ভদ্রলোক ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন—তা চিনবেন বৈকি! উনি আর শিবনাথ শাস্ত্রী ফুলবালাকে পাদরীদের হাত থেকে বাঁচালেন, হিন্দুর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন, সেই ফুলবালা আবার বিধবা হলো। একটা পয়সা নেই হাতে যে, নিজের পেটটা চালায়,ওই ব্ৰজরাখালবাবু না থাকলে ফুলবালা হয় তো দেখতেন কবে খৃস্টান হয়ে যেতো। নিজের পকেট থেকে মাসোহারা দিয়ে এতদিন চালাচ্ছেন–আর নামটা ভুলে যাবেন? আর যদিই চিনতে না পারেন তো বলবেন কদম এসেছিল।
–কদম?
–হ্যাঁ, আমার নাম। আমার ডাক-নাম। আর পুরো নামটা যদি মনে থাকে তো বলবেন—যুবক সঙ্ঘর কদমকেশর বোস। তারপর যাবার সময় বললে—উনিই তো যুবক সঙ্ঘের প্রেসিডেন্ট কি না।
হন হন করে ভদ্রলোক চলে গেলেন। এতক্ষণে ভূতনাথ ভালো করে দেখবার চেষ্টা করলে–কামিজ গায়ে, অল্প-অল্প দাড়ি গোঁফ উঠেছে। অন্ধকারে ঠিক ঠাহর হয় না, তবু বেশি বয়স হয়নি যেন ভদ্রলোকের। লোকটি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাবার পর ভূতনাথ বাড়ির ভেতর আবার ঢুকলো।
১৫. সেদিন আবার
সেদিন আবার।
রাত হয়েছে বেশ। সেদিনও রাত্রে যথারীতি অন্দরমহলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সোজা তেতলায়। আগে আগে বংশী পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ভূতনাথ। সদুর ঘরে তখনও টিম টিম করে আলো জ্বলছে। তরকারি কোটা শেষ করে তখন জানালার ধারে বসে পান সাজছে সদু। যদুর মা অত রাতেও একমনে শিল-নোড়া নিয়ে বাটনা বেটে চলেছে। সদু পান সাজে আর বক বক করে বকে চলে—শীতের মরণ, শীতের ছিরিছাঁদ নেই, একটু তেল নেই যে পায়ে দিই মা, পা ফেটে একেবারে অক্ত বেরোচ্ছে গা, ভোলার বাপ থাকতে পায়ের কি এই দশা ছিল? মিনসে মোল আর কপাল পুড়লো আমার—মিনসে মরেচে তত হাড় জুড়িয়েছে, কিন্তু একটা মরা-হাজা ছেলে তাকেও সঙ্গে নিয়ে গেল গা মিনসে বলতো-ফুলবউ—তিভুবনে কেউ কারো নয়।
দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বাঁ দিকে কর্তাদের শোবার ঘর। এখন অন্ধকার। বারান্দায় মাদুর পেতে বসে বেণী তখন একমনে মেজবাবুর কাপড় কোঁচাচ্ছে। তারপর দোতলা আর অন্দরমহলের তেতলার মধ্যেকার পোলটা পেরিয়ে ওধারে যেতে হবে।
বংশী বললে—এখানে একটু দাঁড়ান শালাবাবু—দেখি বড়মা এখন রাস্তায় আছে কিনা।
ভাগ্য ভালো বলতে হবে। বড়বো তখন নিজের ঘরে। বংশী ফিরে এসে বললে—আসুন।
একেবারে বরাবর ছোটমা’র ঘর। বংশী ভেতরে ঢুকে খবর দিলে। চিন্তা বেরিয়ে এল।
—যান, ভেতরে যান।
