দর্পনারায়ণ বেঁকে বসলেন। বললেন—তিন লক্ষ টাকা চাই, তবে সই দেবো।
মুর্শিদকুলী খাঁ বললেন—এখন সই দাও, ফিরে এসে টাকা দেবো।
দর্পনারায়ণও সোজা লোক নন। বললেন—তবে সইও পরে দেবো।
শেষ পর্যন্ত মুর্শিদকুলী খাঁ সই না নিয়েই চলে গেলেন দিল্লী। সেখানে গিয়ে ঘুষ দিয়ে কার্য সমাধা করলেন। কিন্তু অপমান ভুললেন না। ফিরে এসে তহবিল তছরূপের দায়ে জেলে পুরলেন দর্পনারায়ণকে। সেই জেলের মধ্যেই না খেতে পেয়ে মারা গেলেন দর্পনারায়ণ। ইতিহাস ভুলে গেল তাঁকে।
সেই দর্পনারায়ণের শেষ বংশধর বদরিকাবাবু আজ বড়বাড়ির ঘরে ঘরে ঘড়িতে দম দিয়ে বেড়ান। বোধ হয় ঘড়ির টিকটিক শব্দের সঙ্গে তাল রেখে কালের পদধ্বনি শোনেন।
তারপর কতকাল কত পুরুষ পার হয়ে গিয়েছে। কোথায় গেল নাজির আহম্মদ আর কোথায় গেল রেজা খাঁ। কোথায় গেল মধুমতী তীরের সীতারাম, আর ফৌজদার আবুতোরাপ। নেই পীর খাঁ, নেই বক্স আলী। এক এক পুরুষের পর আর এক পুরুষ উঠেছে আর শেষ হয়েছে। কিন্তু দর্পনারায়ণের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি আজও। সে-বংশ এবার নির্বংশ হতে চললো। তবু বড়বাড়ির বৈঠকখানা ঘরটার ভেতরে বসে দুর্বল বদরিকাবাবু ইতিহাস পড়েন, আর অভিশাপ দেন। অভিশাপ দেন সমস্ত পৃথিবীকে। যে-পৃথিবী অত্যাচার করে, অন্যায় করে, মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেয় না। যে-পৃথিবী শুধু টাকার গর্ব করে। সেই সামন্ত সভ্যতার শিরে প্রতি মুহূর্তে দুর্বল আঘাত হেনে হেনে একটি দুর্বলতর মানুষ শুধু আরো দুর্বল হয়ে যায়।
বলেন—ঘড়ি বলছে—সব লাল হয়ে যাবে—দেখিস—
পাঁচ শ’ বাহান্ন বছর আগেকার সৃষ্টি যন্ত্রযুগের প্রথম দান ঘড়ি। ঘড়ির মধ্যেই যেন যন্ত্রসভ্যতার সমস্ত বাণী সঙ্কুচিত হয়ে আছে। ও বলছে— কিছুই থাকবে না। সব লাল হয়ে যাবে। অমৃতের পুত্র মানুষ, মানুষের জয় হবেই।
বদরিকাবাবু বলেন—একদিন দেখবি তুই, জয় হবেই আমাদের, আমি হয় তো সেদিন থাকবে না—এই বড়বাড়ি থাকবে না, এই মেজবাবু, ছোটবাবু তুই আমি কেউই থাকবে না। এই ছোটলাট, বড়লাট, ইংরেজরাজত্ব, কেউ নয়—কিন্তু আমার কথা মিথ্যে হবে না, দেখে নিস।
শীতের মধ্যে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে ভূতনাথ চলছিল।
রাস্তার দু’পাশের দোকানপাট বন্ধ। অন্ধকার ভালো করে কাটেনি। চারদিকে শুধু ধুলো আর ময়লার গন্ধ। অন্ধকারে চলতে চলতে ভূতনাথের কেবল মনে হয়েছিল, বদরিকাবাবু পাগল হোক, কিন্তু তার ভবিষ্যৎবাণী যেন সত্য হয়।
