—কিন্তু কদমদা’ ভারতবর্ষ জয় করতে ক’টা ইংরেজ এসেছিল?
খানিকক্ষণ কোনো কথা শোনা গেল না। তারপর কে যেন বলতে লাগলো—তোরা ভুল করছিস শিবনাথ, আমাদের যুবক সঙ্ঘের’ উদ্দেশ্যই যে তা নয়—স্বামিজী বলেছেন—“The world is in need of those whose life is one burning love-selfless. That love will make every word tell like a thunder-bolt. Awake, awake great souls! The world is burning in misery, can you sleep?” রাজনীতি দিয়েও দেশের উপকার হবে না, ধর্মের জয়ঢাক পিটিয়েও কিছু হবে না, অর্থনীতি দিয়েও অভাব মিটবে না আমাদের, আমরা যুবক সজের সভ্যরা একটা জিনিষ চাই, সে এই যে, দেশের ওপর মাতৃভূমির ওপর প্রেম—জ্বলন্ত প্রেম। সে প্রেম তোর আত্মা, তোর বিত্ত, তোর সন্তানের চেয়েও বড়। যে সেই জ্বলন্ত প্রেম নিয়ে গরীব বড়লোক, হিন্দু মুসলমান, জৈন খৃস্টান সকলকে সমান চোখে দেখতে পারবে, সেই শুধু পারবে। তবেই সমস্ত ভারতবর্ষ এক হবে। তোরা ভুল বুঝিসনে আমাকে, সিস্টার নিবেদিতাও সেদিন সেই কথাই বললেন—বড়দা’রও সেই মত।
হঠাৎ অনেকগুলো গলার আওয়াজ এক সঙ্গে উঠলো—ওই যে বড়দা এসে গিয়েছেন।
বড়দা এসেই জিজ্ঞেস করলে—কীসের কথা হচ্ছে?
শিবনাথ বললে-সেদিন আর একজনকে এক গোরা মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছে।
–কই? কোথায়?
–ওই যে ঘরের ভেতর রয়েছে।
ঘরে আসতেই চেহারা দেখে চমকে উঠলো ভূতনাথ।
ব্ৰজরাখালও কম বিস্মিত হয়নি। বললে—এ কী, বড়কুটুম?
ভূতনাথের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। কিন্তু মুখে কিছু বলবার ক্ষমতা নেই।
ব্ৰজরাখাল মাথায় হাত বুলোতে বুলোত বললে কাঁদছো কেন বড়কুটুম, কোনো ভয় নেই তোমার, আমাদেরই ‘যুবক সঙ্ঘে’ রয়েছে, এখানে কোনো অসুবিধে হবে না তোমার, কদম রয়েছে শিবনাথ রয়েছে, বরং বড়বাড়িতে থাকলে দেখাশোনা করতে কে? তারপর শিবনাথের দিকে চেয়ে বললে—আরে এ যে আমার বড়কুটুম হয়—কোথায় পেলি একে!
যাবার সময় ব্ৰজরাখাল বলে গেল—আসবো আবার আমি, এখন কিছুদিন বড় ব্যস্ত আছি।
সে কতকাল আগের কথা! গোলদীঘির ধারের সেই যুবক সঙ্ঘের’ ঘরটাতে ভূতনাথ তারপরেও কতদিন গিয়েছে। জীবনের এক সন্ধিক্ষণে নিতান্ত অসহায়ের মতন যে কয়েকদিন সে শুয়ে পড়েছিল ওখানে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে তার স্মৃতি যেন জড়িয়ে আছে। শুয়ে শুয়েই সব দেখতে সব শুনতে সে। ছেলেরা কুস্তি করতে, মুগুর ভাজতে লাঠি খেলতে আর গান করতে। কয়েকটা গান এখনও মনে আছে—
“মা গো যায় যেন জীবন চলে
বন্দে মাতরম বলে–
বেত মেরে কি মা ভোলাবে
আমি কি মা’র সেই ছেলে!
