জনস্রোত ততক্ষণে বাইরে চলে এসেছে। ভূতনাথ মন্ত্রচালিতের মতো জনতাকে অনুসরণ করে এল। বাইরেও এক বিপুল সমুদ্র, কিন্তু প্রতীক্ষায় অস্থির অশান্ত।
ঘোড়ার গাড়িতে উঠলেন মহামানব। চারঘোড়ার গাড়ি।
হঠাৎ ছেলেরা চঞ্চল হয়ে উঠলো। ঘোড়াগুলোকে খুলে দিলে তারা। তাদের উপাস্যকে তারা নিজেরা বহন করবে। স্বামিজীকে তারা মাথায় তুলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। তাদের অন্তরের উৎস আজ অবারিত।–জয়, স্বামী বিবেকানন্দ কী জয়।
শেয়ালদা স্টেশনের বাইরে সেই উল্লাসধ্বনিতে সমস্ত শহর প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে গাড়ি গিয়ে হাজির হলো একটা গলির সামনে। রিপন কলেজের ভেতর স্বামিজীকে কিছু বলতে হবে। অন্তত একটু বিশ্রাম। তারা সবাই দু’চোখ ভরে দেখবে।
মনে হলো, হঠাৎ যেন ব্ৰজরাখালকে দেখা গেল এক মুহূর্তের জন্যে। তাড়াতাড়ি ভূতনাথ ভিড় সরিয়ে কাছে যাবার চেষ্টা করতেই আবার কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল ব্রজরাখাল। এ-দিক ও-দিক কোথাও দেখা পাওয়া গেল না তাকে।
কিন্তু হঠাৎ এক আশ্চর্য উপায়ে দেখা হয়ে গেল আর একজনের সঙ্গে। আবার এতদিন পরে এমন ভাবে দেখা হবে ভাবা যায়নি।
ননীলাল! ননীলালও চিনে ফেলেছে। বললে—তুই? তুই এখেনে?
প্রথমটা যেন বিশ্বাস হয় না। সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। কী এক অদ্ভুত চেতনা। ননীলালের সে চেহারা আর নেই। সেই কেষ্টগঞ্জের স্কুলের সহপাঠী, ডাক্তারবাবুর ছেলে ননীলাল। এর দেখা পাওয়ার জন্যে কী কষ্টই না একদিন স্বীকার করেছে ভূতনাথ। ননীলাল সিগারেট টানছে। ছোটবড় চুল। গোফ দাড়ি উঠেছে।
—তারপর?
—এখানে কী করতে? স্বামিজীকে দেখতে?
—দূর, ও-সব দেখবার সময় নেই আমার। বলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লে লম্বা করে। তারপর বললে—যত সব বুজরুক—
একটা প্রচণ্ড আঘাত লাগলো ননীলালের কথায়। কিন্তু কিছু বলতে পারলে না। তারপর জিজ্ঞেস করলে—কী করছিস এখন?
—বি-এ পাশ করেছি। এবার ল’ পড়ছি—তুই?
—আমার পড়াশোনা হলো না, পিসীমা মারা গেল। এখানে আমার ভগ্নীপতি থাকে। তার কাছেই আছি, একটা ভালো চাকরি পেলে করি, ঘোরাঘুরি করছি।
—চল, চা খাস?
–না, এখনও ধরিনি।
—এখনও পাড়াগেঁয়েই রয়ে গেলি-বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে চললল ননীলাল। ননীলালের গা থেকে এসেন্সের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। সুন্দর জামাকাপড় পরেছে। ননীলালের কাছে নিজেকে যেন বড় বেশি দরিদ্র মনে হলো আজ। কিন্তু কেন কে জানে, ভূতনাথের মনে হলো—ননীলাল যেন আর আগেকার মতন নেই। সেই আগেকার ননীলালই যেন ছিলো ভালো। এখন যেন চোখে কালি পড়েছে। চোখের সে জ্যোতি কোথায় গেল তার। যেন অনেক ‘বয়স বেড়ে গিয়েছে তার এই ক’বছরের মধ্যেই।
—চা না খাস তো অন্য কিছু খা।
একটা দোকানের সামনে এসে ভূতনাথকে নিয়ে ঢুকলো ভেতরে।
—ডিম খাস?
