লোচন ডেকে বসিয়েছিল বেঞ্চিতে। বললে—অধীনের নাম লোচন দাস–
চারিদিকে হুঁকো গড়গড়া ফরসি আর তামাকের বোয়েম। দেয়ালের গায়ে সার সার নল ঝুলছে। লাল নীল রেশমের সিস্কের জরির কাজ করা সব। হুঁকোর নলের মধ্যে শিক পুরে দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে।
শিক চালাতে চালাতে লোচন বললে—তামাক ইচ্ছে করবেন নাকি শালাবাবু
এ-বাড়িতে শালাবাবু নামেই ভূতনাথকে সবাই চেনে। আর সুবিনয়বাবুর বাড়িতে সে কেরানীবাবু।
ভূতনাথ বললে—তামাক খাইনে তো আমি–
কথাটা শুনে লোচন মনোযোগ সহকারে ভূতনাথের দিকে চেয়ে দেখলে খানিকক্ষণ, তারপর বললে-কিন্তুক এই তো তামাক ধরবার বয়েস আপনার—এবার ধরে ফেলুন আজ্ঞে—আর দেরি করবেন না
ভূতনাথ কেমন যেন অবাক হয়ে গেল। ভূষণ কাকা তামাক খেতে খুব। রাধার বাবা নন্দজ্যাঠাও তামাক খেতেন। তাছাড়া বারোয়ারি ক্লাবের যাত্রার দলে ছোট বড় সবাই কম বেশি তামাক খেতে। কেউ সামনে—কেউ বা লুকিয়ে। মল্লিকদের তারাপদ খেতে ‘বার্ডস-আই’। একবার যাত্রাঘরের প্রায়-নিভন্ত হুঁকোতে টানও দিয়েছিল ভূতনাথ। কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছিল তখনি। বাইরে রসিক মাস্টার আসছিল। ঘরে ঢুকতেই বললে—কাশে কে—
তারপর ভূতনাথকে দেখে বললেও, নতুন খাচ্ছো বুঝি ছোকরা—তা প্রথম প্রথম অমন হবেই তো-একটু জল খাওহেঁচকি উঠবে না–
সেই হেঁচকির চোটে আর খাওয়া হলো না তামাক। তারপর কলকাতায় এসে ব্ৰজরাখালের সঙ্গেই কাটলো দিনরাত। শহরের আশে পাশে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছে ব্ৰজরাখাল। তার ওসব নেশা-টেশার বালাই নেই। আর সুবিনয়বাবু ঘোর ব্রাহ্ম। তার বাড়িতে ও-পাটই নেই। ফলাহারী পাঠকরা বিড়ি খায়—তাও কারখানার ভেতরে বসে নয়। রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে খেয়ে আসে।
লোচন বললে-তেল মাখার পরেই তামাকটা জমে কি না— দিই সেজে—বলে সত্যি সত্যিই সাজতে লাগলো লোচন। বললে –মেজকত্তা যেটা ভাত খাবার আগে খান—সেই তামাকটা দিই আপনাকে—দেখবেন খিদে হবে—রাত্তিরে ঘুম হবে ভালো।
ভূতনাথ বললে—না লোচন, তামাক আমাকে ধরিও না— গরীব লোক, শেষকালে—
লোচন বললে–পয়সা খরচ আপনার কিসে হচ্ছে—এই তো ভৈরববাবু খান–বাড়িতে তামাকের পাট রাখেননি—আমিই ব্যবস্থা করে দিয়েছি—দিনে একটি করে পয়সা দেন, যতবার খুশি খেয়ে যান—ওঁর ডাবা হুঁকো আমি কাউকে ছুঁতে দিইনে—
লোচন বেশ চুরিয়ে চুরিয়ে তামাক সাজতে সাজতে বললে— এ-বাড়িতে কোনো জিনিষের তো আর হিসেব নেই—ছত্রিশ রকমের নেশা বাবুদের-তারি মধ্যে যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন ওই তামাকটাই যা খান—ওই যে ছুটুকবাবুকে দেখেছেন তো–
ভূতনাথ বললে—দেখেছি বৈ কি-ওই যে গানের আসর বসান–
