স্বামী বিবেকানন্দ! কথা বলতে বলতে ব্ৰজরাখাল থর-থর করে কাঁপে। বলে—যাবার আগে নরেন বলেছিল—“I go forth to preach a religion of which Buddhism is nothing but a rebel child and Christianity but a distant echo.” হলোও তাই।
খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে ভূতনাথ। বড়বাড়িতে একটু দেরি করে সকাল হয়। তবু অন্ধকারে স্নান সেরে নিয়ে জামাটা গায়ে দিয়ে চাদর জড়িয়ে নিলে। কনকনে শীত। তখনও বাড়ির আনাচ-কানাচের আলোগুলো নেবেনি। নাথু সিং পাহারা দিতে দিতে বুঝি একটু ক্লান্ত হয়ে এসেছিল। পায়ের আওয়াজ পেয়েই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সমস্ত বাড়িটা নিদ্রাচ্ছন্ন। এখন বৌঠান কী করছে! এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই। সারা রাত জেগে কী করে কে জানে! আশ্চর্য হয়ে যায় ভূতনাথ।
ব্ৰজরাখালের কথাগুলো তখনও কানে বাজছিল—বিবেকানন্দ আমেরিকা থেকে এসে বলেছেন—এসো, মানুষ হও, তোমার আত্মীয়স্বজন কাঁদুক, পেছনে চেও না—সামনে এগিয়ে যাও, ভারতমাতা অন্তত এমনি হাজার হাজার প্রাণ বলি চান, মনে রেখো-মানুষ চাই, পশু নয়।
সাত টাকা মাইনের কেরানীকে চায় না কেউ। পরান্নভোজী ভূতনাথ। এতদিন কলকাতায় এসে কী দেখেছে সে? মানুষ দেখেছে ক’টা! বড়বাড়ির মানুষগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। ওদের গায়ে কোনো ছোঁয়া লাগে না। সমস্ত ঘরগুলোর ভেতরে ঢুকলে যেন অশান্তির আবহাওয়ায় দম আটকে আসে। বৌঠান বলেছিল—অবাক বাড়ি এটা, বড় অবাক বাড়ি।
অবাক বাড়িই এটা সত্যি। সেদিন বদরিকাবাবুর কাছ থেকে এই কথাই শুনেছিল ভূতনাথ।
ডান পাশের ঘরটা খাজাঞ্চিখানা আর বাঁ দিকের বড় ঘরখানা খালি পড়েই থাকে।
দরজাটা খোলা ছিলো বুঝি। চিত হয়ে তক্তপোশের ওপর কে যেন শুয়ে ছিল। অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে শব্দ এল—কে যায়?
—আমি।
‘আমি’ বলে চলে আসছিল ভূতনাথ। কিন্তু আবার যেন ডাক এল—শুনে যাও, শুনে যাও হে।
আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকেছিল ভূতনাথ। ঘরে ঢুকে দেখলে একটা তুলোর জামা গায়ে মোটাসোটা বৃদ্ধ মানুষ। ভূতনাথকে দেখে উঠে বসলো। বংশীর কাছে শুনেছিল এর কথা। এরই নাম বদরিকাবাবু।
বংশী বলেছিল—ওদিকে যাবেন না বাবু, বদরিকাবাবু দেখলেই ডাকবে—ওই ভয়ে কেউ যায় না।
কিন্তু ভয়টা কিসের!
–বোসো এখানে। ভূতনাথ বসলো।
-নাম কী তোমার?
