ভূতনাথ আবার জিজ্ঞেস করলে—মাইনে বাড়লো নাকি পাঠকজী তোমার।
পাঠকজী বলেছে—যতদিন দিদিমণি থাকবে বাড়িতে, ততদিন তার মাইনে বাড়বার কোনো আশা নেই। তারপর বলে—লেকিন হনুমানজী রাখে তো মারে কৌন, কেরানীবাবু?
পাঠকজীর বয়স বেশি নয়। কিন্তু প্রচুর স্বাস্থ্যের জন্যে একটু বয়স দেখায়। কারখানায় বসে প্যাকেট তৈরি করে আর ভজন গায় আপন মনে। বেপরোয়া মানুষ। কত কেরানীবাবু এ-বাড়িতে এল গেল, পাঠকজী কিন্তু হনুমানজীর কৃপায় এখনও টিকে আছে। কেন যে টিকে আছে কে জানে।
পাঠকজীকে জিজ্ঞাসা করলে বলে—সব হনুমানজীর কিরপা হুজুর।
লোকটা হনুমানজীর কথা বলে বটে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। মুখেই ওর যত ভক্তি। ভূতনাথের কতদিন সন্দেহ হয়েছে, আপিস থেকে যেন চুরিটা চামারিটা করে। এখানে বউ নেই। বলে–বিয়ে করেনি। আসলে বিয়ে করেছিল, বউ মারা গিয়েছে। খবর পেয়েছে ভূতনাথ। এই বাড়ির এক কোণে একটা ছোট ঘরে রান্না করে আর রাত্রে সেখানেই শুয়ে থাকে। এ-বাড়ির অনেক দিনের লোক।
—তা হাসি কেন অত পাঠকজী?
এবার হাসির কারণটা প্রকাশ করে বললে পাঠক। পাঠকও তা হলে খবর পেয়েছে? ফলাহারীর মনে হয়েছে—দিদিমণির বিয়ের পর শ্বশুর ঘরে তো চলে যাবে দিদিমণি, তখন বাবুকে বলে মাইনেটা বাড়িয়ে নেবে সে। বাবু তো লোক ভালো।
ভূতনাথও কিছু বললে না। দরকার নেই প্রকাশ করে দিয়ে। আশায় থাকা ভালো।
—আপনারও ভালো হবে কেরানীবাবু, দেখবেন।
কে জানে হয় তো সত্যি! পাঠকজী এতদিন ধরে দেখছে—ও হয় তত ঠিকই চিনেছে জবাকে! কিন্তু ভূতনাথের কিছুতেই মাথায় আসে না ব্যাপারটা। রহস্যময়ী মনে হয় জবাকে। যেন পাঠকজীর কথাটাও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। অমন যার বাবা, মাকেও যেন ভালো বলেই মনে হয়। অন্তত পাগল হবার আগে জবার মতন অমন অস্থির প্রকৃতির নিশ্চয়ই ছিলো না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কেমন ধীর-স্থির। আবেগ আছে কিন্তু অবিবেচক নয় যেন। শুধু জবার বেলাতেই একটু অন্ধ। অথচ জবা যেন বাড়ির কাউকেই মানুষ বলে মনে করে না। যেন তারা সবাই জবারই কর্মচারী। ইচ্ছে করলে জবা তাদের বরখাস্ত করতে পারে। একটু যেন বেশি সংসারী। হিসেবী। কে-কোথায় ফাঁকি দিচ্ছে, সেদিকে যেন গোপনে দৃষ্টিও রাখে। কথায় ঝাল মেশানো। ভূতনাথ ভেবে দেখলে—তার জানা-শোনা কোনো মেয়ের সঙ্গেই জবার যেন কোনো মিল নেই। রাধা ছিল সরল সাদাসিদে। ব্রজরাখালের স্ত্রী হয়েও সে যে নন্দজ্যাঠার মেয়ে, তা সে ভোলেনি। আর আন্নাসে ছিলো ছেলেমানুষ। গাছে ওঠাতেও যেমন, আবার সই-এর বিয়ের বাসর জাগতেও তেমনি। আর হরিদাসী ছিল ছোটবেলা থেকেই গিন্নী। বিয়ে হবার আগেই যেন সে স্ত্রী হয়ে গিয়েছে। আর বৌঠান! পটেশ্বরী বৌঠানের সঙ্গে মাত্র একদিনের আলাপ। ‘কিন্তু তার সম্বন্ধে এত কথা শুনেছে—যেন তার সব জানা হয়ে গিয়েছে। বৌঠান তো ভূতনাথের চেয়ে বয়সে কিছু ছোট, কিন্তু তবু যেন