সেদিন শিব ঠাকুরের গলি দিয়ে আসতে আসতে আর একজন এক বাড়ির ভেতর থেকে ডেকেছিল।
—বাবা শুনছো—ও বাবা—
কেউ কোথাও নেই। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রাস্তায় লোকজন কেউ নেই বললেই চলে। স্ত্রীলোকের গলার শব্দ।
—এই যে বাবা, আমি এই দরজার ফাঁক দিয়ে কথা বলছি।
–দরজা খুলুন না, কী হয়েছে আপনার?
—কিছু মনে নিও না বাবা, তুমি আমার ছেলের মতন, একখান কাপড় নেই যে বেয়েই সামনে, এই দুটো পয়সা দিচ্ছি, দু’ পয়সার মুড়ি কিনে ওই জানালা দিয়ে গলিয়ে ফেলে দাও না বাবা।
কোথায় মেদিনীপুরের দুর্ভিক্ষ, ফরিদপুরের বন্যা—সবাই বুঝি জড়ো হয়েছে এখানে। অথচ বড়বাড়িতে অতগুলো লোক, অকারণে কত অপব্যয় হয়, কেউ দেখে না। বিলেত থেকে কাঠের বাক্স ভর্তি নানান জিনিষ। কাঠ-গ্লাশের ঝাড়-লণ্ঠন। একবার এল সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি উড়ন্ত পরী! গায়ে কাপড় নেই। হাতে একটা সাপ জড়ানো। মেজবাবুর নাচ ঘর সাজানো হলো। হাতীবাগানের বাজার থেকে নীলেমে অর্কিড গাছ কিনে নিয়ে এল ভৈরববাবু। চীনে-অর্কিড। একটা বাচ্চা গাছের দাম তিন শ’ টাকা। কলকাতা কেন, সারা বাঙলা দেশে কারো বাড়িতে এ-গাছ পাবে না। এই এক চিলতে গাছের জন্যে খদ্দের হলো অনেক। সবাই এল কিনতে। খাস লাট সাহেবের বাড়ি থেকে বাগানের সাহেব মালী এল, এল ঠণ্ঠনে, পাথুরেঘাটা, হাটখোলা, সব বাড়ির লোক। পাঁচ টাকা থেকে হু হু করে দর উঠতে লাগলো।
ভৈরববাবু যদি বলে—পঞ্চাশ—
ঠনঠনের দত্তবাবুরা বলে—বাহান্নো—
মল্লিকবাবুর লোক বলে—পঞ্চান্নো–
সেই গাছ কেনা হলো শেষ পর্যন্ত তিন শ’ টাকা দিয়ে। ভৈরববাবু সগর্বে বুক ফুলিয়ে সকলকে হারিয়ে দিয়ে গাছ নিয়ে এলেন বড়বাড়িতে। গাছ দেখতে জড়ো হলো বার-বাড়ির সবাই। অন্দর মহলেও পাঠানো হলো। মেজগিন্নী দেখতে চেয়েছেন। তিন শ’ টাকার গাছ। সোনা-দানা নয়, কুকুর-বেড়াল নয়, কিছু নয়-গাছ। মরে গেলেই গেল।
তা হোক, ভৈরববাবু গোঁফে তা দিতে দিতে বলতে লাগলো— বাবু তো বাবু মেজবাবু—ছেনি দত্ত বাবুয়ানি করতে এসেছে কার সঙ্গে জানে না।
সেই গাছ প্রতিষ্ঠা হলো। তার জন্যে ঘর তৈরি হলো। মেজবাবু নিজে এসে তদারক করে গেলেন।
ওদিকে খবর পৌঁছুল লাট সাহেবের কাছে। চীনে-অর্কিড তিন শ’ টাকায় কিনে নিয়েছে বড়বাড়ির চৌধুরী বাবুরা। লাট সাহেব খবর পাঠালে—গাছ দেখতে আসবেন তিনি। সোজা কথা নয়। সাজ-সাজ রব পড়ে গেল। ভেলভেটের চাদর পড়লে নাচঘরে। ঝাড়-লণ্ঠন ঝাড়-পোছ হলো। চুনকাম হলো ভেতরে বাইরে। রাজা-রাণীর ছবি দু’খানা মুছে টাঙানো হলো মস্ত আয়নাটার মাথায়। তার ওপর লাল শালু দিয়ে লেখা হলোGod Save the King. লাট সাহেব এসে তো শুধু মুখে যেতে পারেন না। খানার ব্যবস্থাও হলো। খাসগেলাশের ভেতর গ্যাসের বাতি জ্বললো। বাড়ি সুদ্ধ লোকের নতুন সাজ-পোষাকের ফরমাশ গেল ওস্তাগরের কাছে।
