নিবারণ হঠাৎ থেমে বললে—কিন্তু বাঙালীরাই বা পেছিয়ে থাকবে কেন। তাই চাপেকার সঙ্ঘ থেকে লোক কলকাতাতেও আসছে—আমি চিঠি দেখেছি। একটা ব্যাণ্ডকে খুন করলে তোল কিছু কাজ হবে না, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ র্যাণ্ড ছড়িয়ে রয়েছে যে ভারতবর্ষে, নীলকর সাহেবরা গিয়েছে কিন্তু চা-বাগানের সাহেবরা?
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—কারা আসছে কলকাতায় বললে?
—তিনজন বাঙালী, যতীন বাঁড়ুজ্জে, বারীন ঘোষ আর তার দাদা অরবিন্দ ঘোষ। আর এখানে আমাদের ব্যারিস্টার সাহেব পি. মিত্তির রয়েছেন। একটা সমিতি করার কথা হয়েছে, নাম হবে ‘অনুশীলন সমিতি’। মানিকতলা স্ত্রীটের মানিক দত্তের বাড়িতে ওদের আড্ডা বসছে। তারপর একটু থেমে নিবারণ আবার বললে
-আপনি ওখানে যাবেন একদিন?
—আমাকে যেতে দেবে কেন?
-খুব যেতে দেবে। নিবারণ বললে–আপনি ব্ৰজরাখালবাবুর শালা, কেউ আটকাবে না, আর সবাই মিলে না লাগলে কিছু হবেও না, এই সেদিন বুয়র যুদ্ধ হয়ে গেল, আবার রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের যুদ্ধ বাধছে। দেখবেন শাদা চামড়ারা এবার হারবেই হারবে। আপনি ম্যাটসিনি গ্যারিবল্ডির লাইফ পড়েছেন? আপনাকে আমি বই দিতে পারি। এইরকম করেই তারাও তো স্বাধীন হয়েছিল। সেদিন সিস্টার নিবেদিতা এসেছিলেন এখানে, তিনিও আশীর্বাদ করে গিয়েছেন আমাদের, বলেছেন—তোমরা স্বামিজীর মতন হও।
নিবারণের কথা শুনতে শুনতে ভূতনাথের চোখ দুটো বুজে এল। মনে হলো—এ এক আশ্চর্য জগতে এসে পৌচেছে সে। কলকাতার কেন্দ্রে বসে ভারতবর্ষের এক নতুন ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। জব চার্নক আর লর্ড ক্লাইভের কলকাতার এ যেন এক বিস্ময়কর রূপান্তর। যে-কলকাতায় ননীলাল থাকে, থাকে ছুটুকবাবু, ছোটবাবু, ছোটবৌঠান আর থাকে সুবিনয়বাবু আর জবা—এ যেন সে-কলকাতা নয়। কলকাতায় এসে ভূতনাথও তো নিজের চোখে কত কি দেখেছে।
সেদিনের সেই ঘটনাটা মনে পড়লো। বৌবাজার থেকে বনমালী সরকার লেন-এ ঢুকতে সেই যে বটগাছটার তলায় সান বাঁধানো বেদীটার ওপর নরহরি মহাপাত্রের বিগ্রহগুলোলক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, দুর্গা, মনসা, শিব, কালী, ছোট পুতুলের মাপের অসংখ্য ঠাকুর সব! প্রথম যেদিন কলকাতায় এসে পৌঁছোয় ভূতনাথ, নরহরি তাকে ওইখানে প্রণাম করিয়ে পয়সা নিয়েছিল। মন্তর পড়িয়েছিল। তারপর ‘মোহিনী-সিঁদুর আপিসে যাতায়াতের পথে কতবার কত পয়সা আদায় করেছে। মিথ্যে হোক, বুজরুকি হোক, তবু ঠাকুর দেবতা তো! যে অদৃশ্য শক্তি এই বিশ্ব চরাচরের নিয়ামক, তাকে অগ্রাহ্য করবার শক্তি তো ভূতনাথের নেই। ভূতনাথের নিজেরই জন্ম তত পঞ্চাননতলায় মানতের ফলে। হোক ওটা নরহরি মহাপাত্রের ব্যবসা বা দোকান, তবু ঈশ্বরের নাম করে যখন চাইছে, তাতে কী-ই বা এমন ক্ষতি। তাই আসা-যাওয়ার পথে প্রণাম করতে কখনও ভোলেনি ভূতনাথ।
কিন্তু সেদিন দুপুরে কী অভাবনীয় কাণ্ড!
