কিন্তু কথাটা বলে ভয়ও হলো। যদি সত্যি সত্যিই এখনি উঠে চলে যেতে হয়।
বৌঠান বললে—খুব তো বুদ্ধি তোমার-সাধে কি আর জবা তোমায় বোকা বলে—এতদিন এ-বাড়িতে আছো, এখনও টের পাওনি কিছু? এ-বাড়িতে রাত বারোটায় সন্ধ্যে হয়, জানো না?
ভূতনাথ চুপ করে রইল এবার।
বৌঠান এবার বললে—তা হলে কত দাম ওর—এই ‘মোহিনীসিঁদুরে’র?
—দাম, দু’ টাকা সওয়া পাঁচ আনা—কিন্তু এখন আমার টাকার দরকার নেই।
—কেন? চুরি করে আনবে বুঝি? তা হচ্ছে না। তারপরে বৌঠান ‘চিন্তা’ বলে ডাকতেই চিন্তা ঘরে ঢুকলো। বৌঠান বললে—এই চাবি নে চিন্তা, ভূতনাথকে পাঁচটা টাকা বের করে দে তো।
—পাঁচ টাকা আমি কী করবে? ভূতনাথ প্রতিবাদ করতে গেল।
—বাকিটা না হয় ফেরৎ দিও—বলে পাঁচটা চকচকে রূপোর টাকা হাতের মধ্যে গুজে দিলে বৌঠান। তারপর বললে সিঁদুরের কথাটা কাউকে যেন বলল না আবার।
ভূতনাথের ততক্ষণে বাকশক্তি রোধ হয়ে গিয়েছে। মনে হলো “বৌঠানের হাতের মধ্যে যেন কোনো যাদু আছে! এত নরম। এত স্নিগ্ধ! বৌঠানের মুখের দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। এখন যেন হঠাৎ বড় গম্ভীর দেখাচ্ছে বৌঠানের মুখটা।
বৌঠান বললে—সিঁদুরের ব্যাপারটা কাউকে বলবে না—মনে থাকবে তো?
–আপনি যখন বারণ করছেন, তখন কাউকেই বলবো না।
–বারণ না করলে বুঝি বলে বেড়াতে? বৌঠান হেসে ফেললে। ভূতনাথ এ-হাসির অর্থ ঠিক বুঝতে পারলে না। বৌঠানের মুখের দিকে চেয়ে বোবার মতো চুপ করে রইল।
বৌঠান বললে হাঁ করে দেখছো কী? জানো না, এ-সব কথা কাউকে বলতে নেই।
এবার আরো হেঁয়ালি ঠেকলে ভূতনাথের। সিঁদুর কিনতে দেওয়ার মধ্যে এমন কী গোপনীয় থাকতে পারে! কত লোকই তে সিঁদুর চেয়ে চিঠি পাঠায়। দোকানেও আসে কত লোক। কিন্তু কোন্ দুর্বোধ্য রহস্য আছে বৌঠানের এই সিঁদুর চাওয়ার পেছনে?
ভূতনাথ বললে—আপনাকে কথা দিচ্ছি বৌঠান–আমি কাউকে বলবো না।
—এমন কি বংশীকেও নয়।
–বংশীকেও নয়-কথা দিচ্ছি।
–তোমার ভগ্নীপতিকেও নয়।
–কথা দিলাম।
–এমন কি জবাকেও নয়—সে-ও ঠিক বুঝতে পারবে না, বিয়ে হলে বুঝতো।
ভূতনাথ নিজের অজ্ঞাতসারেই প্রশ্ন করল—কেন?
সে তুমি বুঝবে না ভাই, বিয়ে হবার আগে সব মেয়েমানুষরাও বোঝে না।
ভূতনাথ আবার প্রশ্ন করলো—আর রাধা? রাধার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, বেঁচে থাকলে সে-ও বুঝতে পারতো তো?
