-হ্যাঁ ভাই, বিন্দির কাছেও আর যাই না।
–কেন?
—বিয়ে করছি।
ভূতনাথও এবার অবাক হলো। বললে-বিয়ে?
ছুটুকবাবু জিজ্ঞেস করলেন—ননীলালকে আপনি চিনলেন কেমন করে ভূতনাথবাবু?
—ও যে আমার সঙ্গে এক ক্লাশে পড়েছে, আমাদের গায়ের স্কুলে।
কিন্তু ননীলালের তখন বাজে আলোচনা করবার সময় নেই। বললে—সেই জন্যেই তো এসেছি তোর কাছে, কিছু টাকা চাই আমার, বিয়ের পর সব শোধ করে দেবে। বেশি না এক হাজার টাকা।
ছুটুকবাবু কিছু কথা বললেন না। একটা সিগারেট ননীলালকে দিয়ে নিজে আর একটা ধরালেন। লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে ননীলাল বললে—সত্যি বলছি, টাকাটার বিশেষ দরকার, তারা তো জানে না, বাড়ি-টাড়ি সব বাঁধা পড়ছে। জানে বড়লোক, টাকার অভাব নেই। তা যা হোক, এবার আমিও ভাই তোর মতন বিয়ের পর সাধু হয়ে যাবে, সত্যি বলছি
ছুটুকবাবু বললেন—সে সব কথা থাক—বিয়ে করছিস কোথায়, মেয়ে কেমন? ননীলাল বললে-মেয়েমানুষের নেশা আমার চলে গিয়েছে ভাই, এখন শুধু টাকা চাই—টাকার বড় দরকার—ওদের অগাধ টাকা, ওখানে বিয়ে হলে সারাজীবনের মতো টাকার ভাবনাটা ঘুচবে—কিন্তু তার আগে আমার নিজের খরচটার জন্যে হাতে কিছু টাকা চাই।
ছুটুকবাবু আবার বললে—বিয়ে করছিস কোথায়?
ননীলাল টপ করে কথাটার জবাব দিতে পারলে না। একবার ভূতনাথের দিকে চাইলে। যেন সঙ্কোচ হচ্ছিলো। ভূতনাথ উঠলো। হয় তো গোপনীয় কোনো কথা আছে। বললে—আমি এখন উঠি ছুটুকবাবু—পরে আসবে।
বংশীর ভাইটার চাকরির কথা বলতেই আসা। হলো না। তা পরে হবে একদিন।
বাইরে আসতেই বংশী ধরেছে। বললে-বলেছেন আজ্ঞে?
-না রে, বলা হলো না, একজন বন্ধু এসে পড়লোতা তোর ভাবনা নেই, বলবো’খন একদিন।
আজ সেই বংশীও নেই, তার ভাই-এর চাকরিটাও হয়নি সেদিন। কিন্তু সে-চাকরির উপলক্ষ্যে ছুটুকবাবুর কাছে না গেলে তো
ননীলারের সঙ্গে দেখাও হতে না ভূতনাথের। অথচ সমস্ত সর্বনাশের বীজ বুঝি সেইদিন প্রথম বোনা হয়ে গেল। শুধু ভূতনাথের জীবনেই বা কেন? ওই ছোটবাবু, ওই পটেশ্বরী বৌঠান সকলের জীবনের ওপরই এক ধূমকেতুর মতন আবির্ভাব হলো ননীলালের। ননীলাল যেন উনবিংশ শতাব্দীর বণিক সভ্যতার বিষ! বিষের আঙুর। আজ ঘরে ঘরে সে আঙুরের চারা গজিয়েছে যেন। কিন্তু সেদিন সেই অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনাটা না ঘটলে হয় তত বড়বাড়ির ইতিহাস অন্যরকম করে লেখা হতো।
‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিস থেকে বেরিয়ে ভূতনাথ হাঁটা পথে আসছিল। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। বাগবাজারের ভেতর দিয়ে গলি রাস্তা। চারদিকে অন্ধকার। দু’ পাশের নর্দমার নোংরা এড়িয়ে রাস্তার মধ্যেখান দিয়ে আসতে হয়। ছাড়া ছাড়া খোলার বাড়িতে টিমটিমে বাতি। দুটো রাস্তার মোড়ের কাছে সেই দিশী মদের দোকানটার কাছে আসতেই নাকে গেল চেনা গন্ধ। এড়িয়েই যেতে চেয়েছিল ভূতনাথ। রাস্তার ওপরেই বসে বসে কয়েকজন ভাঁড়ে করে মদ খাচ্ছে। সুর ভাঁজছে। হল্লা করছে। একজন গাইছে—
