—কেন, ছবিতে।
—পরীর ছবি দেখিসনি?
পরীর ছবি কোথাও দেখেছে কিনা ভাবতে লাগলো ভূতনাথ।
ননীলাল বললে—পরী যদি দেখতে চাস, তো দেখাবো তোকে—আমার বিন্দী যাকে বলে ডানাকাটা পরী।
—বিন্দী কে?
—আজ বিন্দীর বাড়ি যাবি? চল তোকে পরী দেখিয়ে নিয়ে আসি। ছুটুক ওকে দেখে একরাতে পাঁচ শ’ টাকা খরচ করে ফেলেছিল—শেষে বিন্দী ওরই মুঠোর মধ্যে চলে যেতো, কিন্তু আমার বাবাও তখন তিপ্পান্ন হাজার টাকা রেখে মারা গিয়েছেআমাকে পায় কে?
—বাবা মারা গিয়েছেন তোর?
বাবার মৃত্যুর সংবাদ এমন করে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে কেউ পারে, এ-যেন ভূতনাথ বিশ্বাস করতে পারে না।
–বাবা মারা গিয়েছে বলেই তো বেঁচে গেলুম ভাই, নইলে কি ছুটুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমি পারি? ওরা কি কম বড়লোক। ওরা হলো সুখচরের জমিদার বংশ, প্রজা ঠেঙানো পয়সা, এখানে বসে কর্তারা শুধু মেয়েমানুষ নিয়ে ওড়ায়—ওদের সঙ্গে তুলন? ছোটবেলায় ওর কাকীমা’র পুতুলের বিয়েতে কত নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছি, তা এখন শুনতে পাই চূড়ামণি নাকি বাড়িতেই আচ্ছা বসিয়েছে, গান-বাজনা নিয়ে থাকে, আর একটু একটু মালটাল খায়, কিন্তু রক্তের দোষ ওদের যাবে কোথায়, তোকে বলে রাখছি ভূত, তুই দেখে নিস, চূড়ামণির ও অভ্যেস-দোষ যাবে না, অমৃতে কখনও অরুচি হয় ভাই?
আরো অনেক কথা বলতে লাগলো ননীলাল। ননীলাল তত আগে এমন কথা বলতো না। বিশেষ মুখচোরা লাজুক ছেলে ছিল। কেমন করে এমন হলো কে জানে!
ননীলাল আবার বলতে লাগলো—তা আমার এখন একটা নেশা আছে ভাই, তোকে বলেই ফেলি, একটা বেশ বড়লোক গোছের লোকের মেয়েকে যদি বিয়ে করে ফেলতে পারি, তত আর কাউকে ভয় করি না আমি। বাবার টাকাগুলো সব ফুরিয়ে এল কিনা-ও-পাড়ার দিকে আছে কোনো সন্ধান?
সেদিন যতক্ষণ ননীলালের সঙ্গে গল্প করেছিল ভূতনাথ, ততক্ষণই কেবল অবাক হয়ে ভেবেছিল। কই ব্রজরাখালও তো রয়েছে। এখানে। স্বামী বিবেকানন্দর চার ঘোড়ার গাড়ি যারা কাধে করে টেনে নিয়ে গেল, যারা গলা ফাটিয়ে ‘বিবেকানন্দ স্বামিজী কী জয়’ বলে চিৎকার করলো, যারা ভোরের শীত উপেক্ষা করে শেয়ালদা’ স্টেশনে মহাপুরুষকে দেখবার জন্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে, তারা তবে কারা? তারাও কি বাঙলা দেশের ছেলে? কলকাতার ছেলে? তারাও কি ননীলালের ক্লাশ ফ্রেণ্ড? তারা কি তবে ছুটুকবাবু কিম্বা ননীলালের মতন নয়? তাদের জাত কি আলাদা?
যাবার সময় ননীলাল বললে-সন্ধ্যে বেলা হেদোর ধারে দাঁড়িয়ে থাকবে, ঠিক আসিস—বিন্দীর বাড়ি যাবো বুঝলি? আর ছুটুককে যেন আমার কথা বলিসনি।
ভূতনাথ বললে—কেন?
