কেমন অস্বস্তি লাগতে লাগলো ভূতনাথের। কিছুতেই যেন ঘুম আসছে না। হয় তো পটেশ্বরী বৌঠানের দুঃখটাই আজ তাকে বড় অভিভূত করে দিয়েছে। মনে হলো—এখন এই সময়ে প্রাণ ভরে বায়া-তবলা বাজাতে পারলে হত। তবলায় চাটি দিয়ে মনের সমস্ত দুর্ভাবনাগুলোকে হয় তো এড়াতেও পারা যেত। কিন্তু হঠাৎ একটা আচমকা শব্দে চমকে উঠেছে ভূতনাথ।
-কে?
—আমি, এখনও ঘুমোওনি বড়কুটুম?
—এত দেরি হলো? তোমাকে এক ভদ্রলোক খুজতে এসেছিলেন।
আলো জ্বললে ব্ৰজরাখাল। তারপর গায়ের জামা খুলে ফেললে। বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে ব্রজরাখালকে।
-আজ সারাদিন খাওয়া হয়নি, কিছু খাবার আছে বড়কুটুম?
—মুড়ি আছে, খাবে? দিচ্ছি—আমি আজ রাঁধিনি, বাইরে খেয়েছি। বলে ভূতনাথ টিনের কৌটা থেকে মুড়ি বার করে দিলে। সারা গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে ব্রজরাখাল মুখ হাত-পা ধুয়ে এল। হাত-পা গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে বললে—সারাদিন খুব ঘোরাঘুরি গেল, শেয়ালদা’ থেকে গেলাম রিপন কলেজে, সেখান থেকে বাগবাজারে রায় বাহাদুর পশুপতি বোসের বাড়ি, তারপর সেখান থেকে স্বামিজী আর সেভিয়ারদের নিয়ে গেলাম কাশীপুরে গোপাললাল শীলের বাগানবাড়িতে। ওঃ, খুব সাজিয়েছে বাগানবাড়িটা।
—দুটি খেয়ে নিলে না কেন ওরই মধ্যে? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে।
—সময় পেলাম না। কাল আবার সক্কালবেলাই ছুটতে হবে কাশীপুরে, সন্ধ্যেবেলা আবার যেতে হবে আলমবাজারের মঠে।
তেল-মাখা মুড়ির বাটিটা হাতে নিয়ে ব্ৰজরাখাল বললে-কে খুজতে এসেছিল বললে?
-কদমকেশর বোস নামে এক ভদ্ৰলোক।
-কেন, কিছু বলেছে?
-তোমায় বলতে বলেছে যে, মেছোবাজারের ফুলবালা দাসীর দুপুর থেকে ভেদবমি শুরু হয়েছে, একটু ওষুধ চাইছিল।
—ভেদবমি? তবে আর খাওয়া হলো না বলে উঠলো ব্ৰজরাখাল। আবার জামা গায়ে দিয়ে পায়ে জুতো গলিয়ে নিলে।
ভূতনাথ বললে—আবার চললে নাকি?
-যেতেই হবে।
–কাল সকালে গেলে চলে না?
