শিবনাথ বললে—তাকে না জিজ্ঞেস করে নিয়ে যাওয়া কি ভালো হবে?
সুবিনয়বাবু বললেন—তা-ও তো ঠিক হবে না জানি, কিন্তু জবা মাকে আমি গিয়ে কি জবাব দেবো? বড় একগুয়ে মেয়ে কি না! কিন্তু ব্ৰজরাখালবাবুকে এখন একবার খবর দিলে হয় না?
—তিনি তো এখন বেলুড়ে—স্বামিজীর ব্যাপারে…তার দেখা পাওয়া শক্ত।
-তা হলে কি হবে শিবনাথবাবু?
এতক্ষণে ভূতনাথ যেন কথা বলবার ক্ষমতা ফিরে পেল। বললে–আমি আপনার সঙ্গেই যাবে সুবিনয়বাবু।
সুবিনয়বাবু যেন অকূলে কূল পেলেন। বললেন—আমাকে বাঁচালে ভূতনাথবাবু, জবা ভোরবেলা খবরটা পাওয়া অবধি বড় কাতর হয়ে আছে কি না—ক’দিন থেকেই আমরা ভাবছিলুম, ভূতনাথবাবু সেদিন বাড়ি গেল, আর দেখা-সাক্ষাৎ নেই। খবর পাঠালুম ব্রজরাখালবাবুকে, তিনিও নেই, খবর পেলাম তিনিও নাকি বাইরে গিয়েছেন।
শিবনাথবাবু ধরাধরি করে ভূতনাথকে উঠিয়ে দিয়েছিল সুবিনয়বাবুর গাড়িতে। সারা রাস্তা সুবিনয়বাবু কথা বলেছেন। শিবনাথও সঙ্গে ছিল। মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে এসে পাঠকজী আর শিবনাথ নামিয়ে দিলে গাড়ি থেকে!
যে-ঘরে শোয়ানো হলো সে-ঘরটা জবার মা’র ঘর। একেবারে অন্দরমহলে এনে ওঠানো হলো। জবা তৈরিই ছিল। বললে বাবা আপনি এখন একটু বিশ্রাম করুন, ভূতনাথবাবুকে আমি দেখছি। তারপর আবার মাকে ডেকে বললে—বৈজুকে বল ডাক্তারবাবুকে একবার যেন খবর দেয় আর একটা গামলায় খানিকটা গরম জল করে নিয়ে আয় তো তুই।
অনেকখানি পরিশ্রমের পর ভূতনাথ বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কখন দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়েছে টের পায়নি। যখন আবার তন্দ্রা ভাঙলো মনে হলো কোথায় এসেছে সে। স্মরণ করতে একটু সময় লাগলো। তারপর ভালো করে নজর পড়তেই দেখলে পাশে বিছানার ওপর জবা বসে আছে। মাথায় জল-পটি দিচ্ছে। হঠাৎ এ মূর্তি দেখলে যেন চিনতে পারার কথা নয়। ভূতনাথের একেবারে কাছাকাছি বসে। এতখানি সান্নিধ্যের অবকাশ অবশ্য আগে কখনও মেলেনি। জবার শরীরের গন্ধ যেন নাকে এসে লাগছে। হাতের স্পর্শে যেন রোমাঞ্চ হয়। ভূতনাথের শরীরের উত্তাপ যেন আরো বেড়ে গেল।
সুবিনয়বাবু একবার ঘরে ঢুকলেন। কিন্তু কিছু প্রশ্ন করার আগেই জবা বললে—বাবা, আপনি আবার কেন এলেন? ডাক্তারবাবু তো বলে গেলেন কোনো ভয় নেই-জ্বরটাও একটু কম। আপনি যান বসুন গিয়ে, আমি যাচ্ছি।
সুবিনয়বাবু বললেন—মাথার ঘা’টা কেমন আছে মা।
জবা জলপটি দিতে দিতে বললে—ডাক্তারবাবু বললেন আরো কিছুদিন সময় নেবে। শুকোবার মুখ এখন, চুপচাপ কেবল শুইয়ে রাখতে বলেছেন, ঘা’টা ভালোর দিকে গেলেই জ্বরটাও কমে আসবে।
—দেখো মা, ছেলেদের ইচ্ছে ছিল না ভূতনাথবাবুকে এখানে পাঠায়, তোমার জন্যেই নিয়ে এলাম এখানে, যেন বিপদ না হয় দেখো-বলে সুবিনয়বাবু চলে গেলেন।
জবা ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে এসে আবার বসলো পাশে। ভূতনাথের জ্বরের ঘোরেও মনে হলো জব যেন তার বড় কাছাকাছি ঘেঁষে বসেছে। জবার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন। এ এক নতুন অনুভূতি। এমন করে এত কাছাকাছি যেন কেউ আগে এসে বসেনি। অস্পষ্ট কুয়াশার মতো ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে শুধু পিসীমা’র কথা। অসুখ হলে এমনি করে পিসীমা কাছে এসে বসতো। বড় ভালো লাগতো তখন। কত বায়না করতে ভূতনাথ। অসুখ থেকে সেরে ওঠবার পর পিসীমা ভাত খেতে পারতো না। বিধবা মানুষ। দুপুর বেলা শুধু একবার পাথরের থালাটা নিয়ে বসতে খেতে। কিন্তু টের পেয়েই ভূতনাথ আস্তে আস্তে পাশে গিয়ে বসতো।
পিসীমা বলতো–ও মা, তুই ঘুমোচ্ছিস দেখে দুটো ভাত নিয়ে বসলাম।
ভূতনাথ নিবিষ্টচিত্তে দেখতো পিসীম কেমন করে ডাল দিয়ে ভাত মাখছে। কেমন করে মুখে তুলছে। ভাতের লোভে সমস্ত শরীরটা যেন লালায়িত হয়ে উঠতে তার।
—পিসীমা, কুলের অম্বল করোনি আজ?