সেদিনও বৌঠানকে যেমন দেখেছিল ভূতনাথ, আজও তেমনি। তেমনিই অবিসম্বাদী রূপ। তবু অনেক না পাওয়ার প্রাচুর্য যেন অনেক পাওয়াকে ম্লান করে দিয়েছে। হয় তো বৌঠানের ইতিহাস শোনা ছিল বলেই এ-কথা মনে হলো ভূতনাথের। কিন্তু হঠাৎ দেখলে বুঝি মনে হতো ওটা তার অহঙ্কারের আত্মপ্রকাশ। অহঙ্কারের সঙ্গে মিশে আছে প্রশান্ত মনের লালিত্য। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। সুখী কি দুঃখী—সে প্রশ্ন আর মনে আসে না। দু’চোখের শান্তগাম্ভীর্য যেন দর্শকের সমস্ত বিচার-বুদ্ধিকে শিথিল করে দেয়।
অথচ সেই মানুষ যখন কথা বলে। যাকে দেখলে শ্রদ্ধা হয়, শান্তি হয়, হয় তো খানিকটা ভয়ও হয়, তার কথা শুনলে যেন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
বৌঠান বসেছিল সেদিনকার মতো। একটু সরে বসে বললে–এসো ভাই।
ভূতনাথ বসে পকেট থেকে কৌটোটা বের করে দিয়ে বললে— এনেছি সেটা—কী ভাবে ব্যবহার করতে হবে সব লেখা আছে এতে।
তারপর ঠিক সেদিনকার মতোই চিন্তা আবার ঘরে ঢুকলো এক থালা খাবার নিয়ে।
ভূতনাথ বললে—আমি এত খেতে পারবো না বৌঠান।
খিদে যে পায়নি ভূতনাথের তা নয়, কিন্তু বৌঠানের সামনে বসে খেতে কেমন লজ্জা-লজ্জা করে। কিন্তু বৌঠানও ছাড়বার পাত্রী নয়। বললে—না খেলে আমি কথাই বলবো না তোমার সঙ্গে। সব খেতে হবে।
সত্যিই খেতে হলো। খাওয়ার শেষে বৌঠান বললে—একট বসো, আসছি, বলে,—উঠে পাশের ঘরে চলে গেল। এতক্ষণে নজরে পড়লো ভূতনাথের। পাশেই আর একটা ঘর। সেদিন নজরে পড়েনি। ঘরখানার চারদিকে আর একবার ভালো করে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। আলমারি ভর্তি পুতুলগুলো স্থির হয়ে রয়েছে কাচের ভেতরে। তাদের মধ্যে একটা বড় কাচের পুতুল যেন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে ভূতনাথের দিকে। সোনালি রূপালি পাড় বসানো শাড়ি-পর, গায়ে পুতির গয়না। হঠাৎ মনে হলো পুতুলটা যেন একবার নড়ে উঠলো। আশ্চর্য! যেন চোখের ইঙ্গিতে তাকে ডাকলে। ভূতনাথ আবার ভালো করে চেয়ে দেখলে। না, ওটা তো নিষ্প্রাণ পুতুল ছাড়া আর কিছু নয়।
বৌঠান আবার ঘরে এল। ননীর মত নরম আলতা-পরা পা দুটো ঘুরিয়ে আবার বসলো সামনে। হাতে একটা পাজি। পাঁজি খুলে পাতা উল্টে দেখে বৌঠান বললে–কাল তো একাদশী দেখছি
—দিনটাও ভালে—কালকেই এটা পরবো তা হলে।
তারপর ভূতনাথের দিকে চেয়ে বললে—ছোটকর্তার কোনো খারাপ হবে না তো এতে, ভূতনাথ? শরীর তো ওঁর ভালো নয়, জানো, মাঝে মাঝে ভোগেনও খুব, অত অত্যাচার শরীর সইকে কেন।
ভূতনাথ কী বলবে ভেবে পেলে না। খানিক পরে বললেএকদিন’পরেই দেখুন না।
-তাই ভালো।
তারপরে কী যেন ভাবতে লাগলো বৌঠান নিজের মনে। যেন চিন্তাগ্রস্ত। খানিক পরে মুখ তুলে বৌঠান বললে—আজ পর্যন্ত সজ্ঞানে মিথ্যে কথা বলিনি ভূতনাথ, কিন্তু হয় তো তাই-ই আমায় বলতে হবে। আমার যশোদাদুলাল জানে, আমি কারোর ওপর কোনো অন্যায় করিনি, কাউকে জীবনে একটুও কষ্ট দিইনি, তুমি ব্রাহ্মণ, তোমার কাছেও স্বীকার করছি। বাবার উপদেশ আমি বর্ণে বর্ণে মেনে এসেছি কিন্তু স্বামী-সেবার জন্যে তা-ও করবো আমি বলে ডাকলে—চিন্তা–
