বদরিকাবাবু রেগে গেল। বললে—তুই আবার জিজ্ঞেস করছিস, কেন? সাত শ’ বছর মোগল রাজত্বে ছ’ কোটি লোক মুসলমান হয়ে গিয়েছে, আর এক শ’ বছর ইংরেজ রাজত্বে ছত্রিশ লক্ষ লোক খৃস্টান হয়ে গেল—সে কি ভাবছিস ওমনি-ওমনি? নিমকহারামির গুনেগার দিতে হবে না? দেখবি সব যাবে—সব যাবে—কিছু থাকবে না, তাই দেখবো বলেই তো সারাদিন চিৎপাৎ হয়ে শুয়ে থাকি—আর টাক ঘড়িটার টিক-টিক শব্দ শুনি।
আজো ভূতনাথের মনে পড়ে বদরিকাবাবুর কথাগুলো বর্ণে বর্ণে কেমন মিলে গেল একে একে।
আপিস থেকে ফেরবার পথে বাড়ির সামনে আসতেই সেদিনও ব্রিজ সিং ডাকলে—শালাবাবু, ছুটুকবাবু বোলায়া আপকো।
» ১০. একা পেয়ে সেদিন বংশী এসে ধরলো
একা পেয়ে সেদিন বংশী এসে ধরলো। রবিবার। বললে— আজকে আপনাকে যেতেই হবে শালাবাবু-ছোটমা আমাকে রোজ বলেন—তোর শালাবাবুকে একবার ডেকে দিলিনে, আমি আপনাকে সুযোগ মতো ধরতেই পারিনে, আপনি ছুটুকবাবুর আসরে গিয়ে বসেন, আর রাত হয়ে যায়।
ভূতনাথ বললে-কী দরকার কিছু শুনিসনি তুই?
—তা তত ছোটমা আমাকে বলেন নি আজ্ঞে।
–কিন্তু ব্ৰজরাখালকে জিজ্ঞেস না করে যাই কি করে—তা ছাড়া বাড়ির মধ্যে, অন্দর মহলে…আমি অচেনা পুরুষমানুষ—যদি কেউ কিছু বলে—তখন?
—সে ছোটমা ডেকেছেন, আপনি কী করবেন? তা ছোটবাবু তো আর জানতে পারছেন না হুজুর—ছোটবাবু সন্ধ্যের সময় বেরিয়ে গিয়েছেন–আসবেন সেই আবার কাল ভোর বেলায়।
—কোথায় যান তোর ছোটবাবু?
–আজ্ঞে, সেই পিশেচ-মাগীর কাছে, জানবাজারে, ছোটমা বলেন—বামুনের শাপে নাকি অমন হয়েছে, আর জন্মে বামুনকে অপমান করেছিলেন—তাই এ জন্মে এই ভোগ।
–তুই তাকে দেখেছিস নাকি বংশী?
—দেখিনি আবার, ছোটমার পায়ের যুগ্যি নয় সে—তাতেই আবার কত ঠ্যাকার, নিজের হাতে এক ঘটি জল পর্যন্ত গড়িয়ে খান না। বাবু যেদিন আসেন না, সেদিন ছোটম পাঠায় কিনা আমাকে, মরতে মরতে যাই—এই এতটুকু বেলা থেকে দেখে আসছি তাকে, কী ছিল আর কী হয়েছে। ওই যে যদুর মা বাটনা বাটে, ওই কাজ আগে করত ওর মা—আমরা ডাকতুম রূপা বলে
—সেই রূপো দাসীর মেয়ে চুনী, তখন ছিল আট বছর বয়েস। তারপর কেমন করে ছোটবাবুর নজরে পড়ে গেল, তখন ছোটবাবুর। বিয়ে হয়নি, তারপর যখন ছোটমা এ-বাড়িতে এলেন, তখন রূপোর মেয়ের বয়েস তেরো। তখন থেকে আলাদা বাড়ি করে দিলেন ছোটবাবু, রূপো এ-বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে উঠলো জানবাজারের নতুন বাড়িতে—তা সমস্তই ছোটমা’র কপালের লিখন শালাবাবু, রূপোরই বা কি দোষ, আর তার মেয়েরই বা কী দোষ—তারপর বললে—তা হলে ওই কথাই রইল, খাওয়া-দাওয়া সেরে নিন—আমি ঠিক সময়ে আসবে খন।
তারপর সন্ধ্যে হলো। গেটের পেটা ঘড়িতে ছ’টা বাজলো, সাতটা বাজলল, আটটাও বাজলো। তখনও ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে ভূতনাথ। অনেকবার অনেক রকম করে ভাবতে লাগলো ব্ৰজরাখালকে না বলে কি বাড়ির বউ-এর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ভালো। তাও আবার ছোটবাবুর অসাক্ষাতে। যে-সে বাড়ি নয়, রাজা-রাজড়ার বাড়ি। এতদিন ধরে এ-বাড়িতে আছে, কোনোদিন বউদের মুখ দেখা দূরে থাক, চেহারাও দেখেনি সে। পেছনের দরজা দিয়ে মেয়েদের যাওয়া-আসার রাস্তা। সে গেট চাবি বন্ধই থাকে। যখন গাড়ি ঢোকে, তখন চাবি খোলা হয়। বড়বউ যখন কোনো শুভ-তিথিতে গঙ্গায় স্নান করতে যান, তখন খোলা হয় মাঝে মাঝে। মেজবউ বাপের বাড়ি যান মাঝে মাঝে। তাঁর মা আসেন, রাঙামা আসেন।
আর ছোটবউ?