বৌঠানের চোখে মুখে কেমন ফিকে হাসি ফুটে উঠলো। বললে—তা কি বলা যায়, যার কপাল ভাঙে, সেই বোঝে, মেয়েমানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় লজ্জা, এর চেয়ে বড় অপমান আর যে নেই ভাই।
ভূতনাথ বৌঠানের গলার আওয়াজে কেমন যেন চমকে উঠলো। ভালো করে মুখের দিকে চেয়ে দেখলে। কাঁদছে নাকি বৌঠান! তবে চোখে মুখে অত হাসির ছটা কেন! সেই ভাবে থাকতে থাকতে হঠাৎ এক সময়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে হেসে উঠলো বোঠান। সাদা সাদা ঝিনুকের মতো দাঁত চিক চিক করে উঠলো বৌঠানের। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে এবার হরদম হাসতে লাগলো। বললে—এ এক অবাক বাড়ি ভাই—অবাক-বাড়ি। আমার বাপের বাড়িও দেখেছি—-আমার মা-র কথাও একটু-আধটু মনে পড়ে। আমি গরীব লোকের মেয়ে বটে—কিন্তু এ এক অবাক বাড়ি—অবাক বাড়ি এটা-আবার মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তেমনি হাসতে লাগলো বৌঠান। ভূতনাথ যেন কেমন অভিভূতের মতো বসে রইল সেই দিকে চেয়ে। পাগল নাকি ছোটমা। এতক্ষণ কি উন্মাদের সঙ্গে বসে সে গল্প করছে ধবধবে ফরসা হাত, মুখ, পা-সব থর থর করে কাঁপছে বৌঠানের। টোপাকুলের মত আলতা মাখা পায়ের আঙুলগুলো এক একবার বোধহয় হাসির দমকে সঙ্কুচিত হচ্ছে।
একবার মনে হলো হাত দিয়ে জোর করে বৌঠানের আঁচলটা টেনে নিয়ে দেখে বৌঠান কাঁদছে না সত্যি সত্যি হাসছে।
কিন্তু আঁচল যখন খুললো বৌঠান তখন একেবারে স্বাভাবিক মানুষ। বললে—আমাদের বাড়ির পুরুষমানুষদের দেখছো তো ভাই, শুনেছোও নিশ্চয় অনেক কিছু–এক এক সময় ভাবি, এ কী রকম করে হলো, এত বড় বাড়ি, এত নাম-ডাক, এত পয়সা এঁদের, কার পাপে এমন হলো এরা, কিন্তু তখনি মনে হয়, দোষ আর কারো নয়, দোষ আমারই কপালের। আর জন্মে কত পাপ করেছিলাম—তাই সব পেলাম, মেয়েমানুষ যা চায় সব’ পেলাম, রূপ পেয়েছি জগদ্ধাত্রীর মতো, লোকে তো তাই বলে, অমন দেবতার মতো বাপ, মায়ের অভাব বুঝতে দেননি, এত বড় বাড়ির বউ হলাম, টাকাকড়ি, গাড়ি, বাড়ি, চাকর, বাঁদি-যা কেউ পায় না—কিন্তু আসল জিনিষেই ফাঁকি—এর চেয়ে—
ভূতনাথ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলো।
বৌঠান বললে—স্বামিজীকে তুমি চেনো না, আমার বাপের বাড়ির কুলগুরু, তাঁকে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন—পটুর কপাল এমন করে ভাঙলো কেন গুরুদেব?—( আমার ভালো নাম পটেশ্বরী কি না, বাবা আমাকে তাই পটু বলে ডাকতেন) তা গুরুদেব বললেন:..। যাকগে সে-সব তোমার শুনে কাজ নেই ভাই।
ভূতনাথ কেমন যেন ছেলেমানুষের মতো বলে উঠলোনা, বলুন বৌঠান—শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে কিন্তু–
বৌঠান বললে—স্বামিজীকে তুমি দেখোনি ভাই, তাই হয় তত বিশ্বাসও হবে না তোমার—কিন্তু বাবা বলেন—উনি ত্রিকালজ্ঞ পুরুষ, ওর কথা মিথ্যে হয় না, হিমালয়ে গিয়ে তিনি পঞ্চাশ বছর ধ্যানে কাটিয়েছেন, তারপর এখানে এসে এখন ধর্ম প্রচার করছেন।
-কী বললেন তিনি?
বৌঠান এবার মুখে আঁচল চাপা না দিয়েই খিল খিল করে হেসে উঠলো। বললে-গুরুদেব বললেন, পটু আর জন্মে ছিল দেবোলা, দেবসভায় বাহ্মণের অপমান করেছিল—তারই শাপে এ-জন্মে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে—এ জন্মটা ওর এমনি করেই প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। বাবা জিজ্ঞেস করলেন—কীসে মুক্তি হবে ওর?
