জবা একটু পরেই গান আরম্ভ করলে—
নাথ তুমি ব্ৰহ্ম তুমি বিষ্ণু
তুমি ঈশ তুমি মহেশ
তুমি আদি তুমি অন্ত,
তুমি অনাদি তুমি অশেষ…
নিঃশ্বব্দে ভূতনাথ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। তখনও জবার গান চলেছে। কাল সকাল বেলা কাগজটা সই করালেই চলবে। টেবিল পরিষ্কার করে আরো খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে গানটা শুনতে লাগলো ভূতনাথ। গানে সত্যিই যেন জবার তুলনা নেই। অন্তত এই একটা বিষয়ে সে যেন সকলের চেয়ে বড়।
রাস্তা দিয়ে সোজা আসতে আসতে একবার সময়টা আন্দাজ করলে। ননী হয় তো হেদোর ধারে দাঁড়িয়ে আছে এতক্ষণ। বাঁ দিকের একটা গলি দিয়ে সোজা গেলেই হেদোর কোণটা পড়বে। ভূতনাথ হেদোর সামনে এসে দাঁড়াতেই চারপাশে নজর দিয়ে দেখলে। মনে হলো দক্ষিণ দিকের একটা আলোর নিচে যেন ননীলাল দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। কাছে যেতেই ভুল ভাঙলো। ননীলাল নয়, অন্য লোক। অনেকটা যেন ভৈরববাবুর মতন দেখতে। আরো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো ভূতনাথ। তবে হয়তো তার দেরি দেখে চলেই গিয়েছে। ভালোই হয়েছে। ভূতনাথ রাস্তায় পা বাড়িয়েই ভাবলে ভালোই হয়েছে। দেখা হয়ে গেলে আর এক কাণ্ড হতো। হয় তো এড়াতে পারতো না।
আবার বড়বাড়ির দিকে ঘোর পথ দিয়ে চলতে লাগলো ভূতনাথ। তাড়াতাড়ি পেঁছুতে হবে। বৌঠানকে সিঁদুরটা দিতে হবে আজ। হঠাৎ পেছনে কে যেন ডাকলে—শালাবাবু
অবাক হয়ে গিয়েছে ভূতনাথ। এখানে এত রাত্রে কে তাকে ওই নামে ডাকবে। ভালো করে দেখে ভূতনাথ বললে-শশী! তুই!
ছুটুকবাবুর চাকর-শশী! শশীর এ কী চেহারা হয়েছে। এত রাত্রে এখানে কেন? গানের আসর কি তবে বসছে না আজ?
শশী বললে—শালাবাবু কিছু পয়সা দিতে পারেন?
পয়সা! পয়সা তো সঙ্গে নিয়ে আসেনি ভূতনাথ। বললে—পয়সা কি হবে? আর এত রাত্রে এখানে কেন তুই? ছুটুকবাবু কোথায়?
—আজ্ঞে ছুটুকবাবু তাড়িয়ে দিয়েছে আমায়।
শণীর চুল উস্কোখুস্কো। মনে হয় যেন অনেকদিন খায়নি। অথচ শশীর চুলের কি বাহার ছিল। ঢেউ-খেলানো চুলটার কী কসরৎ করতে। কাল-পরশুই যেন দেখেছে বড়বাড়িতে।
—কেন, তোকে তাড়িয়ে দিলে কেন?
সঙ্গে সঙ্গে শশীও চলতে লাগলো। বললে—এতদিন ছুটুকবাবুর সেবা করলাম, আপনি তো দেখেছেন সব, গানের আসরে আমি না হলে চলতো না, রাত একটা দুটো পর্যন্ত আমি নিজের হাতে সিদ্ধি বেটেছি, গেলাশ সাজিয়েছি, এখন আমার অসুখ হতেই তাড়িয়ে দিলে।
ভূতনাথ ভালো করে শশীর আপাদমস্তক দেখলে। রোগটা কী! জিজ্ঞেস করলে রোগটা কি তোর?
