কেমন যেন কৌতূহল হলো ভূতনাথের।
আজকের মতন এত রাত্রে এ-বাড়ির এখনকার দৃশ্য কখনও দেখবার সৌভাগ্য হয়নি আগে। কিন্তু তবু, এ-বাড়ির আবহাওয়া আর হালচালের যতখানি পরিচয় সে পেয়েছে, তাতে যেন ওই নারী-মূর্তি দেখে অবাক হওয়ারই কথা।
উঠোন পার হবার পথে ওপরের আলোটা এসে পড়তেই যেন চেনা-চেনা মনে হলো। তারপর মূর্তিটা নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালো ছুটুকবাবুর বৈঠকখানার সামনে।
সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে কে যেন দরজা খুলে দিলে। ভূতনাথ ঘরের ভেতরকার আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলে শশীকে। ছুটুকবাবুর চাকর শশী। আর নারী-মূর্তিটাও এক নিমেষের জন্যে ভূতনাথের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠলো!
গিরি! মেজগিন্নীর ঝি গিরি!
কিন্তু একটি মুহূর্ত। তারপরেই ঘরের দরজা বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার সমস্ত অন্ধকার। একটা অন্যায় কৌতূহল ভূতনাথের সমস্ত মনকে যেন পঙ্কিল করে তুললে। এখনও কর্তারা কেউ বাড়ি ফেরেননি। আকাশের তারার দিকে চেয়ে রাতটা অনুমান করবার চেষ্টা করলে একবার। দ্বিতীয় প্রহর শেষ হবার উপক্রম। মেজকর্তা এখনও ফেরেননি। ছোটকর্তা ফিরবেন কিনা কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ না-ও ফিরতে পারেন। বন্ধ বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে শুধু দুজন—আধ-অচেতন ছুটুকবাবু, আর শশা। ওদের মধ্যে কে?
ঘুমে চোখ জুড়ে আসছিল কিন্তু শুতে গিয়ে ঘুম এল না তার।
ব্ৰজরাখাল সকাল বেলা দেখা হলেই জিজ্ঞেস করলে-কাল কোথায় ছিলে বড়কুটুম? তারপর সব শুনে বললে—তা ভালো তবে বুঝে শুনে চলে।
—কেন? ভূতনাথ একটু অবাক হয়ে গেল।
ব্রজরাখাল বললে—এখন সময় নেই আমার, আপিসে যেতে হবে, তবে একটা কথা বলি, ঠাকুর বলতেন—কাঁদলে কুম্ভক আপনিই হয়। গান-বাজনা টপ্পা-ঠুংরি ভালো বৈকি—কিন্তু মাঝে মাঝে একটু কেঁদো বড়কুটুম।
—কাঁদবো কেন মিছিমিছি।
—সে অনেক কথা বড়কুটুম, এখন আর আমার সময় নেই, আজকে আমার বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হবে, শীগ্রি নরেন আসছে, তারই তোড়জোড় হবে সব…
-নরেন কে—ব্রজরাখাল?
–ওই তোমার বিবেকানন্দ। ঠাকুর বলতেন,নরেন একদিন সমস্ত পৃথিবী কাপিয়ে দেবে—তা কাঁপিয়ে শুধু নয়, ভূমিকম্প লাগিয়ে দিয়েছিল আমেরিকায়। প্রতাপ মজুমদার, আনিবেশান্ত সব থ’ হয়ে গিয়েছেন। সেদিনকার ছোকরা নরেন তারই মধ্যে এত—তারা তো কেউ জানে না—এ শুধু ঠাকুরেরই লীলা.. তারপর থেমে আবার বললে—দেখবে বড়কুটুম, এবার আর ঠেকাতে পারবে না কেউ, একদিন এই নরেনই সমস্ত দেশকে বাঁচাবে। অনেক নেড়া-নেড়ী এসেছে, অনেক পাদরী এল, নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনাও হলো অনেক—কিন্তু দরিদ্রনারায়ণদের কথা আগে কেউ অমন করে বলেনি।
ভূতনাথ চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলো।
–আপিস যাবার দেরি হয়ে গিয়েছে। তবু ব্ৰজরাখাল বলতে লাগলোনরেন আমাদের চোখ ফুটিয়ে দিয়েছে এবার। বলেছে— সাত শ’ বছরের মুসলমান রাজত্বে ছ’ কোটি লোক মুসলমান হয়েছে, আর এক শ’ বছরের ইংরেজ রাজত্বে ছত্রিশ লক্ষ খৃস্টান—এটা কেন হয়? কেন হয়, এটা আগে কেউ এতদিন ভাবেনি বড়কুটুম, এবার মাদ্রাজে বক্তৃতা দিয়েছে নরেন তাতে বলেছে অনেক কথা। দাসত্ব বড় খারাপ জিনিষ বড়কুটুম—দেখো না, অনেকে কলম্বোতে গেল নরেনের সঙ্গে দেখা করতে—আমি পারলুম না।
আপিস যাবার সময় কোনো দিকে খেয়াল থাকে না আর। খানিক বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এল ব্রজরাখাল। বললে— মাইনে পেয়েছে। বড়কুটুম? পেয়েছে শুনে বললে—একটা টাকা দাও তো আমাকে।
–কেন, তুমিও তো কাল পেয়েছে। মাইনে?
