ভূতনাথের দিকে চোখ তুলে ছোটমা এক বার ছোট করে ঘোমটা তুলে দিলে মাথায়।
তারপর বংশীই যেন চোখের ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলে—এই-ই মালাবাবু।
ছোটমা বললে—এসো-বোসো এখানে।
মেঝেতে একখানা গালচে পাতা। ভূতনাথ বসলো।
ছোটমা বললে—বংশী তুই একটু বাইরে দাঁড়া গিয়ে, আমি ডেকে পাঠাবো।
চিন্তাকেও কী একটা কাজের হুকুম করে বাইরে পাঠিয়ে দিলে ছোটমা। কেমন যেন প্রচণ্ড এক অস্বস্তিতে ঘামতে লাগলো ভুতনাথ। ছোটমা’র চেহারার দিকে বিশেষ করে মুখের দিকে যেন হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখলেও তৃপ্তি হয় না। মাথা নিচু করে বসেছিল ভূতনাথ। কিন্তু কেবল মনে হচ্ছিলো–আর একবার মুখ তুলে দেখা যায় না মুখখানার দিকে।
ছোটমা’র গলা শোনা গেল—ওরা তোমাকে শালাবাবু বলে ডাকে সবাই। আসল নামটা কেউ জানে না। বংশীকে বলেছিলুম,
ও-ও বলতে পারলে না।
ভূতনাথ মাথা নিচু করেই বললে—আপনিও ওই নামেই ভাকবেন।
—তবু বাপ মায়ের দেওয়া একটা নাম তত আছে তোমার।
–বাপ মাকে চোখে দেখিনি, আমার নাম রেখেছিল পিসীমা। আমার নাম শ্ৰীভূতনাথ চক্রবর্তী। নামটা সকলের পছন্দ হয় না।
—তুমি ব্রাহ্মণ–তা হোক, তবু তোমাকে আমি ভূতনাথ বলে ডাকবো–কেমন? বয়সে আমি তোমার ছোট হলেও সম্পর্কে তো বড়-আমাকে তুমি বৌঠান বলে ডেকো।
ভূতনাথ খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। তারপর চোখ তুলে বললে—আমাকে ডেকেছিলেন কী জন্যে, বংশী বলছিল—
—বলছি, কিন্তু তার আগে তুমি একটু জল খেয়ে নাও। আমার হাতে খেতে তোমার আপত্তি নেই তো?
বৌঠানের চাবির আর চুড়ির শব্দ কানে এল। পায়ের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। চওড়া পাড় শান্তিপুরে শাড়ির নিচে যে-টুকু দেখা যায় তা হয় তো শরীরের এক সামান্যতম অংশ। ছোট ছোট আঙুলগুলো আলতার বেষ্টনীতে অপরূপ অনবদ্য মনে হলো। ধবধরে দুধের মতো সাদা নখ—আলতায় ঘেরা। টোপা কুলের মতো যেন রসে ভরা।
চিন্তা শ্বেতপাথরের রেকাবীতে এনে রাখলে খাবার।
বৌঠান বললে—সব আমার যশোদাদুলালের প্রসাদ-তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললে—চিন্তা একটু জল দে ভূতনাথের হাতে।
বৌঠানের মুখে নিজের নামটা যেন আজ কেমন সুন্দর মনে হলো। ও নামটা আগে আর কারুর মুখে তো এত সুন্দর ঠেকেনি। মন্ত্রচালিতের মতো এক-একটা করে মিষ্টি মুখে পুরতে লাগলো ভূতনাথ। তারপর আশে পাশে চেয়ে দেখলে। ঘরের এক পাশে একটা প্রকাণ্ড পালঙ্ক। ছাদের কড়িকাঠ থেকে একটা রঙিন মশারি ঝুলছে। চূড়ো করে বাঁধা। এতখানি পুরু গদির ওপর শাখের মতো সাদা চাদর ঢাকা। দুটো মাথার বালিশ। সবই প্রকাণ্ড। পঙ্খের কাজ করা দেয়ালের গায়ে অনেক ছবি। পটের ছবি, শ্রীকৃষ্ণের পয়স ভক্ষণ। গিরি-গোবর্ধনধারী যশোদাদুলাল। ‘ময়ন্তীর সামনে হাসরূপী নলের আবির্ভাব। মদন ভস্ম-শিবের কপাল দিয়ে ঝাটার মতন আগুনের জ্যোতি বেরিয়ে আসছে। আরো কত কি। একটা কাচের আলমারিতে কত পুতুল! বিলিতি মেমঘাগরা পরা। গোরা পল্টন-মাথায় টুপি। খোপ মাথায় কালীঘাটের বেনে-বউ। আর মেঝের এক কোণে ছোট একটা জলচৌকির উপর ধূপ ধুনো জ্বলছে। ফুল আর বেলপাতার ভিড়ের মধ্যে রূপোর সিংহাসনের ওপর বসা শ্ৰীকৃষ্ণ। বৌঠানের যশোদাদুলাল। সোনার মূর্তি। বাঁশিটা পর্যন্ত সোনার তৈরি।
–পান খাও?
