হয় তো তাই।
নইলে ছুটুকবাবুই বা অমন হবে কেন।
ছুটুকবাবু দেখেই বললে—আরে আসুন, আসুন স্যার, ঘরে বসে রোজ তবলা শুনি আর ভাবি, এ তো পেশাদারী হাত। কানির কাজ এমন তো শুনিনি আগে—কোন ওস্তাদের কাছে নাড়া বেঁধেছিলেন ভাই?
ছুটুকবাবুর বন্ধুবান্ধবে ঘর ভর্তি। একজন তানপুরা ধরেছে। আর একজন হারমোনিয়ম। সকলেরই ঢেউ তোলা বাবরি ছাঁট চুল। চুনোট করা উড়নি। কোঁচানো ধুতি। মেঝের ওপর একহাত পুরু গদিতে ঘর জোড়া। ধবধবে সাটিনের চাদর। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে ছুটুকবাবু বসে বসেই ঘামছে। পানের ডিবে, জরদার কৌটো। সিগারেট।
ঠুংরি গানের তানের সময় ছুটুকবাবু মাঝে মাঝে চিৎকার করছে—কেয়াবাৎ-কেয়াবাৎ
সমের মাথায় এসে তবলার চাটির সঙ্গে গানের ঝোক মিলে গেলেই বলছেন—শোহ-আল্লা—শোহন্-আল্লা–
অনেক দিন অভ্যেস নেই ভূতনাথের। গাঁয়ের ওস্তাদের কাছে শেখা। দারা, কাহারবা আর একতালা নিয়েই বেশি ঘাটাঘাটি ছিল। কচিৎ কদাচিৎ যৎ, মধ্যমান, চলত। পূজোর সময় রসিক মাস্টারের ইয়ার-বক্সির এলে ঠুংরি টপ্পা হতো। যাত্রার আসরে মেথর-মেথরাণীর গানের সঙ্গে খেমটারই বেশি চল।
ছুটুকবাবু চিৎকার করে বললে—আর ঠুংরি ভালো লাগছে না–এবার গজল হোক মাইরি-গজল গা বিশে।
ছুটুকবাবুর হুকুম। গজল ধরলো বিশে মানে বিশ্বম্ভর। গলাটা ভালো। ধ ধরতে না ধরতেই জমে উঠলো।
সঙ্গে ভূতনাথের কাওয়ালির আড়ির ঠেকা।
ছুকবাবু আর পারলে না। দাঁড়িয়ে উঠলো। বললে— এবার গান জমে গিয়েছে মাইরি। তারপর উঠে গিয়ে পাশের পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। খানিক পরেই কাপড়ের কোঁচায় ঠোট মুছতে মুছতে আবার এসে তাকিয়ায় হেলান দিলে। গান তখন বেশ জমে উঠেছে। ছুটুকবাবু আরও ঘামতে লাগলো। লয় বাড়ছে। হাত তখন টন্ টন্ করছে ভূতনাথের। সমস্ত ঘরখানা মজে গিয়েছে সুরে।
বিশ্বম্ভর দুলছে। চোখ বোজা। উন্মাদ হয়ে গাইছে :–জখমী দিলকো না মেরে দুখায়া করো—
তারপর এক সময় সম পড়লো। হো হো হো করে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ছুটুকবাবু। এক এক করে সবাই এক-একবার পর্দার ভেতরে গিয়ে ঠোট মুছতে মুছতে ফিরে এসেছে। চোখ লাল সবার।
নেশার ঝেকে ছুটুকবাবু ভূতনাথের পা ছুঁতে এল।
–করেন কী, করেন কী, আহা হা—বলে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় ভূতনাথ।
মোসাহেবরা বলে—তা পায়ে না হয় হাতই দিলেন ছুটুকবাবু, পা তো আর আপনার ক্ষয়ে যাচ্ছে না!
ছুটুকবাবু পায়ে হাত দেবার চেষ্টায় উপুড় হয়ে পড়লো। বললে বাড়ির মধ্যে এমন গুণী রয়েছে, আর তোরা গোঁসাইজীর খোশামোদ করিস, খবরদার—এই শশী, শশে।
পর্দার ভেতর থেকে শশী বেরিয়ে এল।
ছুটুকবাবু বললে—শোন বেটা, কাল থেকে যদি গোঁসাইজীকে বাড়িতে ঢুকতে দিবি তো তোকে খুন করে ফেলবো, ব্রিজ সিংকেও খুন করব আমি। তারপর হঠাৎ শ্রদ্ধায় ভক্তিতে ছুটুকবাবু মুখের কাছে মুখ এনে বললে-বড় খাটুনি গিয়েছে আপনার, একটু হবে নাকি স্যার?