—পেয়েছি, কিন্তু…ব্রজরাখাল হাসলে। বললে-পেয়েছিলাম, কিন্তু বরানগরে গিয়ে দেখি গুরুভাইরা সব উপোস করছে, ঠাকুর দেহ রাখবার পর থেকে গুরুভাইদের বড় কষ্টে দিন কাটছে, ভিক্ষে করে পেট চালায় সব, কাল গিয়ে দেখি রান্না-বান্নার যোগাড় নেই —তা শুধু তো বেদ-বেদান্ত পড়লে পেট ভরবে না, কারো খাবার কথা মনেই ছিল না, নরেন আমেরিকা থেকে কিছু পাঠিয়েছিল— আর আমিও সব মাইনেটা দিয়ে এলাম গুরুভাইদের হাতে।
একটা টাকা দিয়ে ভূতনাথ বললে—তারপরে সারা মাস যে সামনে পড়ে আছে-তখন?
ব্ৰজরাখাল হাসতে লাগলো। বললে তোমাকে উপোস করাবো না বড়কুটুম, ভয় নেই। তারপর বললে-ঠাকুর বলতেন–কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করতে না পারলে ভজন-সাধন হয় না। তা তোমার বোন মরে একটা দিক থেকে আমার বাঁচিয়ে গিয়েছে। আর টাকা, সেটা কী করে যে ত্যাগ করি, আজই যদি চাকরিটা ছেড়ে দেই তো কালই অনেক গুলো পরিবার উপোস করতে শুরু করবে। প্রত্যেক মাসের শেষে আমার মুখ চেয়ে যে বসে থাকে তার। এক টাকা এগারো আনা জোড়া কাপড়—তা-ই একখানা কাপড়ে বছর চালায় সব হতভাগীরা।
বেশি সময় ছিল না। ব্রজরাখাল চলে গেল।
সেদিন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিস থেকে আসবার পথে সেই কথাই মনে পড়লো। ফতেপুরে থাকতে মানুষের দারিদ্র এমন করে কখনও তত চোখে পড়তো না। এখানে কলকাতা শহরের মধ্যে থাকতে ক’মাস থাকতেই যেন চোখ খুলে গিয়েছে ভূতনাথের। চারদিকে বড় অভাব। বড় হাহাকার। রাস্তায় একটা ভিখিরী আধলা চাইতে চাইতে বড়বাজার থেকে একেবারে মাধব বাবুর বাজার পর্যন্ত পেছন পেছন আসে। বলে–একটা আধলা-পয়সা দাও বাবু—একটা আধলা-পয়সা দাও।
ভূতনাথ বলে—কোথায় বাড়ি তোমার?
বুড়ো মানুষ। গেরো দিয়ে দিয়ে কাপড়খানা কোনোমতে কোমরে জড়িয়ে আছে। বলে-বন্যে হয়ে আমাদের দেশ-গাঁ সব ড়ুবে গিয়েছে গো, ভাসতে ভাসতে ডাঙায় এসে উঠেছি—দু’দিন কিছু খাইনি—একটা আধা পয়সা দাও বাবু।
