ব্ৰজরাখাল সব শুনে বললে—তা বৌঠান কাউকে বলতে বারণ করে দিয়েছিল—বললে কেন আমাকে?
—তোমাকে সবই বলা যায় ব্রজরাখল।
শেষে ব্রজরাখাল বললে—তা ভালো, কিন্তু কাজটা ভালো কররানি বড়কুটুম, ওরা হলে গিয়ে সাহেব বিবি আর আমরা হলাম গোলাম—ওদের সঙ্গে অত দহরম-মহরম ভালো নয়—কাজটা ভালো করোনি বড়কুটুম।
রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়েও সেই কথাটা মনের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগলো। কাজটা কি সত্যিই ভালো করেনি সে।
বৌঠানের ডাকে না গেলেই কি ভালো করতে সে। কিন্তু খারাপটাই বা হলো কোথায়। প্রণাম তবে করেছিল সে কাকে? শুধু কি বৌঠানের যশোদাদুলালকে?
১২. মোহিনী-সিঁদুর আপিসে
‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে সেদিন সকাল থেকেই বড় কাজের তাড়া। একটা নিঃশ্বাস নেবার পর্যন্ত ফুরসুৎ পাওয়া যায় না। পাঠকজী তারই মধ্যে দুপুরবেলা ছাতু ভিজিয়ে খেয়ে নিলে। ভূতনাথেরও খুব খিদে পেয়েছে। তবে কি আজকে কেউ আর ডাকতে আসবে না!
একটা মনি-অর্ডারের কাগজ নিয়ে সোজা ওপরে চলে গেল। ভূতনাথ। সুবিনয়বাবু তেমনি ভাবে বসেছিলেন। পাশে জবা। আর একটা চেয়ারে জবার মা। বসে বসে বই পড়ছেন।
কাছে যেতেই ভূতনাথ লক্ষ্য করলে সুবিনয়বাবু মেয়ের সঙ্গে কী যেন আলোচনা করছেন। ভূতনাথ কাছে যেতেই জবা উঠছিল।
সুবিনয়বাবু বললেন–না, উঠে যেও না মা, বোসোলজ্জা কি মা?
জবা বললে—ভূতনাথবাবুর খাওয়ার এখনও যোগাড় হয়নি বাবা—আমি যাই।
—কেন? সুবিনয়বাবু অবাক হয়ে গেলেন। ভূতনাথবাবুর খাবার দিতে এত দেরি করা বড় অন্যায় মা।
—কিন্তু উনি কি আমাদের হাতে খাবেন? ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন না বাবা।
-কেন, ও-কথা কেন বলছে মা? বৃদ্ধ যেন কিছু বুঝতে পারলেন না।
ভূতনাথ কী জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শুধু।
জবার মা আপন মনেই বই পড়ছেন। তাঁর যেন এ-সব কথা কানে যাচ্ছে না।
জবা পরিষ্কার করে বললে—আমরা তত ব্রাহ্মণ নই বাবা।
-ও, তাও তো সত্যি। তা হলে তোমার খাওয়ার বন্দোবস্ত কী হবে ভূতনাথবাবু? এ-কথাটা আগে ভাবিনি তো মা-একটা ঠাকুরের ব্যবস্থা করতে হয়। পাঠককে একবার খবর দিতে হবে। ওরে রতন–
—সে যখন হবে, তখন হবে, কিন্তু এখনি তো আর ঠাকুর আসছে না—আজকে কি উনি উপোস করবেন?
—সে কি একটা কথা হলো? বলে সুবিনয়বাবু হতবুদ্ধির মতো ভূতনাথের দিকে চেয়ে রইলেন।
ভূতনাথেরও এই পরিস্থিতিতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল।
জবা এবার সোজাসুজি ভূতনাথকে প্রশ্ন করলে—আমি হাঁড়িটা চড়িয়ে দিলে, আপনি নামিয়ে নিতে পারবেন না—তাতেও আপনার কিছু আপত্তি আছে?