ছুটুকবাবুর কথা কিছু বুঝতে পারলে না ভূতনাথ। মুখ দিয়ে মদের গন্ধ অবশ্য আসছিল। তবু ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কী?
—ভালো জিনিষ ভাই, দিশি মাল নয়, বেশি নয়, একটুখানি, শ্যাম্পেন দিক একটু–
ভূতনাথ বড় বিব্রত বোধ করলো।
সামনের একজন বললে—ছুটুকবাবু ভালোবেসে দিচ্ছেন, না বলবেন না ভূতনাথবাবু—বলুন হ্যাঁ।
ছুটুকবাবু বললেন—বেশ, তা হলে–সিদ্ধির সরবৎ দিকতাও আছে। ওরে শশে—বেশ পেস্তা বাদাম দিয়ে যুং করে..পর্দার ভেতরে চলে যান, কেউ দেখতে পাবে না।
রাত বারোটা পর্যন্ত এমনি চললে সেদিন। গজলের পর টপ্পা। নিধুবাবুর টপ্পা। তারপর “চামেলী ফুলি চম্পা–”
শেষে যখন সবাই উঠলো, ছুটুকবাবুর তখন উথান শক্তি রহিত। তাকিয়ায় মাথা দিয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। সমস্ত বাড়ি নিঝুম হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণ ভূতনাথেরও জ্ঞান ছিল না। সমস্ত পরিবেশটা যেন কেমন সব ভুলিয়ে দিয়েছিল। গানবাজনা বন্ধ হবার পর, বাইরে আসতেই আচমকা যেন একটা আঘাত পেলে ভূতনাথ।
ভূতনাথ বিশুবাবুকে বললে—আপনার গানটা বেশ জমেছিল আজ।
বিশ্বম্ভর বললে—মনের মতো সঙ্গত করেছিলেন স্যার—গান গেয়ে বেশ আয়েশ হলো।
সকলেই অল্পবিস্তর অপ্রকৃতিস্থ। সবাই প্রায় ভূতনাথের সমবয়স্ক।
পরেশ বললে—সবাই আমরা অমৃত খেলাম—আপনি স্যার একেবারে নিরস্তু—এ কেমন যেন এক যাত্রায় পৃথক ফল…
কান্তিধর বললে—আহা, আজকে প্রথম দিন, যাক না, তুই বড় তাড়াহুড়ো করিস পরেশ। ছুটুকবাবুও কি প্রথম প্রথম খেত, কত কষ্টে নেশাটি ধরিয়ে দিয়েছি—আর এখন?
দরজা পর্যন্ত সবাইকে এগিয়ে দিয়ে আবার ফিরে এসে নিজের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দাঁড়ালো ভূতনাথ। ব্রজরাখাল জানতে পেরেছে নাকি? বজ্ররাখালকে যাবার সময় জিজ্ঞেস করাও হয়নি। এখানে ব্ৰজরাখালের পরিচয়-সুবাদেই থাকা। যাতে ব্ৰজরাখালের কোনো মর্যাদা হানি হয়, এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়। আস্তে আস্তে ঘরের চাবি খুলে দরজায় খিল বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ কেমন থমকে দাঁড়ালো সে!
মনে হলো গাড়ি বারান্দার সদর রাস্তা দিয়ে কে যেন সন্তর্পণে বেরোলো। অস্পষ্ট মূর্তি। কিন্তু মেয়েমানুষ বলেই যেন মনে হয়। চারিদিকে নির্জনতা। সমস্ত ঘরের আলো নিভে গিয়েছে। ইব্রাহিমের ঘরের ছাদের ওপর একটা তেলের বাতি জ্বলছে, সেই আলোর কিছু রেখা এসে পড়েছে ইট-বাঁধানো দেউড়ির ওপর। আশে পাশে কেউ কোথাও নেই। শুধু গেটের এক পাশে বসে ব্রিজ-সিং বন্দুক হাতে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে পাহারা দিচ্ছে। এমন সময় সদর-দরজা দিয়ে কে বেরোবে।