—হাঁসের ডিম তো।
-কলকাতা শহরে এসে এখনও তোর বামনাই গেল না-ইয়ং বেঙ্গল আমরা, এই করে করে দেশটা গেল, গায়ে শক্তি হবে কী করে? বিফ খায় বলেই তো সাহেবরা অত দূর দেশ থেকে এদেশে এসে রাজত্ব করতে পেরেছে—আর তোরা পৈতে টিকি নিয়ে তাদের গোলামি করে মরছিস, ছাড় ও-সব, আমার সঙ্গে দু’দিন থাক, মানুষ করে দেবো তোকে-তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে আর একটা সিগারেট ধরালে ননীলাল। বললে—আছিস কোথায় বললি?
—বৌবাজারে, বড়বাড়িতে।
—চৌধুরীদের বাড়ি? তা ওদের ওখানে আছিস, ওরা তো জমিদার, শুনেছি ও-বাড়ির বোঁগুলো খুব সুন্দরী, না?
—তুই জানলি কেমন করে? কেমন একটা রহস্যময় হাসি হাসলো ননী। বললে—রূপ আর গুণ কখনও চাপা থাকে রে?
কী জানি কেন, ভূতনাথের মনে হলো—সেই ননীলালের এমন পরিবর্তন হওয়া উচিত হয়নি যেন।
ননী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আরম্ভ করলে—চূড়ামণিকে চিনিস, যার ডাক নাম ছুটুক? ওই তো আমার ক্লাশ ফ্রেণ্ড ছিল রে। দু’বার ফেল করে এখন সেকেণ্ড ইয়ারে পড়ছে— বাড়ির ঝি-টি কাউকে আর বাদ দেয়নি। শেষে একদিন অসুখ হলো, কিন্তু মিথ্যে বলবো না ভাই, বহু টাকা খরচ করেছে আমাদের জন্যে—এখন দেখা হয় না বটে, কিন্তু রোগ হবার পর থেকে…রোগটা সেরেছে?
রোগ? ভূতনাথ কিছু বুঝতে পারলে না।—জিজ্ঞেস করলে কী রোগ?
ননীলালের মুখে রোগের নামটা শুনে শিউরে উঠলো ভূতনাথ। ননীলাল কেমন বেপরোয়াভাবে রোগের নাম উচ্চারণ করে গেল, যেন ম্যালেরিয়া কিম্বা ইনফ্লুয়েঞ্জা। ও-রোগ ভদ্রলোকদের হয় ভূতনাথের জানা ছিল না।
ননীলাল সিগারেট ফুকতে ফুকতে বললে হবে না রোগ? চেহারাটা দেখছিস তো—আগে আরো লাল টুকটুকে ছিল, ক্লাশে বসে আমরা ওর গাল টিপে দিতুম, তা আজকাল কত রকম ওষুধ বেরোচ্ছে, ডাক্তার-ফাক্তার কাউকে দেখালে না, একদিন সারা গায়ে দাগড়া দাগড়া দাগ বেরোলো—শেষে একদিন আর হাঁটতে পারে না। আর একটু মাংস নিবি?
—না।
—তা সেই অসুখের সময় গিয়েছিলুম ওদের বাড়িতে। অনেক চেষ্টা করেছিলুম ভাই দেখতে—কিন্তু এমন আঁটা বাড়ি, কিছছু দেখা গেল না, যারা ঘন ঘন যেতো, তারা বলতো-ওর কাকীদের নাকি পরীর মতন দেখতে—দেখেছিস তুই?
ভূতনাথ উত্তরটা এড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে বললে-দেখেছি, পরীদের মতো তো নয়।
—পরীদের মতো নয়, তবে কীসের মতন? ভূতনাথ যেন কী ভাবলে। তারপর বললে–জগদ্ধাত্রীর মতন।
ননীলাল হো হো করে হেসে উঠলো। বললে—তুই আবার এত ভক্ত হয়ে উঠলি কবে?..
ভূতনাথ বললে—পরী তো দেখিনি কখনও, জগদ্ধাত্রী দেখেছি যে।
—জগদ্ধাত্রী কোথায় দেখলি?