গোটা কতক গোরা সৈন্যই বুঝি! বনমালী সরকার লেন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো শিষ দিতে দিতে। সামনে যথারীতি নরহরি মহাপাত্র সবে গঙ্গাস্নান সেরে মাথার শিখাতে একটা গাঁদাফুল ঝুলিয়ে পথচারীদের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে! এমন রোজই থাকে সে। নতুন কিছু নয়। কিন্তু ওই দৃশ্য দেখে গোরা সৈন্য দুটোর কী মতলব হলো মনে কে জানে? একজন হাতের ছড়িটা দিয়ে মারলে নরহরির মাথার গাঁদা ফুলটাকে। উদ্দেশ্য হয় তো রসিকতাই, কিন্তু ভয় পেয়ে নরহরি চিৎকার করে উঠলো। সে-চিৎকারে ফল ফললে উল্টো। পাশ থেকে একজন গোরা সৈন্য বট দিয়ে মারলে নরহরির মুখে। কিন্তু মুখ তা বলে বন্ধ হলো না নরহরির। রাস্তার ধারে এক নিমেষে ছিটকে পড়লো নরহরি আর কাটফাটা চিৎকার করতে লাগলো। শব্দ শুনে এদিক-ওদিক থেকে জনতা কতক বেরিয়েও এল ব্যাপার দেখতে।
ভূতনাথও শব্দ শুনে বড়বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখতে এসেছে।
কিন্তু সে কি লোমহর্ষণ ব্যাপার! বুক দুর দুর করে কাঁপছে সকলের। কারো কিছু বলবার সাহস নেই।
ভারি ভারি বুট দিয়ে দুটো গোরা তখন লাথি মারতে শুরু করছে। এক একটা লাথি মারে আর লক্ষ্মী গণেশ ঠাকুরগুলো দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। শিব, দুর্গা মনসা, সব মার্বেল গুলির মতো যেদিকে খুশি ছিটকে ফেলছে। শান বাঁধানো বেদীটাও বুঝি ভেঙে-চুরে গেল বুটের ঠোকর লেগে। আর একপাশে পড়ে নরহরি মহাপাত্র চিৎকার করে পাড়া মাত করছে।
শেষকালে যেন ক্ষেপে উঠলো গোরা দুটো। যাকে সামনে পায়, তাকেই মারতে যায়। বড়বাড়ির গেটে ব্রিজ সিং দাঁড়িয়েছিল। বুকে গুলীর বেল্ট। হাতে সঙ্গীন লাগানো বন্দুক। লোহার গেট বন্ধ করে দিলে। যে-যেখানে পারলে লুকোলে গিয়ে। সব বাড়ির দরজা জানালা খড়খড়ি খটাখট বন্ধ হয়ে গেল।
এমন সময় বড়বাড়ির মেজকা হিরণ্যমণি চৌধুরী বেরুচ্ছিলেন।
কোচোয়ানের বসবার জায়গায় আমিরী ভঙ্গিতে ইব্রাহিম লাগাম ধরে জুড়ি চালাচ্ছে। শঙ্কর মাছের চাবুকটা খাপের ওপর খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। মোম লাগানো মস্ত গোঁফ জোড়া দু’পাশে কাকড়া বিছের মতো চিতোনো। মাথায় বাবরি চুল কাঁধের ওপর গিয়ে ঠেকেছে। মাথার পেছনে কাঠের চিরুনি আঁটা। জরির কাজ করা শাদা প্লেটের ওপর সোনার তক্তি ঝুলছে গলায়। আর ইয়াসিন সহিস পেছনে পাদানির ওপর দাঁড়িয়ে সাবধান করছে সবাইকে। হুঁশিয়ার হো-হুঁশিয়ার হো–-
ব্রিজ সিং লোহার গেট খুলে দিয়ে ম্যাটেনসনের ভঙ্গীতে দাঁড়ালো। তারপর গাড়ি বেরুবার আগে চিৎকার করে উঠলো— হুঁশিয়ার—হুঁশিয়ার হো—
