-সেটা বাবাকেই জিজ্ঞেস করবেন।
—কিন্তু তোমারই যখন বিয়ে, তখন তুমিও তো কিছু জানোনা আর হাতের কাছে তুমি থাকতে আবার…
-বিয়েটা আমার বলেই তো, আমার মুখে ও-কথা শোভা পায় না।
—বিয়ে জিনিষটা কি লজ্জার? সময় হলে একদিন সবারই বিয়ে হবে।
–হবে নাকি? আমার কিন্তু সন্দেহ আছে।
ভূতনাথ বললে—পাড়াগাঁয়ের ছেলে, ভাত বেশি খাই বলে কথাও বেশি বলতে পারবে এমন কথা নেই, কিন্তু এটা জানি যে সব মেয়েই আর তোমার মতো নয় জবা।
-ক’টা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় আছে আপনার?
ভূতনাথের মনে হলো—সকলের নাম করে দেয় সে। হরিদাসী, রাধা, আন্না, তাদের ব্যবহারও তো সে দেখেছে। আর কাল রাত্রের বৌঠান। বৌঠানের কথা মনে হতেই যেন সমস্ত মন প্রশান্ত হয়ে এল তার। এক মুহূর্তে যেন এই আপিস-বাড়ি ছেড়ে সে সোজা বড়বাড়ির তেতলায় শেষ ঘরখানায় গিয়ে পৌঁছেছে। হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ভূতনাথ এক নিমেষে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে। বসলো—আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি তোমাকে, তোমাদের ‘মোহিনী-সিঁদুরে’ কাজ হয়?
জবা যেন প্রথমটায় থতমত খেয়ে গেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললে—এটাও কি বাবাকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয় না?
মানছি ভালো হয়, কিন্তু তোমাকেই না হয় জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কিছু জানো?
—পাঁজির বিজ্ঞাপনে তো সব লেখা আছে।
-সে তো সবাই জানে, তুমিও জানো আমিও জানি—আরো হাজার হাজার লোক জানে।
—আমিও তার বেশি কিছু জানি না, আমার নিজের কখনও ও সিঁদুর ব্যবহার করবার দরকার হয়নি-জবা হাসলো এবার। তারপর হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করলো—আপনার বুঝি দরকার হয়েছে?
ভূতনাথ খাওয়া থামিয়ে বললে–হ্যাঁ।
জবা শাড়ির আঁচলটা নিজের শরীরে বিন্যস্ত করে বললেপ্রয়োগটা কি আমার ওপরে করবেন নাকি? তা হলে কিন্তু ঠকবেন বলে রাখছি!
ভূতনাথ বললে-ঠাট্টা নয়, আমার বিশেষ দরকার, আজকেই জানা দরকার—তা হলে আজই কিনে নিয়ে যাই এক কৌটো। আমায় পাঁচটা টাকা দিয়েছেন কিনতে।
-কে?
—সে আমার এক বৌঠান।
–কী হলো আবার তার?
—সে কি তুমি বুঝবে? বৌঠান বলে–বিয়ে হবার আগে ওসব মেয়েরা বুঝবে না, তা ছাড়া বলতেও বারণ আছে। মেয়েমানুষের অতবড় লজ্জা, অতবড় অপমান নাকি আর নেই।
—বৌঠানটি আপনার কে শুনি?
–বলেছি তো বলতে বারণ আছে।
জবা বললে—ডাক্তারের কাছে লজ্জা করা বিপজ্জনক, রোগ সারাতে গেলে সমস্ত প্রকাশ করে বলতে হবে।
ভূতনাথ কী যেন একবার ভাবলে। তারপর বললে–কিন্তু বৌঠানকে যে আমি কথা দিয়েছি—কথা দিয়েছি, ব্ৰজরাখালকে বলবো না, বৌঠানের চাকর বংশীকেও বলবো না, কাউকেই না, এমনকি, তোমাকেও না।
–আমাকে তিনি চেনেন নাকি?