সামনে গেলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ভালো লাগে। মনে হয় মাথাটা ঠেকিয়ে রাখে আলোপর পা-জোড়ার ওপর। বৌঠান যেন একাধারে সব। মা হয়নি বৌঠান, কিন্তু মা হলেই যেন মানাতো। স্ত্রীর মর্যাদা পায়নি বৌঠান, কিন্তু ছোটবাবু চাইলেও যেন তাকে সহধর্মিণী করে নিতে পারবেন না—বৌঠান যেন ব্যক্তিত্বে ছোটবাবুর চেয়েও উঁচুতে। আর এ-বাড়ির জবা। জবা সত্যিই রহস্যময়ী! ধরা সে দেয় না, কিন্তু কেউ ধরে এটাই যেন সে চায়। কিন্তু নিজের আভিজাত্য যেন সমস্ত হৃদয় জুড়ে বসেছে। স্নেহ মমতা দয়া দাক্ষিণ্য প্রেম ভালোবাসা সমস্ত তার কাছে তার পরে।
কাজ করতে করতে সেদিন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ একটা জরুরি কাগজ নিয়ে ওপরে যেতে হলো ভূতনাথকে। সুবিনয়বাবুর সই দরকার। সিঁড়িতে উঠে ডান দিকে হলের মধ্যে যাবার মুখে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো। ওপাশেই সুবিনয়বাবুর সঙ্গে জবার কথা হচ্ছে। খানিকটা কানে আসতেই ভূতনাথ সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লো।
সুবিনয়বাবু বলছেন—তুমি পছন্দ করেছে—আমি এতে কী বলবো মা।
জবা বলছে—তবু আপনি একবার বলুন আপনার অনুমতি আছে এ বিয়েতে।
—আমি তত কোনো দিন তোমার কোনো ইচ্ছেতে বাধা দিইনি মা, নিজে বরাবর বাবাকে দুঃখ দিয়েছি বলে—আমি চাইনে মা তোমার কোনো ইচ্ছেতে আমি বাধাস্বরূপ হই—আর তোমার মা যদি ভালো থাকতেন তো তাকে আমি জিজ্ঞেস করে দেখতাম, কিন্তু তিনি তো এখন এ সংসারের বাইরে।
জবা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে—কিন্তু আপনি তো দেখেছেন বাবা–আপনি তো চিনেছেন তাকে।
শুধু একদিন নয়, ওরা আমাদের সমাজের পুরোনো লোক— ওকে বিদ্বান বুদ্ধিমান আর খুব স্থিরবুদ্ধি বলে মনে হয়েছে আমার, ওর বাবাকে আমি বহুদিন থেকে চিনি। তোমার জন্মদিনে যারা যারা এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে থেকে তুমি ঠিক মানুষটিকেই বেছে নিয়েছে বলে মনে করি—আমি আশীর্বাদ করি, তোমরা সুখী হবে।
জবা বললে—কিন্তু কি জানি কেমন যেন ভয় করছে আমার। আমি আপনাকে ছেড়ে থাকবো কেমন করে?
—তুমি থাকবে মা আমার কাছে—তোমরা দুজনেই থাকবে। নইলে এসব কে দেখবে, আমরা আর ক’দিন? উনি তো
-থাকার মধ্যে—আর আমি? যতদিন বেঁচে থাকি আমাকেও তোমরাই দেখবে—দেখবে না মা?
জবা চুপ করে রইল।
সুবিনয়বাবু বললেন—আর এই ‘মোহিনী-সিঁদুর’, ওটা যতদিন আছে থাক, তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়ে, যদি ইচ্ছে হয় চালিও, আর যদি না চলে তবে ক্ষতিও নেই। তোমাদের জন্যে যথেষ্ট অর্থ রেখে যাবো মা–তোমাদের কোনো দিন উপার্জন করতে হবে না, তবে যদি পারো অন্য ব্যবসা করো—নতুন যুগ আসছে। আমি আর কিছু চাইনে, পরম গতিও চাই না, অষ্টসিদ্ধিও চাই না। সেই গানটা একবার গাইবি মা, অনেক দিন শুনিনিজয়জয়ন্তীর ধ্রুপদ-নাথ তুমি ব্ৰহ্ম তুমি বিষ্ণু–
