লোচন আরো বলতে লাগলোবাবু এই বয়েসে কত দেখলুম —ঘোড়ার টেরাম ছিল—এখন কলের টেরাম হলো—তারপর কলের গাড়িও হবে—তা আর ভেবেই বা কী হবে, একদিন হয় তো হুঁকো কেউ খেতেই চাইবে না, তখন…কিন্তু তার আগেই যেন যেতে পারি বাবু—নিন—ধরুন, গুলের আগুন কি না—গল গল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে—তাহলে ওই কথাই রইলো, আপনি একটা করে আধলা-ই দেবেন—
কিন্তু ভূতনাথকে নিতে হলো না। বাধা পড়লো।
—এই যে ভৈরববাবু এসে গিয়েছেন।
লোচন তাড়াতাড়ি ভৈরবাবুর হুঁকো তৈরি করতে ভেতরে গেল। ভূতনাথ চেয়ে দেখলে—বাবু বটে ভৈরববাবু! ঢেউখেলানো বাড়ি চুল, বাঁকা সিঁথি, পরনে ফিনফিনে কালাপেড়ে ধুতি, গায়ে চকচকে বেনিয়ান, গলায় মিহি চুনোট করা উড়নি, পায়ে বগলস আঁটা চিনে-বাড়ির জুতো
লোচন হুঁকো বাড়িয়ে দিয়ে বললে—আজ যে এত সকালসকাল ভৈরববাবু?
—আজ যে ছেনি দত্তর সঙ্গে পায়রার লড়াই আছে রে— শুনিসনি তুই—মেজবাবু সেবার হেরে গিয়েছিল না, এবার পশ্চিম থেকে নতুন পায়রা এসেছে-ছেনি দত্তর গুমোর ভাঙবো এবার, ভালো গমের দানা খাওয়ানো হচ্ছে তো ওই জন্যে—এবার দেখৰি ছেনি দত্তর পায়রা তিনবার চক্কর খেয়েই বোম্-এ বসে পড়বে— মেজবাবুর সঙ্গে টেক্কা দিতে এসেছে ঠঠনের দত্তরা—
খানিক ভুড়ক ভুড়ক করে হুঁকো টানতে লাগলো ভৈরববাবু—
লোচন বললে-একটা কথা জিজ্ঞেস করবো হুজুর–
—বল না–
—শুনেছি ছেনিবাবু নাকি হাটখোলায় তেনার মেয়েমানুষকে পাকাবাড়ি করে দিয়েছে—
–শুনছিস ঠিকই লোচন, কিন্তু সে-বাড়ি তিন-তিনবার মর্টগেজ হয়ে এখন সে-বাড়ি মায় মেয়েমানুষ মল্লিকদের হাতে গিয়ে পড়েছে—সে খবর রাখিস–মাগগি গণ্ডার বাজারে মেয়েমানুষ পোষা ছেনি দত্তর কম্ম নয়—আর এদিকে আমাদের চুঁচড়োর বাগানে গিয়েছিলি নাকি এদানি?
—আজ্ঞে না।
—গিয়ে একদিন দেখে আসিস লোচন, খড়দা’র রামলীলার মেলায় সেদিন তিনটে মেয়েমানুষকেই নিয়ে গিয়েছিল মেজবাবু, দূর থেকে ছেনি দত্ত আড় চোখে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছিল— মেজবাবু বারণ করলো, নইলে শালাকে…
হঠাৎ এতক্ষণে ভূতনাথের দিকে নজর পড়তেই জিজ্ঞেস করলো —এ কে রে লোচন?
—আজ্ঞে উনি আমাদের মাস্টারবাবুর শালা, এখানেই থাকেন।
ভৈরববাবু তামাক খাওয়া বন্ধ করে বললে-তাই নাকি? কী নাম তোমার ছোকরা?
ভূতনাথ বেঞ্চি ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললে—আমার নাম শ্ৰীভূতনাথ চক্রবর্তী।
—দেশ কোথায়?
–নদেয়—ফতেপুর গাঁ।
–কী করা হয় এখানে?
–‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে চাকরি করি।
–কত বেতন পাও?
