“ন ত্বহং কাময়ে রাজ্যং ন স্বর্গং ন চ পুনর্ভবম
কাময়ে দুঃখপ্তানাং প্রাণিনামার্তিনাশনং”—
—আহা, বাবাকে দেখেছি বাড়ির বিগ্রহের সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যান করছেন “ত্বমেকং জগকারণং বিশ্বরূপং”। বাবা ছিলেন আমার বড়ই গরীব–যজন-যাজন নিয়েই থাকতেন। মনে আছে আমি ছোটবেলায় হুঁকো কল্কে নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসতুম, দিনের মধ্যে অন্তত দশ-বারোটা কল্কে ভাঙতুম। মনে আছে বাবা সেই উঠোনের ধারে বসে বসে.. তোমার শুনতে ভালো লাগছে তো ভূতনাথবাবু? খারাপ লাগলে বলবে।
বহুবার শোনা গল্প। অনেকবার বলেছেন। তবু ভূতনাথ বললে—না খুব ভালো লাগছে, আপনি বলুন।
সুবিনয়বাবু দাড়িতে হাত বুলাতে বুলোতে আবার আরম্ভ করলেন—তখন এক পয়সায় আটটা কল্কে—সে পয়সাও খরচ করবার মতো সামর্থ্য ছিল না তার—কোথায় গেল সে-সব লোক। সেই অবস্থার মধ্যেই একদিন ঈশ্বরের কৃপা পেলেন বাবা, ধ্যানে পেলেন ‘মোহিনী-সিঁদুরের মন্ত্র–তাই থেকে চালা ভেঙে পাকা দালান উঠলো, দোতলা কোঠা হলো, মা’র গায়ে গয়না উঠলো। আর আমি এলাম কলকাতায় পড়তে, সেই পড়াই আমার কাল হলো ভূতনাথবাবু, আমি চিরদিনের মতো বাবাকে হারালুম। গল্প। বলতে বলতে চোখ ছল ছল করে ওঠে সুবিনয়বাবুর।
-জানো ভূতনাথবাবু যেবার সেই ডায়মণ্ডহারবারে ঝড় হয়, সেই সময় আমার জন্ম, সে এক ভীষণ ঝড়, বোধহয় ১৮৩৩ সাল সেটা, কলকাতায় সেই প্রথম ওলাউঠো হলো, জন্মেছি ঝড়ের লগ্নে, সারাজীবনটা কেবল ঝড়ের মতনই বয়ে গেল, বাবাকে যা কষ্ট দিয়েছি, বাবা প্রতিজ্ঞা করলেন আমার মুখদর্শন করবেন না—সত্যিই আর করলেনও না। আমি একমাত্র সন্তান, আমার অসুখের সময় বাবা কবিরাজ ডেকে আনলেন, কিন্তু ঘরে ঢুকলেন না, পাছে আমার মুখদর্শন করতে হয়। সেই বাবা আমার প্রেতলোকে এক গণ্ডুষ জলও পেলেন না তাঁর একমাত্র বংশধরের হাতে। তাই সেই পাপেই বোধহয় আমি আজ নির্বংশ—বলে খানিকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ভূতনাথের দিকে।
–কিন্তু কী করবো বলো ভূতনাথবাবু মন বলে অন্য কথা। হৃদয়ের কথা মন শোনে না। বলে–ভুল, ভুল-সব তোমার ভুল ধারণা। তথাগত প্রচার করলেন–জন্মেই বন্ধন, জন্মরহিত হতে পারলেই মুক্তি। তাই তো ভাবি—দ্বৈতের জগতে স্বর্গরাজ্য আসতে পারে না, নিত্য বৃন্দাবনের পরমানন্দ ব্রহ্মের রসোল্লাস যেখানে একত্বের মধ্যে সকল বহুত্বের চির-অবসান তা-ই কাম্য হওয়া উচিত—আমার জীবনের শেষ-দিনটা পর্যন্ত এর মীমাংসা বুঝি আর করতে পারবো না—মন বলে–ঠিক করেছে, হৃদয় বলে-না। অথচ দেখো ভূতনাথবাবু ‘মোহিনী-সিঁদুরের ব্যবসাও ত্যাগ করতে পারলাম না-ও ভড়ংটাও রাখতে বাধ্য হয়েছি।
সে কি! ভূতনাথ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলে। সব তবে ভড়ং। কিছু তবে সত্যি নেই এর পেছনে। খানিকটা দৈবশক্তি বা মন্ত্রশক্তি! ভূতনাথের মনে হলো কিছুটা দৈবশক্তি আছে জানতে পারলে যেন সে তৃপ্তি পায়। অন্তত একবারের জন্যেও সে বৌঠানের কাছে গিয়ে তা হলে এর গুণের কথা বলতে পারে।
সকাল থেকে যে-প্রশ্নটা বারবার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিলো, এই সুযোগে ভূতনাথ সেই প্রশ্নটাই করলে। বললে—আচ্ছা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ‘মোহিনী-সিঁদুরে’ কিছু কাজ হয়?