–আমি বলেছি তোমার কথা। জবা এবার হেসে বসে পড়লো সামনে। বললে—আমার সম্বন্ধে কী বলেছেন শুনি? খুব নিন্দে করেছেন নিশ্চয়।
—নিন্দে তোমার শত্রুতেও করবে না জবা—আর আমি তো তোমার শত্রুও নই—আর তাছাড়া তুমি আমার কে বলে না যে, খামকা তোমার আমি নিন্দে করতে যাবো।
—আপনার সঙ্গে তো আমার মনিব-ভৃত্যের সম্পর্ক, কী বলেন —আর কিছু নয়।
—আমিও তাই-ই বলেছি। কথাটা বলে ভূতনাথ আবার নিচু মুখে খাওয়ায় মনোযোগ দিলে। জবাও খানিক চুপ করে রইল। তারপর বললে—আপনি দেখছি শুধু অকৃতজ্ঞই নন, আপনি মিথ্যেবাদী।
ভূতনাথ খেতে খেতেই জবাব দিলে—আমি তাও বলেছি।
–তার মানে?
ভূতনাথ এ কথার কোনো জবাব দিলে না! যেমন খাচ্ছিলো তেমনি খেতে লাগলো।
—চুপ করে রইলেন যে-জবাব দিন!
ভূতনাথ এবার মুখ তুললে। দেখলে জবার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। বললে—আমরা পাড়াগাঁয়ের ছেলে একটু বেশি ভাত খাই, গুছিয়ে বলতে পারিনে বটে কিন্তু মান-অপমান জ্ঞান আমাদেরও আছে।
জবা বললে—শুধু আছে নয়, বেশি মাত্রায়ই আছে, নইলে মেয়েমানুষ বলে অপমান করতে সেদিন আপনার মুখে বাধতো।
ভূতনাথ এক মুহূর্তে বুঝে নিলে আবহাওয়াটা। তারপর বললে—সেদিন আমি অন্যায় করেছিলাম স্বীকার করি—কিন্তু ক্ষমা চাইতে ফিরে আসার পর তুমিই বা কোন্ আমার মর্যাদা রেখে কথা বলেছিলে? তারপর একটু থেমে আবার বললে-তোমাকেও তো দেখছি, আর বৌঠানকেও দেখলাম, অথচ
—অথচ কী বলুন?
ভূতনাথ হাসলো। বললে—না থাক, তুমি রাগ করবে।
-রাগ যদি করিই তো ভাত আপনাকে কম খেতে দেবো না তা বলে।
ভূতনাথ বললে—না, সে কথা হচ্ছে না, তোমাকে রাগালে আমার লোকশানই তো মোল আনা, তা জানি আমি, তোমার বাবা বলছিলেন, এ-সংসারের মালিক তো একদিন তুমিই হবে, তখন? তখন আমার সাত টাকার চাকরিতে টান পড়তে পারে কিম্বা সাত টাকা থেকে সতেরো টাকা হবার আশাতেও জলাঞ্জলি পড়বে হয় তো।
—দেখছি নামে আর চেহারাতেই শুধু ভূতনাথ—কিন্তু কথাগুলোর বেলায় কলকাতার ছোঁয়া লেগেছে এরি মধ্যে।
খাওয়ার পর হাত ধুতে ধুতে ভূতনাথ হাসতে হাসতে বললে—তুমি নিজের মুখে আসতে না বললে রোববার কিন্তু আমি আসবো না জবা।
জবাও হাসলো। বললে—আপনার আশা তো বড় কম নয় ভূতনাথবাবু!
ভূতনাথ জবার মুখের দিকে চেয়ে মনের কথাটা একবার ধরবার চেষ্টা করলো, কিন্তু জবা ততক্ষণে নিজের কাজে স্থানত্যাগ করে চলে গিয়েছে।
১৩. ১৮৯৭ সাল
১৮৯৭ সাল। ব্ৰজরাখাল রাত্রে বাড়ি আসেনি। আগের দিন রাত্রে বলেছিল—খুব ভোরে উঠবে বড়কুটুম-নইলে হয় তো দেখতে পাবে না। ভিড়ও হবে খুব—এখন তো আর নরেন দত্ত নয়—এখন স্বামী বিবেকানন্দ। ট্রেনটা বোধ হয় সকাল সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যেই এসে পৌঁছোবে, তার আগেই গিয়ে হাজির হয়ো–-আমি থাকবে।
