চিন্তা আসতে বৌঠান বললে-বংশীকে একবার ডেকে দে তো এখেনে।
বংশী আসতে বৌঠান বললে—ছোটবাবু আজ কখন বেরিয়েছে রে?
–আজ্ঞে সন্ধ্যে সাতটার সময়।
-আচ্ছা, কালকে দুপুরবেলা একবার আমার ঘরে নিয়ে আসতে পারবি ছোটবাবুকে? বলবি—আমার ভীষণ অসুখ, একবার যেন দেখতে আসেন। যে-কোনো রকমে একবার তোকে এ-ঘরে আনতেই হবে ছোটবাবুকে, আর চিন্তা, তুই রাঙাঠাকমাকেও বলে দিস আমার অসুখ—আমি কিছু খাবো না আজ।
বংশী বললে—ছোটবাবু যে দুপুরে ঘুমোবে।
—ঘুম থেকে ওঠার পর বলবি।
—সেই ভালো।
–আচ্ছা এবার যা।
বসে বসে ভূতনাথের কেমন অস্বস্তি লাগছিল। এই সুযোগে বললে—আমিও তা হলে এবার আসি বৌঠান।
-তুমি একটু বোসো, এত তাড়া কিসের তোমার, কোনো কাজ আছে?
ভূতনাথ বললে—না, কাজ নেই।
—তবে, লজ্জা করছে বুঝি? সেদিন মেজদিও তত বলছিলেন— ছেলেটি লাজুক বড়।
—মেজদি কে?
–এ-বাড়ির মেজগিন্নি, এই পাশের ঘরেই থাকেন। আমাকে প্রথম দিনেই জিজ্ঞেস করেছেন—কে তোর ঘরে এসেছিল রে ছোটবউ? আমি বললাম—আমার গুরুভাই। এ-বাড়ির ভেতরে এমন করে আগে আর কখনও বাইরের পুরুষমানুষ আসেনি তো, তা আজকাল এ-বাড়ির নিয়ম-কানুন তো একটু একটু করে ভাঙছে, মেজদি’র বাবাও এখন এই অন্দরমহলে আসেন—তা আমিই বা..
কথা অসমাপ্ত রেখে বৌঠান থামলো। তারপর আবার বললে-আজই তোমার সঙ্গে হয় তত শেষ দেখা ভূতনাথ, এ-বাড়িতে বউদের সঙ্গে সাধারণত কেউ কথা বলতে পায় না, আমারও আর দেখা পাবে না, কিন্তু দিদিকে মনে রেখো—আর তোমার যদি কোনো উপকার করতে পারি, দরকার হলে বংশীকে দিয়ে খবর পাঠিও—কেমন?
ভূতনাথ উঠলো। তারপর যশোদাদুলালের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে প্রণাম করলে একবার।
বংশী এসে আবার তেমনি করে নিচে নিয়ে গেল সঙ্গে করে।
ভূতনাথের মনটা কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে রইল অনেকক্ষণ। আর দেখা হবে না! একটা সামান্যতম উপলক্ষ্যকে আশ্রয় করে দু’দিনের সামান্য পরিচয়। কিন্তু তবু পটেশ্বরী বৌঠানের সঙ্গে যেন একটা পরম আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল দু’দিনেই। এতখানি স্নেহকরুণ আত্মীয়তা ভূতনাথ যেন জীবনে কখনও পায়নি আগে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সেই কথাই ভাবছিল ভূতনাথ। উঠোনের ওপর এসে দাঁড়াতেই বংশী বললে—একটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে শালাবাবু।
-আমার সঙ্গে।
—আজ্ঞে হ্যাঁ, একটা কাজ করে দিতে হবে আপনাকে, আপনিই পারেন।
-কী কাজ, বল না।
—ছুটুকবাবুর আসরে তো আপনি তবলা বাজাতে যান, ওঁর একটা চাকরের দরকার, আমার ভাই-এর জন্যে যদি বলেন একটু
—কেন, ছুটুকবাবুর চাকরের কী হলো?
—আপনি সে-কাণ্ড জানেন না?
–কিসের কী কাণ্ড?
–শশীকে ছুটুকবাবু যে তাড়িয়ে দিয়েছে।
শশীর কথাটা মনে পড়লো এতক্ষণে। আজই তো সন্ধ্যেবেলা দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। বললে—শশী যে আমার কাছে পয়সা চাইছিল, আজই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে রাস্তায়।
—তাই নাকি, ছোঁবেন না আজ্ঞে ওকে।
—কী হয়েছিল তার?
—পারা, পারা ঘা বেরিয়েছিল সারা গায়ে মুখে—এক সঙ্গে শোয়া-বসা করি, শেষকালে ছোঁয়াচ লেগে আমাদের হোক আর কি—মধুসূদন কাকাকে গিয়ে লোচন বলে দিলে। মধুসূদন কাকা বলে দিলে ছুটুকবাবুকে, সরকার মশাই খাজাঞ্চীখানার খাতা থেকে নাম কেটে দিলে ওর।
ভূতনাথ বললে–বেচারি বলছিল বড় কষ্টে পড়েছে, দেশে যাবার পয়সা নেই।
—তা তখন মনে ছিল না। আমরা পইপই করে মানা করেছি আজ্ঞে, ও-সব বাবুদের পোষায়, টাকা আছে, রোগ সারিয়ে ফেলে, ছুটুকবাবুর হয়েছিল—সেরে গেল—কিন্তু ভদ্দরলোকের বাড়িতে ও-রোগ হলে সে-চাকরকে রাখবে কেন?