শেয়ালদা স্টেশনের সামনে তখন বেশ ভিড় জমেছে। আবছা অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না মুখ। তবু ব্ৰজরাখালকে খুঁজে খুঁজে দেখতে লাগলো। এক-এক জায়গায় দল বেঁধে জটলা করছে লোকজন। বেশির ভাগ যেন ছেলের দল। চারদিকে প্রতীক্ষমান মানুষ। এই দেশেরই এক ছেলে মহাবাণী বহন করে নিয়ে আসছে। যে বলেছে—জগতের একটা লোকও যতদিন অভুক্ত থাকবে, ততদিন পৃথিবীর সমস্ত লোকই অপরাধী। যে বলেছে—“আজ হতে সমস্ত পতাকায় লিখে নাও—যুদ্ধ নয়, সাহায্য,—ভেদ বিবাদ নয়, সামঞ্জস্য আর শান্তি। যে বলেছে—তোমরা পাপী নও, অমৃতের সন্তান, পৃথিবীতে পাপ বলে কিছুই নেই, যদি থাকে তবে মানুষকে পাপী বলাই এক ঘোরতর পাপ। তুমি সর্বশক্তিমান আত্মা, শুদ্ধ, মুক্ত, মহান! ওঠো জাগগা স্ব স্বরূপ বিকাশ করতে চেষ্টা করো, উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত।
ক্রমে ভোর হলো। আরো ভিড় জমলো। ভূতনাথ চারদিকে চেয়ে দেখলে সমস্ত শেয়ালদা’ স্টেশনের আশেপাশে শুধু মানুষের মাথা। এরা কোথায় ছিল এতদিন! কারা এরা। এরাও কি বিবেকানন্দের ভক্ত ব্রজরাখালের মতন?
হঠাৎ জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। ইঞ্জিনের বাঁশি শোনা গেল। চিৎকার উঠলোজয় রামকৃষ্ণদেব কী জয়জয় বিবেকানন্দ স্বামিজী কী জয়।
ভিড়ের স্রোতের সঙ্গে ভূতনাথ ঢুকলো স্টেশনে।
ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। বিপুল জনতা ঘন ঘন মহামানবের জয় ঘোষণা করছে। তারপর সেই অসংখ্য জন-সমুদ্রের কেন্দ্রে আর এক দিব্যপুরুষ আবিভূত হলো। মাথায় বিরাট গেরুয়া পাগড়ী, গেরুয়ায় ভূষিত সর্বাঙ্গ। দুই চোখে অস্বাভাবিক দীপ্তি। ভূতনাথের মনে হলো—মানবের সমাজে যেন এক মহামানব এসে দাঁড়ালেন। সমস্ত ভারতবর্ষের আত্মা মথিত করে নবজন্ম গ্রহণ করলে যেন এক অনাদি পুরুষ। হিমালয়ের ভারতবর্ষ, বৈদিক ভারতবর্ষ, উপনিষদের ভারতবর্ষ, আজ যেন নরদেবতার রূপ নিয়েছে। মানুষ বুঝি অমৃতের সন্তান হয়ে আবার জন্মগ্রহণ করলো। ভূতনাথের মনে হলো—যেন শেয়ালদা স্টেশনের স্বল্পপরিসর প্ল্যাটফরম এটা নয়। অশ্রান্ত-কল্লোল বারিধির বুকে বুঝি প্রথম জেগেছে একখণ্ড ভূমি। হিমালয়ের শীর্ষ জেগে উঠেছে বুঝি মহাসম্ভাবনার ইঙ্গিত নিয়ে। এইবার জন্ম হবে মানুষের। নতুন মানুষের হৃদস্পন্দনের মধ্যে ধ্বনিত হবে সেই আদি প্রশ্ন—কে আমি? কোথা থেকে আমি এলাম? তারপর গ্রহ নক্ষত্র সূর্য পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীত স্তব্ধ করে এক মহাবাণী উচ্চারিত হবে আবার। আবার নতুন করে সৃষ্টি হবে নতুন পৃথিবীর। নতুন মানুষ আর এক নতুন উত্তর পাবে মহামানবের মহাবাণীর মধ্যে! মানুষ অমৃত, মানুষ আর কেউ নয়। মানুষ অমৃতস্য পুত্রাঃ-মানুষ অমৃতের। সন্তান।
ঠিক এই কথাগুলোই যে বর্ণে বর্ণে সেদিন মনে হয়েছিল তা নয়। কিন্তু পরে যখন অনেক শিখে অনেক পড়ে তার মনের তৃতীয় নয়ন খুলে গিয়েছিল তখন সে ভেবেছে তার অপরিণত মনের কল্পদৃষ্টিতে সেদিন তার এই ভাবনা হওয়াই উচিত ছিল।