বংশী বলে—ছোটমার তো মা নেই যে আসবে, গরীবের ঘরের মেয়ে, বাপের একটি মাত্তোর মেয়ে, ছোটমা’র রূপ দেখে বড়বাবু এ-বাড়িতে বউ করে এনেছিলেন, তা বাপও এখন মারা গিয়েছেন, যখন বেঁচে ছিলেন তখনও চলা-হাঁটা করতে পারতেন না, ধম্ম কম নিয়ে থাকতেন, এক গুরু ছিল, গুরুর আশ্রমই ছিল তার ভরসা।
ছোটবউকে দেখেনি ভূতনাথ। কোনো বউকেই দেখেনি। কিন্তু ভূতনাথের মনে হয় যেন তাদের প্রত্যেককে সে চেনে। রাজাবাহাদুর বৈদূর্যমণি চৌধুরী মারা গেলেন জমিদারীতে। একলাই যেতেন তিনি। নিজে গিয়ে দেখা শুনো করে আসতেন। নদীর ধারে চৌধুরীদের বিরাট কাছারি-বাড়ি। মাসের মধ্যে একবার করে তার যাওয়া চাই-ই। প্রজাদের নালিশ শোনা, তাদের খাজনা মকুব করা, এমন কত কাজ তাঁকে করতে হতো। গাঁয়ের পালোয়ানদের ডেকে তাদের কুস্তি দেখতেন। কুস্তিগীর হলে সাত খুন মাফ! সময় সময় লড়তেন তাদের সঙ্গে। তার কুস্তির আখড়ায় হনুমানজীর মস্ত একটা মূতি আজো আছে। তেল-সিঁদুর মাখানো মানুষ সমান মূর্তি। বদরিকাবাবু বলে—কিন্তু মরবার সময় এক ফোঁটা জল পর্যন্ত পেলে না–ও রাজাবাহাদুর নয় রে, রাজসাপ।
তা অত রাত্রে কে-ই বা জল দেয়। আর কে-ই বা খবর নেয়। আর কেউ জানতে পারলে তবে তো! সকালবেলা সবাই টে পেলে। অনাদি মৌলিক বুড়োমানুষ। তিন পুরুষের গোমস্তা। তিনি দেখলেন। দারোয়ান, সেপাই, বরকন্দাজ, সবাই দেখলে।
অতখানি লম্বা-চওড়া দশাসই শরীর বড়বাবুর। কুঁকড়ে নীল হয়ে পড়ে আছে উঠোনের মধ্যিখানে। আর পায়ের কাছেই আর একটা জিনিষ পড়ে আছে। সেটাও কম লম্বা-চওড়া নয়। উল্টে পাল্টে চিত হয়ে পড়ে আছে সেটা। দুটোই প্রাণহীন—অনাদি মৌলিক অন্ধকারে দেখেই সাত হাত পেছিয়ে এসেছিলেন। এক শনিবার, তায় জাত কালকেউটে।
সে সব পুরোনো ইতিহাস। ওই ছুটুকবাবু তখন ছোট। বড়বউ ছিলেন বড় ধর্মশীল। সাতদিন জলস্পর্শ করলেন না। তারপর যখন উঠলেন ভূমিশয্যা ছেড়ে, তখন আর সে মানুষ নন। এখন ভাত খাবার পর চৌষটিবার সাবান দিয়ে হাত না ধুলে শুদ্ধ হয় না শরীর। একটা সাবানকে কেটে চৌষট্টি টুকরো করতে হয়। সিন্ধু। সেই চৌষট্টি টুকরো সাবান আর চৌষট্টি ঘটি জল ঢেলে হাত ধুয়ে দেয় বড়বউ-এর। ঠাকুরবাড়ির প্রসাদের সন্দেশ, তা-ও ধুয়ে খেতে হবে। এমনি বিচার তাঁর।
