গুরুদেব বললেন–স্বামী সেবায়।
–স্বামী সেবায়?
—হ্যাঁ ভাই, স্বামী সেবায়, এ-বাড়ির ছোটকর্তাকে দেখছে তো? এতদিন আছো দেখেছো নিশ্চয়ই, তোমার কী মনে হয় জানিনে ভাই, কিন্তু আমাদের ভাড়ারে যে রাঙাঠাকমা আছে–সবাই তাকে রাঙাঠাকমা বলে, এ-বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো ঝি, আমার শাশুড়ীর বিয়ের সময় এ-বাড়িতে আসে, তা তারই মুখে শুনেছি ছোটবেলায় ছোটকর্তাকে নাকি দেখতে ছিল ঠিক দেবকুমারের মতো–যেমনি সুন্দর শ্ৰী, তেমনি সুন্দর গড়ন, তা শুনে ভাবি আমিই যদি দেবোলা হতে পারি তো ছোটকর্তারও দেবকুমার হতে দোষ কী! হয় তো শাপভ্রষ্ট দেবকুমারই হবেন, কী বলে ভাই, পৃথিবীতে এসেছেন প্রায়শ্চিত্ত-কাল পূর্ণ করতে। তা যেন হলো, কিন্তু একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয় ভাই-একএকদিন যখন রাত্রে ঘুম আসে না, যশোদাদুলালের পায়ের তলায় মাটিতে শুয়ে পড়ে থাকি, তখন এক-একবার ভাবি আমার বিধাতা পুরুষের দেখা পেলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতুম।
–কী কথা বৌঠান?
বৌঠান থামলো। বললে—না ভাই থাক, তুমি এক কাজ করো—সিঁদুরটা নিয়ে এসো–আর যদি পারো তত তোমার মনিবকে জিজ্ঞেস করে, মানুষদের বেলায় তোমাদের মোহিনীসিঁদুর’ যদিই বা খেটে থাকে, দেবকুমারদের বেলায় এ-সিঁদুর খাটবে কি না—
ভূতনাথ হেসে উঠলো।
বৌঠান বললে—হাসি নয় ভাই, আমি সত্যিই বলছি, বাবা আর গুরুদেব তো বলেছেন স্বামীসেবা করতে—কিন্তু স্বামীকে কাছে পেলে তবে তো সেবা করবো! তাই সেদিন পাঁজি পড়তে পড়তে হঠাৎ ওই বিজ্ঞাপনটা নজরে পড়লো তারপর বংশীও বললে কথায় কথায়—তুমিও নাকি কাজ করে ওখানে।
অনেক দিনের আগেকার সব কথা। সাইকেল-এ যেতে যেতে ভূতনাথের আজো যেন সে-দৃশ্যটা স্পষ্ট প্রত্যক্ষ মনে পড়ে। সেই বড়বাড়ির তেতলার শেষ ঘরখানার কথা। পটেশ্বরী বৌঠানের ঘর। উঁচু পালঙ্ক। বিলিতি পুতুলে ভর্তি আলমারি। আর সামনে বসে অপরূপ রূপসী বাড়ির ছোটবউ। যে-ঘরে ছোটকর্তার পদধূলি পড়ে না। যে-ঘরে বসন্ত-বাহার করুণ আর্তনাদ করে রাত্রের নির্জনে। যশোদাদুলালের সেবায় স্বামী-সেবা যেখানে হাস্যকর হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষের হিন্দু-আভিজাত্য যেখানে মোগল আমলের চৌকাঠ পেরিয়ে ব্রিটিশ আমলের নাচ-দরবারে গিয়ে থেমেছে। অনেক কোতল-কচ্ছলের পর শাসন মানতে চায় না নবজাগ্রত মন। নিয়মানুবর্তিতাকে যখন শৃঙ্খল বলে মনে হয়। কিন্তু ওদিকে চোখ রাঙিয়ে ছুটে আসছে আর এক সভ্যতা। ঘড়ির কাটার মতো সময়নির্দেশ করে পদক্ষেপ করে করে চলে যন্ত্রযুগ। গম-ভাঙা কন্স থেকে শুরু করে রেল-চলা পর্যন্ত অনেক পথ অনেক প্রান্তর পার হয়ে আসছে ১৮৯৭ সন। ওরা চেয়ে দেখলে না কেউ। মুখ ফিরিয়ে রইল। ওই হিরণ্যমণি আর কৌস্তুভমণিরা। বড়বাড়ির ইট চুন সুরকীর মধ্যে গাছের শেকড় তখন হাত বাড়িয়েছে অনেকখানি। মিছিমিছি মাদুলি পরে ছোটবউ, যশোদাদুলালকে মিছরিভোগ দেয়, শাড়ি গয়না আলতা পরে সারারাত প্রতীক্ষায় বসে থাকে। আর পাঁজির পাতায় উদ্গ্রীব আগ্রহে ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র বিজ্ঞাপনটায় চোখ বুলোয়।