শুধু নাম নয়। বাবার নাম। জাতি। কর্ম! নাড়ী-নক্ষত্রের পরিচয় খুটিয়ে খুটিয়ে নিলেন। সব শুনে বললেন—ভালো কয়রানি ছোকরা, গেঁজে যাবে।
ভূতনাথ কিছু বুঝতে পারলে না।
–হ্যাঁ, গেঁজে যাবে। বদরিকাবাবু মিছে কথা বলে না হে। যদি ভালো চাও, পালাও এখনি, নইলে গেঁজে যাবে! মুর্শিদকুলী খা’র আমল থেকে সব দেখে আসছি। লর্ড ক্লাইভকে দেখলুম, সিরাজউদ্দৌলাকে দেখলুম, এই কলকাতার পতন দেখলুম-হালসীবাগান দেখলুম। শেষটুকু দেখবার জন্যে এই ট্যাকঘড়ি নিয়ে বসে আছি সময় মিলিয়ে নেবে বলে। তারপর দেয়ালের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন—ওই দেখো, তাকিয়ে দেখো—সব কুষ্ঠি-ঠিকুজি সাজানো রয়েছে, সব বিচার করে দেখেছি—মিলতে বাধ্য।
ভূতনাথ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলে দেয়ালের গায়ে আলমারিতে সাজানো সার সার বই সব। মোটা মোটা বই-এর মিছিল। সোনালি জলে লেখা নাম-ধাম।
—সব বিচার করে দেখেছি—মিলতে বাধ্য। যদি না মেলে তো আমার টাকঘড়ি মিথ্যে। কেল্লার তোপের সঙ্গে রোজ মিলোই ভাই—একটি সেকেণ্ড এদিক-ওদিক হবার জো নেই। বলে টাক থেকে বার করলেন ঘড়িটা। মস্ত গোলাকার ঘড়ি। চকচক করছে। ঘড়িটাকে নিয়ে কানে একবার লাগিয়ে আবার টাকে রেখে দিলেন। বললেন—১৩৪৫ সালে তৈরি আর এটা হলে গিয়ে ১৮৯৭। পাঁচ শ’ বাহান্ন বছর ধরে ওই একই কথা বলছে ঘড়িটা।
ভূতনাথ মুখ খুললে এবার। বললে—কী বলছে?
—বলছে, সব লাল হয়ে যাবে!
—লাল?
-হ্যাঁ, নীল নয়, সবুজ নয়, হলদে নয়, শুধু লাল। দিল্লীর বাদশা বুঝেছিল, রণজিৎ সিং বুঝেছিল, সিরাজউদ্দৌলা, আলীবর্দি খাঁ, জগৎ শেঠ, মীরজাফর, রামমোহন, বঙ্কিম চাটুজ্জে সবাই বুঝেছে শুধু ‘বঙ্গবাসী’ বুঝলে না।
-বঙ্গবাসী?
—খবরের কাগজ পড়িস না? নইলে ওই লোকটাকে, ওই বিবেকানন্দকে বলে গরুখোর, মুর্গীখোর? নইলে সাত শ’ বছর মোছলমান রাজত্বে ছ’ কোটি মোছলমান হয় আর এক শ’ বছর ইংরেজ রাজত্বে ছত্রিশ লক্ষ লোক খৃস্টান হয়। ও কি ওমনি-ওমনি? নেমকহারামির গুনোগার দিতে হবে না? পালা এখান থেকে ভালো চাস তো পালিয়ে যা, নইলে গেঁজে যাবি, আর যদি না-যাস তোমর এখেনে। যখন এই বড়বাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে যাবে, শাবল গাঁইতি নিয়ে বাড়ি ভাঙবে কুলী মজুররা, তখন কড়িকাঠ চাপা পড়বি, পাঁচ শ’ বাহান্ন বছরের ঘড়ি দিনরাত এই কথা বলছে, আমি শুনি আর চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকি।
এ এক অদ্ভুত লোক। ভূতনাথ সাইকেল চড়ে চলতে চলতে ভাবে, সেই এক অদ্ভুত লোক দেখেছিল জীবনে। সারা জীবন শুধু স্থবিরের মতো শুয়ে শুয়ে বিড় বিড় করে ভাবতো। ইতিহাসের অমোঘ নির্দেশ কেমন করে সেই উন্মাদ লোকটার মস্তিকে আবির্ভাব হয়েছিল কে জানে!
অনেকদিন ভূতনাথ ভেবেছে, বদরিকাবাবুর কোথায় যেন একটা ক্ষত আছে। বাইরে থেকে দেখা যায় না।
বংশী বলে—এই বাড়িতে যত ঘড়ি দেখছেন, সব ওই বদরিকাবাবুর জিম্মায়। দম দেন উনি, আর ন’টার সময় কেল্লার তোপের সঙ্গে ট্যাকঘড়িটা মিলিয়ে নেন।
সে অনেক কালের কথা। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ। দিল্লীর বাদশা’র কাছে রাজস্ব পৌঁছে দিতে যাবে জবরদস্ত নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ। দর্পনারায়ণ তখন তার প্রধান কানুনগো। তার সই চাই, নইলে বাদশা’র সরকারে রাজস্ব অগ্রাহ্য হবে। জমিদারদের রক্ত চোষা টাকায় তখন মাটিতে পা পড়ে না মুশিদকুলী খাঁ’র। একদিন খাজনা দিতে দেরি হলে জমিদারদের ‘বৈকুণ্ঠ’ লাভ। সে-বৈকুণ্ঠ নরকের চেয়েও যন্ত্রণাকর।
