বেণী বলে—ওই যে কমবয়সী মেয়েমানুষটা দেখলেন, ও যা নাচে–
কমবয়সী মেয়েমানুষটার নাম হাসিনী। হাসিনী নাকি যেমন নাচে তেমনি গায়। ওর মা এসেছিল কাশী থেকে একবার দোলের সময় এ-বাড়িতে গান গাইতে। সঙ্গে এসেছিল হাসিনী। তখন হাসিনীর বয়স আট কি দশ। মেজবাবুর ভারি ভালো লাগলো দেখে। মা আর মেয়েকে আর ফিরে যেতে হলো না কাশীতে। এখানে বাড়ি ভাড়া করে দিলেন। আসবাবপত্র চাকর দারোয়ান বহাল হলো। তারপর হাসিনী বড় হলে, বুড়ী মা গেল মরে। এখন হাসিনী মেজবাবুর সম্পত্তি।
প্রথমে ছিল একজন। তারপর একজন বেড়ে হলো দুই। এখন তিনজন। মেজবাবুর বাবুয়ানি দেখে কলকাতার বাবু-সমাজের তাক লেগে গিয়েছে।
ভূতনাথ বললে-মেজগিন্নী এসব জানেন তো?
বেণী বলে–মেজমা বড় ঘরের মেয়ে-ওসব গা-সওয়া। মেজবাবুর শ্বশুর এখন বুড়ো থুত্থুড়ো, তবু এখনও রবিবার রাতটা বাড়িতে কাটান না, বাঁধা মেয়েমানুষ আছে তার। মেজমা তাকে রাঙামা বলে ডাকে। এ-বাড়ি থেকে পূজোর নেমন্তন্ন গেলে রাঙামা’র বাড়িতেও খবর দিতে হবে—তত্ত্ব এলে দু’বাড়ি থেকেই আসে। সেবার মেজমা’র অসুখ হলো—রাঙামা নিজে এসে সাতদিন সাত রাত্তির সেবা করলে। কারো নিজের মা-ও অমন সেবা করতে পারে না। আহা, সাক্ষাৎ সতীলক্ষ্মী, যেমন রূপ…তেমনি…এদানি তত মেজবাবু তবু যা হোক রাত্তিরে বাড়ি ফেরেন—আর আগে?
আগেকার ব্যাপার ভূতনাথের জানবার কথা নয়।
-আগে সেখানেই পড়ে থাকতেন যে। খাজাঞ্চীবাবু আমার হাতে দপ্তরের কাগজপত্তর দিতেন, আমি সেই মেজবাবুর মেয়েমানুষের বাড়ি থেকে সই সাবুদ করে নিয়ে আসতুম। মদ খেলে মেজবাবুর আর জ্ঞান থাকতো না কিনা, কাপড় সামলাতে পারতেন না। আমি গেলেই জুতো পেটা করতেন। ও ছাই ভস্ম খেলে কি আর জ্ঞান গম্যি থাকে মানষের? আমি হাসতুম—কিন্তু মাঠাকরুণ খুব বকুনি দিতেন। বলতেন—নেশা করেছে বলে কি একেবারে বেহেড হয়ে গিয়েছে। তুই কিছু মনে করিসনে বাবা, এই চার আনা পয়সা নেমেঠাঁই কিনে খাস।
বেণী বলে—ওই যে পানের ডিবে হাতে বুড়োপানা মেয়েমানুষকে দেখলেন—ওই হলো বড়মাঠাকরুণ। মেজবাবু ওঁকে ভারি ভয় করেন। বড়মাঠাকরুণ যদি বলেন মদ খাওয়া বন্ধ—তো বন্ধ। মেজমাঠাকরুণ বলুন আর ছোটমাঠাকরুণই বলুন—বড়মাঠাকরুণ একবার ‘না’ বললে কারু সাদ্যি নেই মেজবাবুকে দিয়ে হাঁ বলায়।
রবিবার মোসাহেব আর মেয়েমানুষের দল নিয়ে মেজবাবু চলে গেলেন। হয় তো গঙ্গার ওপর পানসিতে বসে খানা-পিনা হবে। বড়মাঠাকরুণ নিজে মেপে মেপে মদ ঢেলে দেবেন। তার নিজের পূজো-আর্চা ব্রত-পার্বণ আছে। সব সময় তিনি দলে যোগ দেন না। বড়মাঠাকরুণ পূর্ণিমে-অমাবস্যা তিথি-নক্ষত্র দেখে চলেন। ভারি বিচার সব বিষয়ে। বাসি কাপড়ে মদ খান না। কাচা কাপড় পরে ঠাকুরঘরে ঢোকেন। কালীবাড়িতে বিশেষ বিশেষ তিথিতে পূজো পাঠিয়ে দেন পাণ্ডার হাতে।
আর মেজমা?