—কাল সকালে অনেক কাজ—বলে বাইরে বেরোলো ব্রজরাখাল।
—মুড়ি ক’টা খেয়ে যাও। কিন্তু কথাটা হয় তত শুনতে পেলে না ব্ৰজরাখাল। ততক্ষণে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে সে। বাইরে শীত-শেষের রাত। ইব্রাহিমের ঘরের ছাদের কোণের টিমটিমে আলোতে অস্পষ্ট ছায়ামূর্তিটা উঠোনের উপর একবার দেখা গেল শুধু। যেন হাঁটছে না, দৌড়চ্ছে।
ভূতনাথ ঘরের দরজা বন্ধ করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো। ছুটুকবাবুর ঘর থেকে তখনও গানের সুর ভেসে আসছে—’চামেলি ফুলি চম্পা, বিশ্বম্ভরের গলা। কান্তিধরের তবলার চাটি। আর ওদিকে দক্ষিণের বাগানের কোণ থেকে দাসু জমাদারের ছেলের বাঁশিতে ‘বিমঙ্গলের’ গান-‘ওঠা নামা প্রেমের তুফানে—‘
» ১৬. আজো মনে আছে সেটা শুক্রবার
আজো মনে আছে সেটা শুক্রবার। কী একটা উপলক্ষ্যে বুঝি ছুটি ছিল। বংশী এল। বললে—ছুটুকবাবু একলা আছেন, এখন আজ্ঞে দেখা করলে চাকরিটা হয়ে যায়। শশীর কাছে শুনতাম ছুটুকবাবু আপনাকে খুব পছন্দ করেন কিনা।
শেষ পর্যন্ত যেতে হলো।
ঠিক সন্ধ্যে হয়নি তখনও। গানের আসর বসতে তখনও দেরি আছে। একটা তাকিয়া হেলান দিয়ে কী একটা বই পড়ছিলেন ছুটুকবাবু। কোঁচানো ধুতি। ঢেউ ভোলা বাবরি ছাঁট চুল।
পাশে পানের ডিবে। জরদার কৌটো। সিগারেট। আর মেঝের ওপর গড়গড়া। বোধ হয় একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছেন।
ভূতনাথকে দেখতে পেয়ে বললেন—আসুন স্যার, কী খবর–অনেক দিন পদধূলি পড়েনি।
ভূতনাথ বসলো গদির ওপর।
ছুটুকবাবু বললেন-কালকে এলেন না, বেনারসের ওস্তাদ আনোয়ার আলী এসেছিল, আহা-হ্যাঁ কী আলাপ আর কী খেয়াল গাইলে যে কী বলবো, যেমন তৈরি গলা তেমনি লয়-জ্ঞান, সঙ্গত করছিল বৈজু। যাই বলুন বৈজুর হাত বড় মিঠে স্যার, রাত তিনটের সময় দরবারি কানাড়ার খেয়াল ধরলে একখানা—আ হা হা কোথায় লাগে আপনাদের ইয়ে। তারপর একটু থেমে বললেন–আমাদের বাড়িতেই ছোটবেলা গান শুনেছি কজ্জন বাঈ-এর দোলের দিন। সে কী নাচ আর গান। আমার বাবা মশাই-এর বন্ধু ধর্মদাসবাবু ড়ুগি-তবলা বাজিয়েছিলেন। আমরা স্যার তখন ছোট, দপ্তরখানার ভেতর দরজার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছিলুম। নাচতে নাচতে সোনার থালা থেকে ঠোট দিয়ে সবগুলো মোহর তুলে নিলে। তারপর আর একবার তাকে দেখেছিলাম অনেক দিন পরে, সে চেহারা আর নেই। মেজকাকীর কাছ থেকে ভিক্ষে চেয়ে নিয়ে গেল। অনেক বল কওয়াতে একটা গান গাইলে–-বাজু বন্দ, খুলু খুলু যায়–ভৈরবীর রে-গা-ধা-নি-র মোচড়গুলোতে তখনও যেন যাদু মেশানো রয়েছে। সেই কজ্জন বাঈ-এর গান শুনেছিলুম আর কালকের আনোয়ারের দরবারি,আ-হা-হা-
গানের গল্প আর থামতে চায় না ছুটুকবাবুর। একটু ফুরসত পেতেই ভূতনাথ বংশীর কথাটা আরম্ভ করতে যাচ্ছিলো, হঠাৎ বাধা পড়লো। কে যেন ঘরে ঢুকছে। সামনে চেয়েই ভূতনাথ
অবাক হয়ে গেল। ননীলাল!
ননীলালও বেশ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছে। বললে-আরে, ভূতনাথ যে! তারপর ছুটুকবাবুর দিকে চেয়ে বললে-চূড়ামণি, একটা কাজে এলুম তোর কাছে।
ছুটুকবাবুও যেন বেশ খুশি। বললে—কাজ হবে’খন—তোর খবর কী? বিন্দির খবর কী?
–বিন্দি ভালো আছে, তোর খবর জিজ্ঞেস করে। আমি বলি সে এখন সাধু হয়ে গিয়েছে, গান বাজনা নিয়ে আছে, কিন্তু আজকে সে-সব গল্প করবার সময় নেই—এখনি যেতে হবে।
ছুটুকবাবু বললে—সে কী রে, একটু বোস। সরবৎ খা।
—না ভাই, ও-সব ছেড়ে দিয়েছি।
কথাটা ছুটুকবাবুর কাছে যেন বিশ্বাস না হবার মতো। বললে সে কী?
