বৈদূর্যমণি চৌধুরীর পর জমিদারীর ভার পড়লো হিরণ্যমণির ওপর। কিন্তু বড়মাঠাকরুণ ছাড়লেও, মেজবাবই বা ছাড়বেন কেন তাকে। বরং সুবিধেই হলো। দুজনের দুটো বাড়ি হলো। তারপর এল হাসিনী। হাসিনীরও কাঁচা বয়েস। অনাদি মৌ লক টাকা পাঠান। সে টাকাও কম পড়ে। চিঠি যায় জোর তাগাদা দিয়ে। বিধু সরকার নিজে যায় তাগাদা করতে।
মেজবাবুর পানসি গঙ্গার বুকে পাল তুলে বরানগরের দিকে ভেসে চলে। আশে পাশের গ্রামের লোক শুনতে পায় গানের সুর, ঘুঙুরের শব্দ। নৌকোর ভেতর সুতীব্র বাতি জ্বলে, গঙ্গার বুকের একটা অংশ আলোয় আলো হয়ে যায়।
ছোটবাবু কৌস্তুভমণি চৌধুরীর তখন কম বয়েস। ওই ছুটুকবাবুর মতো। সবে লেখাপড়া ছেড়েছেন। ল্যাণ্ডোতে উঠতে যাবেন বিকেলবেলা। সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই মাথায় একটা আঘাত লাগলো সজোরে।
সর্বনাশ! একটা বাতাবি নেবুর খোসার টুকরো মাথায় লেগে পায়ের কাছে মাটিতে ছিটকে পড়লো।
প্রথমে রেগে গিয়ে ছলেন ছোটবাবু। তারপর বললেন—কে রে ও?
তোষাখানার সর্দার মধুসূদন যাচ্ছিলো সেখান দিয়ে। বললে–আজ্ঞে ও রূপো দাসীর মেয়ে চুনী।
–রূপো দাসী কে?
–আজ্ঞে বাটনা বাটে আর ডাল ঝড়ে ওই কোণের ঘরে বসে।
–ও-বলে বেরিয়ে গেলেন যেমন যাচ্ছিলেন। কিন্তু মধুসূদন ছাড়লে না। পাঁচ টাকা জরিমানা হয়ে গেল। মধুসূদনের জরিমানা। এ ওর প্রাপ্য। ওর আর নড় চড় নেই। মাইনেই তো পায় রূপো এক টাকা মাসে আর মা-মেয়ের খাওয়া পরা। মার কাছে বারো বছরের চুনী ঢিপ ঢিপ করে কিল খেলে গোটা কতক। চুলের মুঠি ধরে টেনে হিচড়ে নাকালের একশেষ করলে রূপো দাসী। শেষে কান্না–শতেক খোয়ারীর জন্যে আমার কি মরেও শান্তি নেই মা, কবে মরবি তুই, যম কি ভুলে গিয়েছে নিতে। পোড়া পেটের জন্যে ভূতের মতন খাটি—তাতেও শান্তি নেই।
মধুসূদনের কাছে আর্জি গেল।
মধুসূদন বলে—ছোটবাবুর হুকুম, আমি কি করবে তার। কিন্তু রূপোর সাহস আছে বলতে হবে বৈকি। পাঁচটা টাকা তত কম কথা নয়। কেঁদে কেটে ছোটবাবুকেই ধরে পড়লো সে। চুনী ছিল সঙ্গে। বারো বছর বয়সের চুনীবালা। কাঁদা কাটার ফল ফললল দিন কতক পরেই। রঙিন শাড়ি উঠলো চুনীবালার গায়ে, কানে মাকড়ি। পায়ে আবার আলতা। মাইনে বেড়ে এক টাকা থেকে দু’ টাকা হলো। রূপো দাসীর মুখে কথা ছিল না আগে। সেই মুখের ঝাল বাড়লো।
সৌদামিনী আনাজ কুটতে কুটতে সব দেখে। অত যে মুখ তার, তাও কিছু বলতে পারলে না। তবু স্বভাব যায় না মরলে। গজ গজ করে বলতে থাকে—চোক গেল তত তিভুবন গেল—ভোলার বাপ তাই বলতো-ফুলবউ, চোক কান থাকতে থাকতে তিভুবন চিনে নাও। কপাল না কপাল, ছি ছি, গলায় দড়ি জোটে না তোদর।
এ সব পুরোনো দিনের কথা। ওই ওরা সব জানে। ওই মধুসূদন, লোচন, বংশী, বেণী, শশী, সিন্ধু, গিরির দল।
রাত আটটা বাজলো অথচ বংশী তখনও এল না। কিন্তু এল অনেক পরে, যখন ছুটুকবাবুর আসরে ভূতনাথ তবলা বাজাচ্ছে।
গান তখন জমে উঠেছে। হঠাৎ বংশী পেছন থেকে আস্তে আস্তে ডাকলে–শালাবাবু—
ভূতনাথ পেছনে ফিরে দেখে বললে–দাঁড়া।
কিন্তু ছুটুকবাবু দেখতে পেয়েছে। বললে—কী বলছিস রে-বংশী?