পোড়ারমুখী কলঙ্কিনী রাই লো।
ওলো রাধে, রাজার মেয়ে,
ভুলে গেলি রাখাল পেয়ে, ছি লো,
খাসা দৈকে ফেলে দিয়ে কাপাস খেলি তুই লো,
লাজে মরে যাই লো—
আর একজন পাশ থেকে সমের মাথায় চিৎকার করে উঠলো–হ্যাঁ হা হা হাঃ…
অন্ধকারে মূর্তিগুলোকে সব দেখা যায় না। হট্টগোলের মধ্যে কয়েকটা মাতালের নৈশ-উল্লাস। কিন্তু এমন সময়েই কাণ্ডটা ঘটলো। হঠাৎ সামনে একটা মূর্তিকে দেখে যেন চিনতে পারলে ভূতনাথ। সেই জবাদের বাড়ির পুরোনো ঠাকুরটা না? কিন্তু সামলে নেবার আগেই একটা আস্তো থান ইট ভূতনাথের মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়েছে। মাতাল ঠাকুরটার কথাগুলোর কিছু অংশ যেন কানে গেল—শালার কেরানীবাবুকে দে শেষ করে–
তারপর আর কিছু মনে নেই ভূতনাথের।
১৭. তখন বিংশ শতাব্দীর শুরু
তখন বিংশ শতাব্দীর শুরু। লর্ড কার্জনেব রাজত্ব। আজও সাইকেল-এ যেতে যেতে স্পষ্ট মনে পড়ে সব। সেদিনকার আঘাতে সে যে মরেনি এই-ই তো আশ্চর্য! গোলদীঘির ধারেই বুঝি কোন্ একটা বাড়িতে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাকে।
প্রথম যখন চোখ মেললে, দেখলে—একটা পাকা ঘর। পুরোনো ময়লা দেয়াল। চারিদিকে লাল কালিতে লেখা-“বন্দেমাতরম্। কয়েকজনের গলা শোনা যাচ্ছে। জানালা খোলা ছিল। দেখা যায়—সামনে কুস্তির আখড়া। বাইরে বিকেল হয়ে এসেছে। সমস্ত শরীরে ব্যথা! একটু ওঠবার চেষ্টা করতেই কে একজন এসে ধরলে। কামিজ পরা, অল্প অল্প দাড়ি গোঁফ উঠেছে। চেহারাটা যেন চেনা চেনা মনে হলো।
মাথাটা ধরে বললে—এখন উঠতে চেষ্টা কোরো না ভাই। তারপর কাকে যেন ডেকে বললে—শিবনাথ আর একটু দুধ আনো তো।
শিবনাথ দুধ এনে দিতে লোকটি বললে—এটুকু খেয়ে নাও দিকি।
দুধ খেয়ে আবার যেন একটু তন্দ্রা এসেছিল খানিকক্ষণ। আবার যখন তন্দ্রা ভাঙলে কানে এল কাদের কথাবার্তা। বেশ অন্ধকার হয়েছে চারিদিকে। একটা হারিকেন জ্বলছে টিম টিম করে। ভূতনাথ মনে মনে ভাবছিল এ কোথায় এল সে। যারা একটু আগে এসে তাকে দুধ খাইয়ে গিয়েছে, তারা বোধ হয় বাইরেই রয়েছে।
কে একজন বলছে—কদমদা’, এবার ওদের একটা শিক্ষা দিতেই হবে। কালকে গড়ের মাঠেও একজন গোরা বুটের লাথি মেরে
একজনকে একেবারে অজ্ঞান করে দিয়েছে।
—গোরাতে একে মেরেছে জানলি কী করে?
–গোরাতে না মারলে কি ভূতে মারতে এল?
-গুণ্ডাও তো হতে পারে? নিজের চোখে তো দেখিসনি তুই? কলকাতার রাস্তায় গুণ্ডাও তো কম নেই আর তা ছাড়া একটা গোরাকে মেরেও তো লাভ হবে না কিছুক’টা গোরাকে সামলাবি? শেষকালে কেল্লা থেকে যখন হাজার হাজার গোরা বেরিয়ে মারতে শুরু করবে তখন বাঙালীরা পালাবে কোথায়? সাহস তো খুব বোঝা গিয়েছে। একটা কুস্তির আখড়াতেই মেম্বর যোগাড় করা যায় না।