বংশী একটু থেমে বললে—তা আজ্ঞে ওই জায়গায় আমার ভাইকে আপনি ঢুকিয়ে দিন না ছুটুকবাবুকে বলে।
–আচ্ছা বলবো-বলে ভূতনাথ নিজের ঘরে এল। ব্রজরাখালের ঘরের দিকে চেয়ে দেখলে একবার। এখনও আসেনি। এখন ব্রজরাখাল ব্যস্ত বড়। সেই কদমকেশর বোস। ভদ্রলোকের জরুরি কাজ ছিল ব্রজরাখালের সঙ্গে। ফুলদাসী মৃত্যু শয্যায়। কে জানে কত কাজ—কত প্রতিষ্ঠান ব্রজরাখালের। ঠাকুরের নাম প্রচার করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দ এসেছেন। কাজ আরো বেড়ে গিয়েছে। বেদান্ত আর অদ্বৈতবাদ প্রচার করতে হবে। মিস্টার আর মিসেস সেভিয়ারও সঙ্গে এসেছেন শিষ্য হয়ে। সাহেব মেম শিষ্য—এ-কেমন জিনিষ। কিসের আকর্ষণে এসেছে ওরা।
অন্ধকার ঘরের ভেতর বিছানায় শুয়ে রইল ভূতনাথ। হঠাৎ যেন সমস্ত বড়বাড়ি একটা গুঞ্জন শুরু করলো। মৃদু কিন্তু স্পষ্ট। ভূতনাথের মনে হলো—কবে ১৩৪৫ সালে কে ঘড়ি তৈরি করেছিল প্রথম, সেই ঘড়ির কল-কজা ধীরে ধীরে আজ বুঝি চলতে শুরু করেছে। আজ এতদিন পরে। বদরিকাবাবুর কথাই বুঝি সত্য হবে। সব লাল হয়ে যাবে। কিন্তু লাল কেন হবে? এ-বাড়ির প্রত্যেকটা ইট কি টের পেয়েছে? কবে মোগল বাদশাহদের আমলে এ-বাড়ির পূর্বপুরুষ জমিদারীর সনদ পেয়েছিল। পেয়েছিল কোতল করবার অধিকার। কবে হাজার হাজার লাঠিয়ালের আঘাতে গ্রাম-জনপদ ভীত-বিপর্যস্ত হয়ে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কত নারীর সৌন্দর্য-সৌজন্য-শালীনতা আর সতীত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে এ-বাড়ির পূর্বপুরুষ! এই চৌধুরী পরিবারের অত্যাচারের তরঙ্গ কত সুদূর সীমান্তে গিয়ে গ্রামবাসীদের অভিশাপকে থামিয়ে দিয়েছে! বদরিকাবাবুর কাছে সব সেদিন শুনেছে ভূতনাথ। আর শুধু কি এর! কলকাতার প্রাচীন সমস্ত বংশের ইতিহাসের পেছনে যে-মর্মান্তিক বিশ্বাসঘাতকতা আর জাতিদ্রোহিতার কলঙ্ক লুকিয়ে আছে, আজ এই রাত্রে সব যেন একসঙ্গে তারা মুখর হয়ে উঠলো। ওই যে বদরিকাবাবু শুধু নিষ্ক্রয় হয়ে বসে বসে দর্শকের ভূমিকায় অভিনয় করে যায়, ওর ব্যথা কে বুঝবে? বোঠান বুঝি কাঁদছে এখন তেতলার অন্দরমহলের একান্তে। কে ঘোচাবে তার দুঃখ? ননীলালের জন্যে কি কেউ দায়ী নয়? আর ওই সুবিনয়বাবু! তার স্ত্রী উন্মাদগ্ৰস্ত কার শাপে! শশী কেন হঠাৎ বেকার হয়ে যায়? একদিন জলাভূমির ওপর যে শহরের পত্তন হয়েছিল জব চার্নকের আমলে, সেই শহর আজ দিনে দিনে সৌধমালায় সেজে উঠেছে কি অকারণে? ছুটুকবাবুর ঘর থেকে তখনও গানের আলাপ কানে আসছে’চামেলি ফুলি চম্পা। পাশের জানালা খোল ছিল। ওধারে দক্ষিণের বাগানে বুঝি দাশু জমাদারের ছেলে বাঁশি বাজাচ্ছে। ‘বিল্বমঙ্গলের’ গানের সুর—’ওঠা নামা প্রেমের তুফানে।‘ ভূতনাথের মনে হলো—সমস্ত কলকাতা শহর যেন কাঁদছে। তার প্রথম জীবনে ভূতনাথ যে-বেজিটা পুষেছিল, সেই বেজিটা মরবার দিন ঠিক এমনি অদ্ভুত সুরেই কেঁদেছিল যেন।