—আজ্ঞে, ওই ছুটুকবাবুকে তো আমিই ধরিয়েছি—হালের ছোকরা মানুষ—তামাকের চেয়ে সিগারেটের দিকেই ঝোক বেশি, দশ পয়সায় এক কৌটো সিগারেট হয়—আর বাহারও খোলে চেহারার—আমি একদিন বড়মাকে গিয়ে বললাম—খোকাবাবুর বয়েস হচ্ছে, এবার তামাক ধরিয়ে দেই—
তা বড়মা বললেন—তামাক ধরাবি খোকাবাবুকে তা আমার অনুমতি কেন–
বড়মা আমার ভারি রাশভারি মানুষ, বিধবা হয়েছেন ওই খোকাবাবু হবার পরকারো সাতে পাঁচে থাকেন না, চেহারা নয় তো, যেন সাক্ষাৎ ভগবতী।
আমি হেসে বললাম—তা কি হয় বড়মা, যদ্দিন আপনি বেঁচে আছেন তদ্দিন আপনার হুকুম না মেনে কি কিছু করতে পারিশেষকালে অধমকে অপরাধী করবেন আপনারা সবাই
লোচন বলতে লাগলো তারপর থেকে খোলাখুলি হুঁকোর ব্যবস্থা করে ফেললাম, খাজাঞ্চীখানায় গিয়ে সরকারবাবুকে ধরলুম, বড়মা’র হুকুম পেয়েছি—আর কার তোয়াক্কা–চিৎপুরের নতুন বাজার থেকে রূপোর গড়গড়া, ফরসি সব এল—ভসচায্যি মশাইকে দিয়ে দিনক্ষণ দেখিয়ে হাতে নল ধরিয়ে দিলুম-কলকেয় ফুঁ দিতে দিতে লোচন বললে—গোলাপ জল দিয়ে কাশীর কলকেয় বেশ করে তাওয়া দিয়ে বালাখানা তামাক সেজেছিলুম, ছুটুকবাবু খেয়ে এক গাল হাসি, ভারি খুশি হয়েছিলেন, একটু কাশি নয়, হেঁচকি নয়—বললে বিশ্বেস করবেন না, নগদ এক টাকা আমায় বকশিস করে ফেললেন, আর সরকারবাবুকে বলে দিলেন আমার নামে একটা গামছার খরচা খাতায় লিখতে
তারপর একটা কড়ি বাঁধা ডাবা হুঁকোয় কলকে বসিয়ে ভূতনাথের দিকে এগিয়ে দিলে। বললে—এটা বামুনের হুঁকোতারকবাবু মতিবাবু সব এতেই খান–
ভূতনাথ বললে—কেন মিছিমিছি পেড়াপীড়ি করছে লোচন, আমি ও খাইনে—
—এ কেমনধারা কথা হলো আজ্ঞে?
লোচন যেন কেমন বিমর্ষ হয়ে এল। তারপর যেন একটা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান করতে পেরেছে এমনি ভাবে বললে মরুকগে তা না হয় আপনি একটা করে আধলাই দেবেন রোজ, আমি তো রইলাম, রোজ এসে খেয়ে যাবেন যখন ইচ্ছে হয়–এই যে আজ দেখছেন এ-বাড়িতে সকলের মুখে মুখে হুঁকো, এ কেবল এই অধমের জন্যেই, নইলে কবে উঠে যেতে এ-বাড়ি থেকে তামাক খাওয়ার পাট-আর তামাক খাওয়াই যদি উঠে যায় তো এ অধমের চাকরি কিসে থাকে বলুন তোএতদিন ধরে তামাক সেজে সেজে, এখন বুড়ো বয়সে তো আর ঘর ঝাঁট দেওয়া কাপড় কুঁচোনো কি মোসায়েবি করা পোষাবে না—
ভূতনাথ বললে—তা এতদিন ধরে তুমি এই কাজ করছে, এখন কি আর তা বলে তোমার জবাব হয়ে যাবে রাতারাতি
—তা হুজুর সবই সম্ভব, এই দেখুন না বাবুরা শুনছি মটর গাড়ি কিনবে, তা কিনলে ইব্রাহিম মিয়ার চাকরি কি আর থাকবে, আগে এই বাড়িতেই ছোটবেলায় দেখেছি পাঁচখানা পাল্কি, এখন যেখানে দাসু জমাদারের ঘর দেখছেন ওইখানে থাকতে পাল্কি-বেহারারা, কোথায় সব চলে গেল—এখন চুরুট সিগারেট যদি বাবুরা ধরে তা হলে গড়গড়া হুঁকো কে আর খাবে বলুন-–
