মোহিনী-সিঁদুর’—উপনিষদে আছে…
বাধা পড়লো। জবা ঢুকলো ঘরে। বললে—বাবা, আপনি বিশ্রাম করুন গে যান, আমি ভূতনাথবাবুকে দেখছি।
সুবিনয়বাবু চলে গেলেন নিঃশব্দে। কিন্তু কথাটা শুনে ভূতনাথের কেমন ভয় হলো। মোহিনী-সিঁদুরের ব্যবসা যদি তুলে দেন তা হলে সে করবে কি?
জবা এসে বিছানার পাশেই বসলো। তারপর ভূতনাথের চোখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে—কিছু বলবেন আমাকে?
ভূতনাথ প্রথমে কেমনভাবে কথাটা পাড়বে বুঝতে পারলে না। শেষে বললে–বাবা যা বলছিলেন সত্যি?
—বাবা কী বলছিলেন?
—ওই যে বলছিলেন মোহিনী-সি দুরে’র কারবার তুলে দেবেন?
জবা বললে—বাবার কথায় কান দেবেন না, বাবার এখন মাথার ঠিক নেই, এখন ওঁর কেবল মনে হচ্ছে এ লোক-ঠকানো ব্যবসা, কিন্তু লোকে যদি ইচ্ছে করে ঠকে তো আমরা কী করতে পারি। এ হচ্ছে কর্তাভজার দেশ, মন্ত্র-তন্ত্রের দেশ, অবতারবাদের পীঠস্থান, এর মতন ফলাও ব্যবসা আর আছে নাকি? এর পেছনে আরো মূলধন ঢালতে পারলে এ আরো চলবে।
ভূতনাথ খানিকটা আশ্বস্ত হলেও যেন নিঃসন্দেহ হতে পারলে। বললে—কিন্তু উনি যে বললেন, এ সব বুজরুকি।
জবা বললে—আজকাল ওই রকম ওঁর মনে হচ্ছে—বাবার এখন মাথার ঠিক নেই।
হঠাৎ আর একটা কথা মনে পড়লো ভূতনাথের। তবে তো ছোটবৌঠানকে সে ঠকিয়েছে। কোনো কাজই হয় নি সে-সিঁদুরে। মিছিমিছি ছোটবৌঠান সেই সিঁদুর নিয়ে আজও ছোটকর্তার পথ চেয়ে প্রতীক্ষা করে থাকে হয় তো। এখনও হয় তত পরীক্ষা-নীরিক্ষার শেষ নেই। এখনও হয় তত তেমনি রাতের পর রাত ছোটকর্তার জন্যে জেগে জেগে কাটে। তারপর ভোরের দিকে যখন ছোটকর্তা আসে, যখন বংশী কাপড় বদলিয়ে দোতলার ঘরে শুইয়ে দেয়, নেশায় অচৈতন্য হয়ে বাড়িতে ফেরে, তখন খবর যায় ছোটবৌঠানের ঘরে। ছোটবৌঠানের যশোদাদুলাল তেমনি জলচৌকির ওপর নিশ্চল নিথর দৃষ্টিতে পাথরের চোখ দিয়ে সব দেখে। সমস্ত বংশের পাপের জন্যে এক ছোটবৌঠানই হয় তো প্রায়শ্চিত্ত করে। তবে বুঝি পটেশ্বরী বৌঠানের বাবার গুরুদেবের কথাই সত্যি। পূর্বজন্মে পটেশ্বরী ছিল বুঝি দেবোলা। দেবসভায় ব্রাহ্মণের অপমান করায় এ-জন্মটা এমনি প্রায়শ্চিত্ত করেই কাটিয়ে দিতে হবে।
