সে-চিৎকারে হঠাৎ যেন কিছুক্ষণের জন্যে সবাই চমকে উঠেছে। গোরা দুটো লড়াই থামিয়ে যেন একটু ইতস্তত করতে লাগলো।
ততক্ষণে গাড়ি সামনে এসে গিয়েছে। ভেতরে ভৈরববাবু বসেছিলেন। চেঁচিয়ে বললে—ইব্রাহিম গাড়ি থামাও-মেজবাবু গাড়ি থামাতে বলছেন—থামাও গাড়ি।
আগে মেজকর্তা নামলেন। পেছনে ভৈরববাবু। মেজবাবু হাঁকলেন—ইব্রাহিম চাবুকটা দে তো।
কিন্তু গোরা দুটো তখন রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে পোঁ পোঁ ছুটতে শুরু করেছে।
মেজবাবু নরহরির কাছে গিয়ে এক ধমক দিলেন—উল্লুক, শুয়ার-কা-বাচ্চা, কাঁদছিস কেন? মারতে পারলি না দু’ঘা—আবার পড়ে পড়ে কাঁদছিস। বেল্লিক কাঁহিকা—বলে সপাং সপাং করে চাবুকটা দিয়ে বেদম মারতে লাগলেন নরহরি মহাপাত্রের পিঠে। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা! নরহরি কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে লাগলো রাস্তার ওপর। যারা এতক্ষণ দরজা-জানালা বন্ধ করে মজা দেখছিল, তারা এবার দরজা খুলে নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে। হঠাৎ নরহরিকে মারা বন্ধ করে তাদের দিকে চাবুকটা নিয়ে এগিয়ে গেলেন মেজকর্তা। বললেন—কি দেখছিস সব
বেরো এখান থেকে বেরো
আবার ঝটাপট সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শান্ত সৌম্য মেজকর্তা হিরণ্যমণি চৌধুরীকে কেউ রাগতে দেখেনি। সেই তিনিও রেগে লাল হয়ে উঠলেন। তারপর ভৈরববাবু আর মেজকর্তা গাড়িতে উঠে বসতেই জুড়ি আবার বনমালী সরকার লেন পার হয়ে গেল।
পরদিন খাজাঞ্চী বিধু সরকারের ডাক পড়লো। বেলা তিনটে তখন। বিধু সরকার আসতেই বললেন—নরহরি মহাপাত্রকে এক শ’ টাকা দিয়ে বিদায় করে দাও তো বিধু—আর সুখচরের গোমস্তাকে চিঠি লিখে দাও, রাজীবপুরের বিলের ধারের দশ বিদ্বে জমি ওর নামে প্রজাবিলি করে দেয় যেন।
যে হুকুম সেই কাজ। তারপরে নাথু সিংকে ডেকে বললেন
নরহরি যেন এ গলির মধ্যে কখনও না ঢোকে আর তাকে যদি কখনও দেখতে পাই তো গুলী করবো, ওকে বলে দিস।
তারপর থেকে নরহরিকে আর কখনও ভূতনাথ দেখেনি কলকাতায়।
গল্প করতে করতে নিবারণ যেন একবার থামলো। বোধ হয় ঘুম আসছিল ওর। ঘরের আলোটা একটু একটু কাঁপছে। ভূতনাথেরও চোখে যেন কেমন তার ভাব। আর শুধু কি নিবারণ আর ভূতনাথ? সমস্ত ভারতবর্ষই বুঝি ছিল তন্দ্রাচ্ছন্ন। বাদশাহী আফিঙের নেশা। জাগতে চেষ্টা করলেও ভালো করে চোখ মেলা যায় না। এক শ’ বছরে রাজ্য ভাঙা-গড়ার ইতিহাস নেই, রাজবংশের উত্থান-পতনের গুরুগর্জন নেই। বেশ নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় সবাই ঘুমিয়েছে। সেই সর্বনাশা ঘুমের অন্তরালে কখন ধানকল এসেছে চুপিচুপি, এসেছে পাটকল আর গম-পেষা কল, কাপড়ের কল, আরে এসেছে স্টীম ইঞ্জিন, স্টীমার, ছাপাখানা আর টাকাছাপানো কল—কেউ টের পায়নি। তৈমুর লঙ-এর আরবী ঘোড় আর নাদির শা’র তলোয়ার যা পারেনি তাই করেছে এক শ’ বছরের ইংরেজ রাজত্ব। ওপর-নিচে সমস্ত ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ভেতরে ভেতরে সমাজের ভিত গিয়েছে সে। বুদ্ধ-যিশু-মহম্মদ আর চৈতন্য যা পারেননি তাই পেরেছে বাষ্প আর বাষ্পীয় যান।
ঘুম ভেঙে গিয়েছে নিবারণের।
ঘুম ভেঙে গিয়েছে ভূতনাথেরও।
বাইরে কে যেন জোরে কড়া নাড়ছে। ডাকছে—নিবারণ–নিবারণ-ও নিবারণ–
নিবারণ ধড়ফড় করে উঠে দরজা খুলে দিলে। বললে-কে, কদমদা’ নাকি?