বেণী বলে—আর মেজমাকে দেখে আসুন গিয়ে। তেতলায় পালঙে বসে সিন্ধুর সঙ্গে বাঘ-বন্দী খেলছেন—নতুন নতুন গয়না গড়াচ্ছেন, একবার গোটছড়া ভেঙে বিছে হার হচ্ছে, বিছে হার পুরোনো হলে অনন্ত হচ্ছে, অনন্তও পুরোনো হয়ে গেলে চূড় হচ্ছে। হয় তো এবার পূজোয় হলো কমল হীরের নাকছাবি, আবার কালীপূজোয় হবে চুণী বসানো কান-ফুল, মুক্তোর চিক নয় তো পান্না বসানো লকেটওয়ালা চন্দ্রহার।
মেজবাবুর গাড়ি চলে যাবার পর অনেকক্ষণ ভূতনাথ চুপ চাপ সেইখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে। পিসীমা’র কথা মনে পড়ে যায়। পিসীমা’র শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঁচ টাকা মনি-অর্ডার আসতে। ওই টাকাতেই মাস চলবে। ওই পাঁচটা টাকার জন্যেই পিসীমা’র কত ভাবনা। গাজনার পোস্টাপিসে ভূতনাথ হয় তো গিয়ে দেখলে মাস্টারবাবু নেই। শোনা গেল, পোস্টমাস্টারবাবুর অসুখ। বলে পাঠিয়েছে—আজ আর উঠতে পারছিনে—কাল এসো।
পোস্টমাস্টারবাবু বুড়ো মানুষ। এক-একদিন হয় তো গরুর জাব দিচ্ছে। বলে পাঠিয়েছে-এবেলা আর হবে না, বড় কাজে ব্যস্ত আছি, ওবেলা সকাল-সকাল এসো হে।
ওবেলা যেতে মাস্টারবাবু হয় তো বললে—গায়ে তো যাচ্ছে, তা গায়ের চিঠিগুলো নিয়ে যাও না সঙ্গে। পিওন আর আজকে ওদিকে যেতে পারবে না, গঞ্জের হাটে পাঠিয়েছি তাকে।
ছোটো একটা বাক্সর মধ্যে সেই পাঁচটি টাকা রেখে একটি করে গুণে গুণে পয়সা খরচ করতে পিসীমা। ভূতনাথ মাঝে মাঝে চাইতে–একটা আধলা দাও না পিসীমা।
আধলা পিসীমা দিতো না। বলতে—রইল তত তোরই জন্যে—আমি মরে গেলে তুই-ই নিস।
কিন্তু সে পয়সা-কড়ি পিসীমা’র অসুখেই সব খরচ হয়ে গেল। তা তার জন্য আর কি থাকবে?
আর এ-বাড়িতে কোথায় কেমন করে কে পয়সা উপায় করে কে জানে। বাবুরা ঘুম থেকেই ওঠে দুপুর একটার সময়। আপিসেও কেউ যায় না। ব্যবসাও কেউ করে না। অথচ এতগুলো লোক—সব বসে বসে খাচ্ছে।
০৮. আয়ের বহরটা বোঝা যায় না
আয়ের বহরটা বোঝা যায় না। কিন্তু খরচের বহরটা বোঝ যায় খাজাঞ্চিখানায় গেলে।
বিধু সরকার মধ্যেখানে উবু হয়ে বসে, আর দু পাশে আরো চার পাঁচজন ঢালু বাক্সর ওপর খেরো খাতায় লেখাপড়া করছে।
বিধু সরকার কানে কলমটা গুজে হাত বাড়ায়—পাট্টা-বইটা দেখি কেশব।
মোটা খেরো খাতাটা এগিয়ে দিয়ে আবার লিখতে বসে কেশব।
ভূতনাথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। খেরো খাতার ওপর মোটা মোটা হরফে লেখা—ফিরিস্তি কাগজ পাট্টা-নকল বহি, শ্ৰীযুৎ মিস্টার উইলিয়ম ফ্র্যাঙ্কল্যাণ্ড সাহেব, সন…