শশী শালাবাবুর পায়ে হাত দিয়ে মাথায় ঠেকালে। বললে—এই বামুনের পা ছুঁয়ে বলছি, মাইরি শালাবাবু জগন্নাথের দিব্বি, আমার কোনো দোষ নেই, আমি বাড়ির বাইরে একটা রাতও কাটাই না, নেশা-ভাঙটা পর্যন্ত করি না, আমার নামে মিছিমিছি দোষ দিয়েছে গিরি।
—গিরি!
–হ্যাঁ, মেজমা’র ঝি গিরি।
—সে কেন লাগবে তোর পেছনে?
—আপনি সব জানেন না শালাবাবু, গানের আসর যখন শেষ হয়, তখন কতদিন ঘুম পায় আমার, কিন্তু তখন গিরি আসে ছুটুকবাবুর ঘরে। ছুটুকবাবু তখন নেশায় অজ্ঞান থাকে, আমি হেন চাকর বলেই সব কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করি।
ভূতনাথ যেন কিছু বুঝতে পারলে। গিরির চেহারাটা কল্পনা করার চেষ্টা করলে ভূতনাথ। হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে গিরির সেই লম্বা ঘোমটা টেনে দেওয়া। আর অসাক্ষাতে বাড়ির মধ্যে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করা। তারপর সেই প্রথম রাত্রে যেদিন ছুটুকবাবুর আসরে তবলা বাজাতে গিয়েছিল, সেদিন সেই মধ্যরাত্রের অন্ধকারে ঝাপসা ছায়ামূর্তি।
শশী বললে-বংশীকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন শালাবাবু–ছুটুকবাবুর যখন অসুখ হয়েছিল এই শশী সেদিন কি সেবা করেছিল, ব্যথায় ছুটুকবাবু ছটফট করেছে, নিজের ছুচিবেয়ে মা পর্যন্ত কাছে মাড়ায়নি, এই শশীই সেদিন পূজ-রক্ত পরিষ্কার করে দিয়েছে, কাপড় সাফ করে দিয়েছে। বাবুদের বেলায় কোনো দোষ নেই— চাকরদের বেলাতেই যত অশুদ্ধ।
বাড়ির কাছাকাছি এসে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে।
শশী বললে—আর ওদিকে যাবে না হুজুর, মধুসূদন দেখতে পেলেই অনগ্ধ বাধাবে।
—মধুসূদন কী করবে তোর!
—আজ্ঞে, মধুসূদন কি কম লোক, বলে—চাবুক মেরে পিঠের চামড়া তুলে দেবে এ তল্লাটে এলে—অথচ বুড়ো সব জানে, কার দোষ, কার দোষ নয়, সব জানে বুড়ো। একটা পয়সা নেই যে দেশে চলে যাই।
শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েই শশী চলে গেল।
বড়বাড়িতে ঢোকবার মুখে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে মুখখামুখি হয়ে গেল ভূতনাথের।
ভদ্রলোক সামনা-সামনি এসে বললেন—ব্রজরাখালবাবু এ বাড়িতে থাকেন?
ভূতনাথ বললো।
একবার ডেকে দেবেন তাঁকে, বড় দরকার। ভূতনাথ তাড়াতাড়ি ভেতরে এসে চারদিক দেখে নিলে। আশেপাশের দু’একজনকে জিজ্ঞেস করলে। তারপর এসে বললে—তিনি
তো বাড়িতে নেই এখন–কিছু বলতে হবে?
ভদ্রলোক কেমন যেন অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলেন। বললেন—আজ তিন-চার দিন দেখা নেই তার—এখানে আছেন তো তিনি?
–আছেন এখানে, তবে সব দিন এখানে আসেন না রাত্রে ভূতনাথ বললে।
—আজ যদি আসেন তো একটা খবর দেবেন তাকে, বলবেন, মেছোবাজারের সেই ফুলবালা দাসী, আজ দুপুর থেকে আবার ভেদবমি শুরু হয়েছে তার, একটা ওষুধ নিয়ে যেন যান আজ রাত্রেইব্রজরাখালবাবু আপনার কে হন?
—আমার ভগ্নীপতি।
ভদ্রলোক যেন খুব ব্যস্ত। বললেন—তাহলে এখন চলি আমি, বলবেন তাকে, ভুলবেন না যেন।
ভূতনাথ বললে—ফুলবালা দাসীর নাম করলেই চিনতে পারবেন তো তিনি?