-হ্যাঁ, শিগগির চলবেলুড়ে যেতে হবে।
–কেন? এত রাত্রে?
—হ্যাঁ, স্বামিজী মারা গিয়েছেন।
—স্বামিজী? —হ্যাঁ, স্বামী বিবেকানন্দ!
১৮. কোথা দিয়ে ঘুমের মধ্যে দিয়ে
কোথা দিয়ে ঘুমের মধ্যে দিয়ে রাতটা কেটে গিয়েছিল মনে নেই ভূতনাথের। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও যেন স্বপ্ন দেখেছে ব্রজরাখালকে। মনটা ছটফট করেছে ব্রজরাখালের কাছে যাবার জন্যে। ব্ৰজরাখাল এত বড় সংবাদকে কেমন করে সহ্য করবে কে জানে! বাঙলা দেশে এত বড় নীরব ভক্ত আর কে ছিল!
ভোরবেলা কিন্তু আর এক কাণ্ড ঘটলো। যুবক সঙ্ঘের সদর দরজার সামনে এসে গাড়ি দাঁড়ালো একটা। ঘোড়ার পা ঠোকার শব্দ। তারপরেই সুবিনয়বাবুর গলা–কই? এই বাড়িতে নাকি?
শিবনাথ বুঝি ছিল সামনে। বললে—ভূতনাথবাবু এখন ঘুমোচ্ছন একটু—তা আপনি ভেতরে আসুন।
সুবিনয়বাবু বললেন—অথচ ক’দিন থেকেই আমি ভাবছিলাম— কী হলো, কী হলো—ভূতনাথবাবু আসে না কেন, ব্ৰজরাখালবাবুকে জিজ্ঞেস করি—তিনিও বলতে পারেন না—শেষে আজ ভোরবেলা…
হঠাৎ ঘরের মধ্যে উদয় হলেন। সেই কালো চাপকানের ওপর কোণাকুণি পাকানো চাদরটা ফেলা। দাড়ি-গোঁফের প্রাচুর্যের মধ্যেও মুখের উদ্বিগ্নভাব ধরা পড়লো। ভূতনাথকে জেগে থাকতে দেখে সামনে এসে ঝুঁকে বললেন—কেমন আছো এখন ভূতনাথবাবু? তারপর একটু থেমে আবার বললেন—গোরাদের ওপর দোষ দিয়ে লাভ নেই, কিন্তু আঘাতটা যে মারাত্মক হয়নি এই রক্ষে। সর্ব জীবের যিনি নিয়ন্তা, যিনি ভূলোক দ্যুলোকের অধিপতি সেই পরম…
শিবনাথ বললে—আমরা যথাসাধ্য সমস্ত রকমের যত্ন নিয়েছি। চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হয়নি।
সুবিনয়বাবু বললেন—কিন্তু জবা মা যে বড় উদ্বিগ্ন হয়ে আছে, আমাকে বলে দিয়েছে ও-জায়গায় ভূতনাথকে রেখে আসা ঠিক হবে না—হয় তো ঠিকমতো সেবা হচ্ছে না। জবা যে আমার বড় একগুয়ে মেয়ে শিবনাথবাবু। নিজেই আসতে চাইছিল, আমি তাকে বারণ করলাম—বললাম আমি তাকে নিয়েই আসবো। আমি যে জবা মাকে কথা দিয়ে এসেছি একেবারে।
শিবনাথ বললে—ব্রজরাখালবাবুর বড়কুটুম—তাকে জিজ্ঞেস না করে–
সুবিনয়বাবু বললেন—তিনি যদি আপত্তি করেন, তাই বলছেন শিবনাথবাবু?