-পরে বলবো তোকে—এখন আবার ক্লাশ আছে আমার।
কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, যার হাতের ছোঁয়া লাগলে একদিন ভূতনাথের শরীরে রোমাঞ্চ হতো, যাকে দেখবার জন্যে ছুটির দিনেও কত ছুতো করে সাত মাইল হেঁটে গিয়েছে ইস্কুল পর্যন্ত,
সেই ননীলাল!
বাড়িতে গিয়ে ভূতনাথ নিজের বাক্সটা খুললে। অনেক পুরোনো জিনিষ জমে আছে ভেতরে। পিসীমা’র হরিনামের মালা একটা। পুরোনো মনি-অর্ডারের রসিদ কয়েকটা। দেশের বাড়ির সদর দরজার চাবি, তারই মধ্যে থেকে একটা চিঠি বেরোলো। বহুদিন আগের ননীলালের লেখা। সেখানা খুলে ভূতনাথ আবার পড়তে লাগলো।
“প্রিয় ভূতনাথ,
আমরা গত শনিবার দিন এখানে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। কলিকাতা বেশ বড় দেশ, কী যে চমৎকার দেশ বলিতে পারিব না। এখানে আসিয়া অবধি বাবার সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। বড় বড় বাড়ি আর বড় বড় রাস্তা। খুব আনন্দ করিতেছি। তোমাদের কথা মনে পড়ে। তুমি কেমন আছো জানাইও, উপরের ঠিকানায় চিঠি দিও”।
পড়তে পড়তে সেদিনকার ননীলালের সঙ্গে আজকের দেখা ননীলালের তুলনা করে দেখলে ভূতনাথ। কিন্তু কেন এমন হলো। একবার মনে হলো দরকার নেই, চিঠিটা ছিঁড়েই ফেলে। কিন্তু আবার বাক্সের ভেতরে রেখে দিলে সে। থাক। সে-ননীলাল হয় তত সত্যিই মরে গিয়েছে। কিন্তু শৈশবের সে ননীলালের স্মৃতি যেন অক্ষয় হয়ে থাকে সারাজীবন।
১৪. ভোর বেলাই বংশী এসেছে
ভোর বেলাই বংশী এসেছে। বললে—শালাবাবু, আপনাকে কাল রাত্তিরে দু’বার খুঁজে গিয়েছি, ছোটমা পাঠিয়েছিল দেখতে।
ভূতনাথ তাড়াতাড়ি ‘মোহিনী-সিঁদুরের কৌটোটা প্যাকেটে মুড়ে বংশীর হাতে দিয়ে বললে—এটা গিয়ে বৌঠানকে দে, আর আর এই টাকা ক’টাও দিয়ে আয়।
বংশী বললে-ছোটমা বলেছে, আপনাকে নিজে যেতে। আজ ভোর বেলাই যে চিন্তাকে পাঠিয়েছিল আবার।
সকালবেলা। এখন আপিসে যাবার তাড়া। অনেক কাজ বাকি। ব্রজরাখাল ক’দিন বাড়ি আসছে না। মেতে আছে গুরুভাইদের নিয়ে। রান্না-বান্নার দিকটা একটু দেখতে হবে। রাত্রে রান্না করা হয়েছিল। তার বাসনগুলো মাজতে হবে। রাত্রের খাওয়ার জন্যে বাজারেও একবার যাওয়ার দরকার।
ভূতনাথ বললে—তা হলে আজ রাত্রে তুই আসিস, আমি নিজে গিয়ে বৌঠানকে দিয়ে আসবো’খন।
বংশী চলে গেল কিন্তু আপিসে যাবার পথে মনে পড়লো। সন্ধ্যে বেলা তো ননীলালের সঙ্গে দেখা করার কথা আছে তার। হেদোর ধারে দাঁড়িয়ে থাকবে যে সে।
একবার মনে হলো যাবে না সে। আর কিসের সম্পর্ক তার ননীলালের সঙ্গে। ননীলালের কাছ থেকে আর কিছু আশা রাখে না সে।
আপিসে যেতে পাঠকজী হাসতে হাসতে এল। সেলাম করলো।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—অত হাসিমুখ কেন পাঠকজী?
লম্বা পাঞ্জাবী পরা ফলাহারী পাঠক। এখনও বুঝি কুস্তি করে। ভারী জোয়ান চেহারা। পরিশ্রমে কাবু হয় না, হনুমানজীর ওপর সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়েছে জীবনের। গোঁফে তা দেয়।