তিন শ’ টাকা গাছের পেছনে কিছু না হোক তিন হাজার টাকা বেরিয়ে গেল নগদ।
সেকালের বনমালী সরকার লেন-এর চৌহদ্দি গাড়িতে গাড়িতে ছেয়ে গেল।
তখন বড়কর্তা বেঁচে। লাট সাহেবকে গিয়ে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলেন তিনি। লাট সাহেব আর লাট সাহেবের মেম।
অনেক খানাপিনা হলো। খানার চেয়ে পানীয়ই বেশি।
তা গাছ দেখে ভারি প্রশংসা করলেন লাট সাহেব। ইণ্ডিয়ায় এত সব ধনী মহাধনী রয়েছে। পরিচয় করে কৃতার্থ হলেন তিনি। খানা খেলেন। ঘুরে ঘুরে সমস্ত বাড়িটা দেখলেন। বাঈজীর দল এসেছিল লক্ষ্ণৌ থেকে। পাঁচ শ’ টাকার মুজররা। সে-নাচ দেখলেন। বেনারসী পান খেলেন।
যাবার সময় বড়কর্তা সামনে এগিয়ে গিয়ে চীনে-অর্কিড গাছটা নিয়ে বাড়িয়ে ধরলেন। হুজর যদি গ্রহণ করেন তো চৌধুরী বংশ নিজেদের কৃতকৃতাৰ্থ বোধ করবেন।
লাট সাহেব নিজে হাতে করে আর নিলেন না। সঙ্গের লোক নিলে। যার জন্যে এত কাণ্ড, সেই গাছই চলে গেল শেষ পর্যন্ত লাট সাহেবের বাগানে।
কিন্তু ফল ফললো কয়েক বছর পরেই। বড়বাবু বৈদূর্যমণি চৌধুরী খেতাব পেলেন। তখন থেকে হলেন রাজাবাহাদুর বৈদূর্যমণি চৌধুরী।
বড়ভাই বৈদূর্যমণি চৌধুরী, মেজভাই হিরণ্যমণি চৌধুরী আর ছোট কৌস্তুভমণি চৌধুরী। বৈদূর্যমণির ইয়া পালোয়ানি চেহারা। কাশীর পালোয়ান বাড়িতে পুষেছিলেন শরীরটা গড়ে তোলবার জন্যে। লোহাকাঠের মস্ত দুটো মুগুর দু হাতে নিয়ে ভাজতেন দু’ ঘণ্টা ধরে। সংসারের মাথায় ছিলেন তিনি। ওদিকে জমিদারী দেখা, বাড়ির প্রত্যেকটি লোকের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রাখা, তা ছাড়া তাঁর ছিল নিজের কুস্তির সখ। পৈত্রিক সম্পত্তির শুধু রক্ষা নয় আয়তনও বৃদ্ধি করেছিলেন তিনি। তার আমলে বড়বাড়ির এ অবস্থা ছিল না। তখন এই বড়বাড়ির নাম করলে চিনতে পারতো সব লোক। আর এখন
এ সব গল্প বদরিকাবাবুর কাছে শোনা। কোথায় কোন্ পূর্বপুরুষ মুর্শিদকুলী খাঁ’র কাছে কানুনগোর কাজ করেছিল—তারই বংশধর।
বদরিকাবাবু বলেন–তাই তো বলি খেলতে জানলে কাণাকড়ি নিয়েও খেলা যায় হে—তা বড়বাবু যখন রাজাবাহাদুর হলো, চারদিকে কত ধুম-ধাম—সায়েব মেমের খানা-পিনা হলো—আমি এই ঘরটিতে চুপ করে বসে রইলাম। পিপে-পিপে মদ খেলে সবাই। আমি বললাম—তোমরা যাও, আমি ওর মধ্যে নেই, রাজাবাহাদুর হয়নি তত বড়বাবু, ‘রাজসাপ’ হয়েছে—যা বলেছিলুম সব ফলে গিয়েছে—সেই বড়বাবু মরলে একদিন, মরবার সময় এক ফোটা জল পর্যন্ত পায়নি।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করে—কেন?