ভূতনাথ বললে—পারবো।
—এ তো বেশ কথা, খুব উত্তম কথা, যতদিন ঠাকুর না পাই, ততদিন এই রকম একটু কষ্ট করো ভূতনাথবাবু, জবা ঠিক বলেছে।
তা হলে আমি ব্যবস্থা করি গিয়ে। সুবিনয়বাবু বললেন—তা হলে, একটা কথা শুনে যাও মা, ভূতনাথবাবুকে আমি তা হলে রবিবার দিন আসতে বলি? কী বলো?
জবা মুখ নিচু করে বললে—সে তোমার অভিরুচি বাবা।
-না না, সে কি, তোমার বিয়ে, উৎসবটা তোমাকে কেন্দ্র করে, যাদের যাদের তুমি নিমন্ত্রণ করবে, তাদেরই আমি ডাকবো-আর ভূতনাথবাবু তো আমাদের ঘরের লোক—ব্রজরাখালবাবুর নিজের বিশেষ আত্মীয়।
-আমি ভূতনাথবাবুর রান্নার ব্যবস্থা করি গে বাবা—বলে দ্রুতপায়ে জবা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল এক নিমেষে।
ভূতনাথ এবার হাতের কাগজপত্র সুবিনয়বাবুর সামনে এগিয়ে ধরলে। যেখানে সই করবার, সেখানে সই করলেন তিনি। তারপর বললেন-বোসো, কথা আছে তোমার সঙ্গে ভূতনাথবাবু।
ভূতনাথ বসলো।
সুবিনয়বাবু বললেন—জবার বিয়ের কথা বলছিলাম, তা আসছে রবিবার দিন একটা ছোটোখাটো উৎসবের দিন স্থির করেছি। পরস্পর কথাবার্তা হবে। পাকাপাকি কথা সেই দিনই হয়ে যাবে। ভেবে দেখলাম আমার আর ক’দিন—আর উনিও–
পাশে-বসা জবার মা’কে নির্দেশ করে বলতে লাগলেন–আর উনিও না-থাকারই মতো। ওদিকে জবারও বিবাহের উপযোগী বয়েস, ভালো পাত্রও পেয়েছি, ছেলেটি মেধাবী, এম-এ পাশ করেছে। এবার আইন পড়ছে—বাপ বেঁচে নেই—তা হোক, এ সব সম্পত্তির ভার তো একদিন জবাকেই নিতে হবে। আমাদের পৈত্রিক কারবার
-বাবা ছিলেন গোঁড়া কালীভক্ত হিন্দু। আমি ধর্ম বদলেছি বটে, কিন্তু বংশের ধারা কোথায় যাবে—নিজের ছেলে নেই, তা না থাক, জামাইকেই ছেলের মতন করে নিতে হবে। তারপর খাওয়াপরার জন্যে চিন্তা করতে হবে না–আমি যা রেখে গেলাম…কী বলো, অন্যায় কিছু বলছি।
খানিকক্ষণ চুপচাপ। ভূতনাথ বললে—আমি আসি এবার।
—না রোসস একটু, তোমাকে সেই গল্পটা বলা হয়নি। প্রথম যেদিন দীক্ষা নিলুম—সে কী কাণ্ড ভূতনাথবাবু—শুনুন তবে
ভূতনাথ বললে—সে-গল্প আপনি আমাকে বলেছেন।
-বলেছি নাকি? তা বলেছি বটে, কিন্তু কেবল মনে হয় বুঝি বলা হলো না কাউকে। কেউ কি মনে রাখবে সে-কথা ভূতনাথবাবু? আমার সময় তো ঘনিয়ে এল-শ্রীমদ্ভাগবতে পড়েছি রন্তিদেবের গল্প, সমস্ত দিন ধরে সব দান করে যখন নিজের খাবার জলটুকুও এক ভিক্ষার্থী চণ্ডালকে দিয়ে দিলেন, তখন নিজের মনে যা বললেন— ভাগবতকার বলছেন তা অমৃত—ইদমাহামৃতং বচঃ—কী বললেন? না, বললেন—আমি ভগবানের কাছে পরম গতি চাই না, অষ্ট সিদ্ধিও চাই না-পুনর্জন্মও চাই না—আমি চাই আমি যেন সমস্ত জীবের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের দুঃখকে পাই, যাতে তাদের দুঃখ না থাকে—আর এক জায়গায় ভাগবতকার বলছেন–