–সাত টাকা আর একবেলা খাওয়া।
—আর উপরি, উপরি কত…উপরি নেই? চলা শক্ত, নেশাটাআশটা করতে গেলে একটু টেনে-বুনে চলতে হবে ভাই—আগে সস্তা-গণ্ডার দিন ছিল, আগের কালে তুই বললে বিশ্বাস করবিনি লোচন, ওই এক পাটের দাম ছিল চার আনা,—ওই গাঁজাই বল আর চরস-ই বল সব জিনিষের দাম কেবল বেড়েই চলেছে—এমন করে দিন দিন জিনিষের দাম বাড়লে কী খেয়ে মানুষ বাঁচে বল—
লোচন বললে–উনি তামাকই খান না—তায় আবার বোতলের কথা বলছেন—
ভৈরববাবু বললে—তা তামাক খাও আর না-খাও ভাইপাড়াগাঁ থেকে নতুন এসেছো, বড় ভাই-এর মতো ভালো কথা বলছি ওটি খাবেনইলে এ লোনা হাওয়ার দেশ এমন পেট ছাড়বে— তখন…বলে ভৈরববাবু আবার টান দিলে হুঁকোয়। তারপর থেমে বললে-বিশ্বেস হচ্ছে না বুঝি ভাই। মেজবাবু তো লেখা-পড়াজানা লোক, মেজবাবু তো আর মিথ্যে বলবে না। তা ওই মেজবাবুর কাছেই শুনেছি, সেকালের মস্ত বড় একজন বাবু রামমোহন রায় খেতো আর সকলকে ডেকে ডেকে খাওয়াতো। রাজনারায়ণ বোস খেতো, মাইকেল মধুসূদন খেতে। তাছাড়া রামমোহন রায় তো ছিল মাল খাওয়া শেখাবার গুরু রে। তারপর এক টান টেনে ভৈরববাবু বললে—এই এখন তো আমার এই চেহারা দেখছিস, আগে ছিল প্যাকাটির মতন, মেজবাবু বললেন—নোনা লেগেছে—মাল খেতে হবে। মেজবাবুর কথায় খেতে শুরু করলুম—শেষে নীলু কবিরাজের সালসায় যা হয়নি, মাল খেয়ে তাই হলো, এখন যা খাই দিব্যি হজম হয়ে যায়। জিনিষটা যদি খারাপই হতো তো সাহেব বেটারা সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে এখানে এসে আর রাজত্ব করতে পারে?
কথাটা ভাববার মতন। না বিশ্বাস করে উপায় নেই।
তারপর ভৈরববাবু বললে—একবার চুপি চুপি খবরটা নাও তো লোচন মেজবাবুর ঘুম ভাঙলো কিনা। তারপর পকেট থেকে বার করলে একটা তামার পয়সা। বললে—নাও তোমার মামুলি নাও।
লোচন পয়সাটা নিয়ে ট্যাঁকে গুঁজলো।
সেদিন ওই পর্যন্ত। এ-বাড়ির হাল চাল দেখে ভূতনাথ এখন আর অবাক হয় না। রবিবার দিন ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসের ছুটি। ব্রজরাখাল সেদিন সকাল-সকাল বেরিয়ে যায়—বরানগরের বাগানে। ঠাকুরের চেলারা ওখানে থাকে। সারাদিন কী করে সেখানে, তারপর আসে সেই অনেক রাত্রে।
মেজবাবুকে এক-এক রবিবার দেখা যায়। গাড়িবারান্দায় এসে দাঁড়ায় ইব্রাহিম মিয়া গাড়ি নিয়ে। আরো দুখানা গাড়িতে থাকে মেজবাবুর মোসাহেবের দল। সকলেরই চুনোট করা উড়নি। বাঁকা সিঁথি, বাবড়ি চুল। ইব্রাহিমের গাড়ির ভেতর মেজবাবুর মেয়েমানুষ। ভালো করে দেখা যায় না। ফরসা টুকটুকে চেহারা। ঘোমটা খোলা। নাকে নাকছাবি। পানের ডিবে হাতে নিয়ে নামে এক-একদিন।
মেজবাবুর চাকর বেণী বলে—শালাবাবু সরে যান এখেন থেকে—বাবু দেখতে পেলে রাগ করবে।
সদলবলে চলে যায় সবাই। কখনও বাগানবাড়িতে। কখনও গঙ্গায় নৌকো-ভ্রমণে। কখনও খড়দা’র মেলায়। সঙ্গে থাকে ড়ুগি তবলা, ঘুঙুর। মেঝের ওপর শোয়ানো থাকে নাকি সার সার বোতল। খাবারের চাঙারি গাড়ির মাথায়।