–আজ্ঞে ছোটমা একবার শালাবাবুকে ডাকছেন।
–কেন?
বংশী বললে— জানিনে।
ছুটুকবাবুর তখন খোশ মেজাজ। একটু আগেই নিধুবাবুর টপ্পা শুনেছে। নেশার ঘোর রয়েছে। বললে—যাও না ভাই, ছোটমা ডাকছে, যাও না, দোষ কী।
কান্তিধরকে তবলা দিয়ে ভূতনাথ উঠলো। বললে—আমি আসছি এখনি।
অন্দর মহলের সিঁড়ির কাছে এসে ভুতনাথের যেন কেমন সঙ্কোচ হলে।
বংশী বললে—চলে আসুন শালাবাবু, দাঁড়ালেন কেন-বলে একবার গলা খাকরি দিলে। তারপর সে-সিঁড়ির শেষে দোতলার সিঁড়ি পড়লো। সিঁড়ির মাথায় তেলের আলো জ্বলছে টিম টিম করে। লম্বা বারান্দায় একটা কাকাতুয়া চিৎকার করে ডেকে উঠলো। একটু ভয় করতে লাগলো ভূতনাথের। তারপর কোথা দিয়ে কোন্ বারান্দা পেরিয়ে কোন সিঁড়ি দিয়ে উঠে তেতলার মহলে গিয়ে পড়েছিল সেদিন চিনতে পারেনি।
তেতলার বউদের মহলে পড়তেই সিন্ধুর গলা—কে?
– আমি বংশী।
-এখন একটু সবুর করতে হবে, বড়মা হাত ধুচ্ছে।
বংশী পেছন ফিরে বললে—একটু দাঁড়ান শালাবাবু।
একটু মানে যার নাম এক ঘণ্টা। ঠায় দুজনে দাঁড়িয়ে সেখানে। কী হলো!
বংশী বললে—বড়মা’র ছুচিবাই কিনা, হাত ধুতে একটু দেরি লাগবে।
সিন্ধুর গলা শোনা গেল—বড়মা আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন, উঠুন, উঠুন।
বড়মার গলা শোনা গেল অনেক ডাকাডাকির পর। বললেন —কবার হলো?
—আর তিন বার। কথাটা কানে যেতেই বংশী বললে—আর দেরি নেই, হয়ে এসেছে, একষট্টি বার হয়েছে—আর তিনবার হলেই শেষ।
তারপর অনুমতি পাওয়া গেল। সিন্ধু বড়মা’কে তখন ঘরে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে। বললে—এবার এসো গা
ভূতনাথ সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে হাজির হলো একেবারে শেষ ঘরখানার সামনে।
ডাকলে—চিন্তা, ও চিন্তা—
কালো কুচকুচে একখানা মুখ বাইরে এসেই হঠাৎ ভূতনাথকে দেখে ঘোমটায় ঢেকে গেল।
বংশী বললে–হ্যাঁ রে, তোর ছোটমা কী করছেন?
মুখ নিচু করে চিন্তা কী বললে বোঝা গেল না। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দুজনকেই আসতে বলে একপাশে সরে দাঁড়ালো।
» ১১. আজ এতদিন পরে ভাবতে অবাক লাগে
আজ এতদিন পরে ভাবতে অবাক লাগে, সেদিন সেই প্রথম দেখা ছোটমা’র চেহারাটা কেমন করে অমন সুন্দর লেগেছিল। ভূতনাথ যেন অত রূপ মানুষের শরীরে আর কখনও দেখেনি। এক এক জনের রূপ আছে, যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, প্রশান্তির প্রলেপ লাগায়, আলা ধরায় না—সে-ও বুঝি তেমনি। হঠাৎ তার সমস্ত শরীরে কে যেন চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে দিলো। চোখ নাক মুখের অমন শ্ৰী বুঝি মানুষের মধ্যে দুর্লভ। কিন্তু তা ছাড়াও সব মিলিয়ে যে-টা সব চেয়ে প্রথম নজরে পড়ে সে তত ছোটমা’র চেহারার খুটিনাটি নয়। ভূতনাথের মনে হয়েছিল—সেই চারটে দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে যেন কোটি কোটি মানুষের প্রাণের নিভৃততম কল্পনা। যুগযুগান্তের লাখ লাখ যুগের সমস্ত সৌন্দর্যের তিল তিল আহরণ করে যেন ছোটমা’র অবয়বে তিলোত্তমা মূর্তি নিয়েছে। তবু সে রূপ যেন শারীররূপ নয়, যেন তাকে স্পর্শ করা যায় না, ধরা ছোঁয়ার অনেক ঊর্ধ্বে সে, চাওয়া-পাওয়ার জগতের বাইরে এক অব্যক্ত বাণীময় রূপক কাব্য। যেন দেহ স্পর্শ করলে দেখা যাবে–দুধের ফেনার চেয়ে তা নরম, কাছে গেলে মনে হবে–আকাশের রামধনুর চেয়ে তা বর্ণাঢ্য। এতখানি প্রশান্তি বুঝি প্রশান্ত মহাসাগরেও নেই।