-না বাছা, কুলের অম্বলে আর কাজ নেই, বাড়ির ছেলের অসুখ আর আমি কুলের অম্বল দিয়ে কি না ভাত খাবো, তোর অসুখ ভালো হলে তখন আবার কুলের অম্বল করবো।
–কবে ভাত খাবো পিসীমা?
পিসীমা’র গলা দিয়ে যেন ভাত নামতো না। সান্ত্বনা দিয়ে বলত—অসুখ থেকে উঠে কি কি খাবি বল দিকিনি শুনি?
কত তালিকা তৈরি করতে ভূতনাথ। শুয়ে শুয়ে লিখতে কাগজের ওপর অসুখ সারলে কী কী খাবে সে। কুলের আচার। বড়ি ভাজা। সজনে ডাটা চচ্চড়ি। কত সাধারণ জিনিষ সব। কিন্তু অসুখের সময় ভাবতে কি ভালোই যে লাগতো! কিন্তু সেরে ওঠবার পর আবার যে-কে-সেই।
পিসীমা বলতো-ও কি রে, আর দুটি ভাত নে।
–পেট ভরে গিয়েছে পিসীমা।
—তবে যে বললি আজকে অনেক ভাত খাবি! এই তোর খাওয়া, তুই-ই যদি না খাবি তো কার জন্যে এত সব রান্না।
অসুখের সময় যে-মানুষ খাবার জন্যে অত ব্যস্ত, অসুখের পর সেই মানুষকেই খাওয়াবার জন্যে কী পেড়াপীড়ি! বোধ হয় এমনিই হয় সকলের। এ-বাড়িতে এসেও সেই সব কথা মনে পড়ে ভূতনাথের। দিনের বেলা যখন ভূতনাথ জেগে থাকে, কেউ থাকে না ঘরে—চারিদিকে চেয়ে দেখে। ঘরের বাইরেই বসবার হল-ঘর। জবা তার সুবিনয়বাবুর গলা শোনা যায়।
জবা মাঝে মাঝে বই পড়ে শোনায় বাবাকে। আধো জাগা আধো তন্দ্রার মধ্যে রামায়ণ-মহাভারতের সুর ভেসে আসে। মনে পড়ে যায় নিবারণের কথা। ছেলেটা যেন স্বপ্ন দেখছে কোন্ দূর স্বর্গের। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করবার স্বপ্ন। মনে পড়ে যায় সেই গানটা—“মা গো যায় যেন জীবন চলে, বন্দে মাতরম্ বলে। কবে আসবে সেই তিনজন বাঙালী। যতীন বাড়জ্জে, বারীন ঘোষ আর অরবিন্দ ঘোষ। মনে পড়ে যায় প্লেগ কমিশনার র্যাণ্ড সাহেবের হত্যার কাহিনী। এমন চমৎকার করে বলতে পারে নিবারণ। পুণার বড়লাটের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে র্যা সাহেব। চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে সে-দৃশ্য। আর মনে পড়ে ১৮৯৯ সালের একটা দিন। নিঃশব্দে নাকি একদিন প্রত্যুষে ফঁসি হয়ে যায় চাপেকার ভাইদের। সেই রক্তের বীজ বাঙলা দেশে এসে বুনেছে ওরা। ওই ‘আত্মোন্নতি সমিতি’, ‘অনুশীলন সমিতি’ আর ‘যুবক সঙ্ঘের’ ছেলেরা। একা-একা শুয়ে শুয়ে আরো এলোপাতাড়ি কত কি কথা মনে পড়ে।