কিন্তু প্রশ্নটা করবার আগেই বাধা পড়লো। হঠাৎ পাশ থেকে বই পড়তে পড়তে জবার মা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন।
সুবিনয়বাবু সচকিত হয়ে উঠেছেন। কি হলো রাণু—কী হলো রাণু?
সুবিনয়বাবু যেন ভুলে গিয়েছেন ভূতনাথ এখানে বসে আছে। সুবিনয়বাবু হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে স্ত্রীর মাথাটা দুই হাতে ধরলেন। জবার মা’র হাত থেকে বইটা পড়ে গেল। আঁচলটা খসে গেল বুক থেকে। ছোট মেয়ের মতো হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি।
—কী হলো রাণু, কী হলো? বৃদ্ধ অথর্ব শরীর নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়লেন। উঠে স্ত্রীর মাথাটি ধরে রুমাল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে লাগলেন।
—কী হলো রাণু, বলল আমাকে? বলো—
কাঁদতে কাঁদতে জবার মা বললেন—আমার খিদে পেয়েছে।
—খিদে পেয়েছে, বেশ তো, কান্না কেন, খাও, খাবার আনছি আমি।
—কিন্তু এই মাত্র খেলাম যে—আরো প্রবল বেগে কাঁদতে লাগলেন জবার মা।
—তাতে কী হয়েছে রাণু, আবার খাও।
ভূতনাথ এই পরিস্থিতিতে কেমন বিব্রত বোধ করতে লাগলো। বললে—আমি এখন আসি তাহলে।
সুবিনয়বাবু মুখ ফেরালেন। তুমি যাবে?…তা হঠাৎ এই রকম হয় জবার মা’র, এই-ই অসুখ কি না, কিছুতেই সারলো না আর, আমার খোকার মৃত্যুর পর থেকেই এই রকম হচ্ছে। তোমারও খেতে দেরি হয়ে গেল ভূতনাথবাবু-তুমি যেন রাগ করো না জবার ওপর।
আর বাক্য ব্যয় না করে সোজা নিজের চেয়ারে এসে বসলো ভূতনাথ।
খানিক পরেই রতন খেতে ডাকতে এল।
খাবার সময় প্রথমে বিশেষ কথা হলো না। সারাক্ষণ জবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
একবার জবা বললে—ভাত নষ্ট করবেন না। ওগুলো সব খেতে হবে কিন্তু আপনাকে।
ভূতনাথ মুখ তুলে চাইলো। বললেপাড়াগাঁয়ের ছেলেরা ভাত একটু বেশিই খায়—কিন্তু তা বলে এত বেশি? চাল একটু কম নিতে বললেই পারতে।
—শেষে পেট না ভরলে, তখন?
জবার মুখ যেন গম্ভীর-গম্ভীর। বেশি কথার আবহাওয়া নেই তার। আবার অনেকক্ষণ চুপ চাপ। এ যেন কেমন বি ব্যাপার। এখানেই রোজ খেতে হবে—অথচ নিজের হাতে সব রান্নার ব্যবস্থা। যতদিন ঠাকুর না আসে, ততদিন! এ-ছাড়া গতিও নেই।
খানিক পরে ভূতনাথ আবার কথা কইলো। বললে–তোমার বাবা রবিবার দিন আমাকে আসতে বললেন, কিন্তু সন্ধ্যেয় না সকালে—কিছু বললেন না তো?