অত বড় বাড়ির বউ। ঠিক এমন করে আলাপ পরিচয় হবে ভাবা যায়নি। ভূতনাথ ভেবেছিল-দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে সে আর পর্দার আড়াল থেকে কথা হবে ঝি-র মারফৎ। কিন্তু এ যেন কেমন হলো। এত ঘরোয়া। এত ঘনিষ্ঠতা। প্রথম দিনের পরিচয়ে বিশ্বাস না হবার মতো। তফাৎ তো কিছু নেই আর পাঁচজনের সঙ্গে। তবে হয় তো আড়ালে থাকে বলেই এত কৌতুহল, এত কল্পনা-বিলাস ওদের নিয়ে। কিম্বা হয় তত বৌঠান গরীব ঘরে মেয়ে বলেই এ-বাড়িতে এক ব্যতিক্রম।
যাবার আগে বৌঠান কললে—আমার যশোদাদুলালকে প্রণাম করলে না ভূতনাথ।
ভূতনাথ সপ্রতিভ হয়ে এগিয়ে গেল বিগ্রহের দিকে। যশোদাদুলাল একপদ হয়ে সোনার বাঁশি বাজাচ্ছেন। টানা টানা প্রকাণ্ড দুটি চোখ। সামনে গিয়ে নিচু হয়ে প্রণাম করলো ভূতনাথ। কিন্তু মনে হলো তার সে-প্রণাম যেন ঠাকুরের পায়ে গিয়ে পেঁছিলো না। বাইরে বেরিয়ে এসেও তার যেন মনে হয়েছিল-প্রণাম সে কাকে করেছে? সত্যি সত্যিই কি বৌঠানের ঠাকুরকে? না আর কাউকে। অথচ ঠোনকে প্রণাম করার তো কোনো অর্থ হয় না। বৌঠানকে দেখে কি শুধু ভক্তিই হয়েছিল? আর কিছু নয়?
চলে আসবার আগে বৌঠান বলেছিল—সিঁদুরটা নিয়ে তুমি নিজেই চলে এসো, বংশীকে বললেই বংশী তোমায় পথ দেখিয়ে দেবে।
বাইরে বেরিয়ে এসে ভূতনাথের মনে হলো—বৌঠান যেন তাকে আগে থেকেই চিনতো। কিন্তু কেমন করে চিনলে! তবে কি বংশীই তাকে সব বলেছে।
বারবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে বংশী বললেন শালাবাবু, আমি কেন বলতে যাবো, আমি তো কিছু বলিনি—আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ছোটমা-শালাবাবু লোক কেমন। তা আমি যা যা জানি সব বলেছি—মাইরি বলছি, আমি আপনার নিন্দে করিনি আমি তেমন লোক নই শালাবাবু।
বংশী চলে গেল কাজে।
ছুটুকবাবুর গানের আসর তখনও চলছে। চামেলি ফুলি চম্পা। হৈ হৈ শব্দে সমে এসে গান থামলো। এখন আর আসরে যাওয়া যায় না।
সমস্ত বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। ইব্রাহিমের ঘরের ওপর টিম টিম করে বাতিটা জ্বলছে। কলকাতার শহরও নিস্তব্ধ। বাইরের গেটে নাথু সিং পাহারা দিচ্ছে অবিশ্রান্ত। ঘরে গিয়ে দেখলে— ব্ৰজরাখাল অনেকক্ষণ এসে গিয়েছে। কী যেন একটা পড়ছে। ব্ৰজরাখালকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখে ভূতনাথ যেন কেমন চমকে উঠলো। একটু আগেই যেন কী একটা মহা অপরাধ করে এসেছে সে। মুখ দেখাতে যেন লজ্জা হলো।