দেখে রক্তারক্তি বাড়বে শক্তি
কে পালাবে মা ফেলে–”
আর একটা গান–
“শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত মোরা
অভয়া চরণে নম্র শির।
ডরি না রক্ত ঝরিতে ঝরাতে
দৃপ্ত আমরা ভক্তবীর–”
নিবারণের কথাও মনে পড়লো। ছেলেটা মাথার কাছে বসে ছিল। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। সামনের আখড় ফাকা। কারো গলার শব্দ আসছে না। হঠাৎ মাথার কাছে একটা শব্দ হতেই ভূতনাথ চোখ তুলে দেখলে কে যেন বসে আছে তার দিকে চেয়ে।
নিবারণ বলেছিল নিচু হয়ে কিছু কষ্ট হচ্ছে আপনার?
ভূতনাথ শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখেছিল নিবারণের মুখের দিকে। কিছু কথা বলেনি।
নিবারণ শেষে নিজেই বলেছিল—একটু জল খাবেন?
জল খেয়েও ভূতনাথ তেমনি তাকিয়ে আছে দেখে নিবারণ বলেছিল—কিছু বলবেন আমাকে?
ভূতনাথ বলেছিল—তুমি কে?
নিবারণ বলেছিল—আমি নিবারণ, আমায় চিনতে পারবেন না—আমি ‘আত্মোন্নতি সমিতি’ থেকে নতুন এসেছি—আপনার কাছে রাত্রে থাকবে।
ভূতনাথ বললে–’আত্মোন্নতি সমিতি’ কোথায়?
–আগে খেলা ইনস্টিটিউশনে বসতে—এখন যুবক সঙ্ঘের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, যেদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের ফিরিঙ্গীদের সঙ্গে মারামারি হয়, সেদিন থেকেই ঠিক হয়েছে দুটো সমিতি এক হয়ে যাবে। ফিরিঙ্গীগুলো বড় অত্যাচার আরম্ভ করেছে কিনা, যাকে তাকে রাস্তায় মারধোর করছে। আমরাও ঠিক করেছি ফিরিঙ্গী ছোকরা দেখলেই মারব, কিন্তু কদমদা’ বলে, ওতে কাজ হবে না, তাই নিয়েই তো আজকে মিটিং ছিল আমাদের।
–মিটিং-এ কী ঠিক হলো।
—ঠিক হলো না কিছুই, বড়দা’ হাজির ছিলেন না।
—বড়দা’ কে?
–ব্ৰজরাখালবাবু, উনিই আমাদের প্রেসিডেন্ট কিনা।
ব্ৰজরাখাল! নামটা শুনেই ভূতনাথ যেন আশ্চর্য হয়ে গেল। একথা তো ব্রজরাখাল কখনও বলেনি।
নিবারণ কিন্তু তখন নিজের মনেই বলে চলেছে—কিন্তু কদমদা’ যাই বলুন, আমরা ঠিক করেছি আমরাও আমাদের নিজেদের পথে চলবে। বৃটিশ রাজত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন মনুষ্যত্ব বজায় রেখে বেঁচে থাকা কঠিন।
আজো মনে পড়ে সেদিনকার নিবারণের সেই কথাগুলো। কী জ্বলন্ত আগুনের ফুল্কির মতো সব ছেলে। কথাগুলো যেন আজো কানে বাজছে। সেই ২২শে জুন তারিখের ঘটনা যেন তার কণ্ঠস্থ। মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ডায়মণ্ড জুবিলী উৎসবের পর পুণার গণেশখণ্ডের লাটসাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিল প্লেগ কমিশনার র্যা সাহেব। দুর্দান্ত বদমাইশ সাহেব। সামনে গিয়ে মুখখামুখি দাঁড়িয়ে খুন করলে দুই ভাই দামোদর চাপেকার আর বালকৃষ্ণ চাপেকার। শিবাজী মহারাজার বংশধর। বাঙলার বিপ্লব আন্দোলনের সেই তো আরম্ভ। আর সেই চাপেকার সঙ্ঘের সদস্যরাই তো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরু। সে বুঝি ১৮৯৯ সাল। একদিন শেষ রাত্রে দুই ভাই-এর ফাসি হয়ে গেল নিঃশব্দে। কিন্তু যে-বিশ্বাসঘাতকরা চাপেকার ভাইদের ধরিয়ে দিলে, তারাও তো প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত।