–না তো।
—খাও, একদিন খেলে দোষ হয় না, বৌঠান দিচ্ছে খেতে হয়।
পান চিবুতে চিবুতে ভূতনাথ ভাবছিল, হঠাৎ কীসের জন্যে এত আয়োজন আপ্যায়ন। এখন যদি হঠাৎ কোনো কারণে ছোটবাবু এসে পড়ে ঘরের মধ্যে। বংশী অবশ্য বলেছে—ছোটবাবু রাত্রে কোনোদিন বাড়ি থাকেন না। চুনীর কাছে থাকেন। রূপো দাসীর মেয়ে চুনীবালা। বাড়ি করে দিয়েছেন তাকে জানবাজারে। ভূতনাথ বললে—এখন আসি তা হলে বৌঠান—
—সে কি, আসল কথাটাই যে বলা হলো না—বংশী বলছিল, তুমি নাকি ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে কাজ করে?
–সে এমন কিছু নয়, ব্ৰজরাখাল বলেছে, যদ্দিন ভালো চাকরি পাই…তারপর ওদের আপিসে চাকরি খালি হলেই সায়েবকে বলে…
আমি সে-কথা বলছি না—’মোহিনী-সিঁদুরে’ কিছু কাজ হয় বলতে পারে?
হঠাৎ এবার ভূতনাথ সোজাসুজি বৌঠানের মুখের দিকে চেয়ে দেখলে। পাতলা দুটি ঠোট। লালচে আভা বেরোচ্ছে। কানের হীরে দুটো টিক টিক করে দুলছে। আর কপালের ওপর দু একটা অবাধ্য চুলের ওড়া। ঠিক তার নিচে দুটো কালো চোখের সহজ অথচ সুগভীর চাউনি। কাজল পরেছে নাকি বৌঠান!
বৌঠান আবার বললে-বংশী কিছু বলেনি তোমায়?
ভূতনাথ জবাব দিলে–বংশী শুধু বললে—আপনি আমায় ডেকেছেন। আমি আসবো-আসবে করে আসতে পারিনি—আপিস থেকে ফিরতেই দেরি হয়ে যায় রোজ।
–খুব বুঝি কাজ সেখানে? সহানুভূতি মেশানো বৌঠানের গলায়।
–একা তো সব আমাকেই করতে হয় কিনা—সুবিনয়বাবু শুধু টাকাকড়ির হিসেবটা রাখেন।
–সুবিনয়বাবু কে? তোমার মনিব বুঝি?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, ব্রাহ্ম ওঁরা, কিন্তু তোক খুব ভালো। আমার জন্যে ওদের ঠাকুরটাকেও তাড়িয়ে দিয়েছেন।
–কেন?
ভূতনাথ সবিস্তারে সব বললে। কত টাকা মাইনে, জবার ব্যবহার, জবার মা’র পাগল হওয়ার কথা—বাদ দিলে না কিছুই। যেন অনেক কথা বলতে আজ ভালো লাগলো ভূতনাথের। কোনো নারী আগে কোনোদিন ভূতনাথের কথা এমন করে মন দিয়ে শোনেনি, শুনতে চায়নি। এখানে এই বড়বাড়ির অন্দরমহলে এমন শ্রোতা পাওয়া যাবে কে জানতো। সহজ সাদাসিধে দুঃখের কাহিনী ভূতনাথের। ভালো করে গুছিয়ে বলবার ক্ষমতাও নেই তার। অথচ কে এমন করে ওকে আদর করে বসিয়ে খাইয়েদাইয়ে তার মুখ থেকে গল্প শোনে। এখন বৌঠানের মুখের দিকে চোখ রেখে কথা বলতেও যেন আর লজ্জা হলো না ভূতনাথের। বৌঠানের হাতে চাবির গোছাটা মাঝে মাঝে টুং-টুং করে বাজছে। সঙ্গে সঙ্গে চুড়িগুলোও। সিঁথির ওপর জ্বল জ্বল করে জ্বলছে সিঁদুরের রক্তিমা। মনে হয়, বৌঠান যেন এখনই সিঁদুর পরে উঠলে টাটকা। পাতাকাটা চুলের ওপর এখনও জল চকচক করছে। অল্প অল্প হাসি-হাসি মুখ। পাতলা ঠোট দুটো গল্প শুনতে শুনতে একটু একটু দাঁত দিয়ে কামড়াচ্ছে বৌঠান। ভূতনাথের এমন ভালো আর যেন আগে কখনও লাগেনি। ভূতনাথ আবার বললে—এবার আসি বৌঠান, আপনার খুব দেরি করে দিলাম।
