পাশে একটা মদের দোকান। উগ্র গন্ধ নাকে এল। ভেতরে বাইরে ভিড়। সামনে মাটির ওপর বসে পড়েছে ভাড় নিয়ে লোকগুলো। আবছা অন্ধকারেও যেন হঠাৎ চমকে উঠলো ভূতনাথ! ঠাকুর না!
ভালো করে চেয়ে দেখবার সাহস হলো না তার। এক ঘণ্টা আগে যার চাকরি গিয়েছে সে-ও বুঝি বসে গিয়েছে এখানে ভাঁড় নিয়ে। হন্ হন্ করে পা চালিয়ে সোজা চলতে লাগলো ভূতনাথ। ঠাকুর তাকে দেখতে না পেলেই ভালো। অপ্রকৃতিস্থ মানুষ ভূতনাথের যুক্তিগুলো বুঝবে না ঠিক।
আরো আধ ঘণ্টা পরে যখন ভূতনাথ ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে গিয়ে পেঁছিলো তখন সদর দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দরজা খুলে দিলে বৈজু দারোয়ান। বললে—আবার ফিরে এলেন যে কেরানীবাবু?
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে-বাবু কোথায়?
-ওপরে।
সোজা মন্ত্রচালিতের মতো ওপরে গিয়ে বড় হলঘরে কাউকে দেখতে পাওয়া গেল না। এদিক-ওদিক সব দিকে চেয়ে দেখলে ‘ভূতনাথ। অন্দরে যাবে কি না ভাবছে—হঠাৎ হাবার মা সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো—
হাবার মা বললে—বাবু এখন মাকে খাওয়াচ্ছেন।
—আর দিদিমণি?
—নিচে রান্নাঘরে।
সেই সিঁড়ি দিয়ে আবার তেমনি করে নিচে নেমে এসে সোজ। রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ালো ভূতনাথ। চারজন ঝি সাহায্য করছে। জবাকে। জবা রান্না করছে। এ দৃশ্য হয় তো এ-বাড়ির লোকের কাছে নতুন নয়—কিন্তু ভূতনাথের কাছে অভিনব মনে হলো। পেছন থেকে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ দেখতে লাগলো জবাকে। হঠাৎ সেই অবস্থায় ভূতনাথের মনে হলো জবাই তো এ-বাড়ির আসল গৃহিণী।
পেছন ফিরে কী একটা জিনিষ নিতে গিয়ে হঠাৎ নজরে পড়লো।
নজরে পড়তে জবাও অবাক হয়ে গিয়েছে। বললে—একি, আবার ফিরে এলেন যে আপনি–বাবা তো ওপরে।
ভূতনাথ প্রথমটা কেমন নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর বললে—তোমার সঙ্গেই আমার দরকার ছিল জবা—আজকে আমার সত্যি বড় অন্যায় হয়ে গিয়েছে—বাবাকে বলল তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করেন
আরো যেন কী কী বলবার ছিল ভূতনাথের, কিন্তু আর কিছু তার মুখ দিয়ে বেরোলে না।
জবা হেসে ফেললে। বললে—আশ্চর্য, এই কথা বলতেই আবার এখন ফিরে এলেন নাকি?
ভূতনাথ কী উত্তর দেবে ভেবে পেলে না!
জবা এবার হো হো করে হেসে উঠলো। বললে—যে আপনার নাম রেখেছিল, তার দূরদৃষ্টির প্রশংসা করছি—তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু কেন? কেন আপনি ক্ষমা চান বলুন তো?
ভূতনাথ একটু ইতস্তত করে বললে—আমার জন্যেই তো তোমায় আজ রান্নাঘরে ঢুকতে হয়েছে–আমার জন্যেই তো ঠাকুরকে।
জবা বললে—রান্না করতে আমি ভয় পাই না ভূতনাথবাবু, কারণ বাবা যার-তার হাতের রান্না খান না—ঠাকুর নেহাৎ দেশের লোক ছিল তাই…আর…কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কখ—আপনি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছেন তো?
ভূতনাথ বুঝতে পারলে না। বললে—কীসের ভয়?
—জাত যাওয়ার ভয়।
–কেন?
—এবার থেকে তো আমিই রান্না করবো—ভুলে যাচ্ছেন কেন? আমি তো ম্লেচ্ছো।
কথাটা ভাববার মতন। ভূতনাথও হঠাৎ কথাটার জবাব দিতে পারলে না।
জবা বললে—আজ বাসায় গিয়ে ভাবুন—সমস্ত রাত ধরে সেইটেই ভাবুন আগে—তারপর কাল যা বলবেন, সেই ব্যবস্থা করবে—এখন রাত হয়ে গেল–আপনি বাড়ি যান বরং—বলে উনুনে আর একটা হাঁড়ি চড়িয়ে দিলে।
ভূতনাথ নির্বোধের মতো আস্তে আস্তে বাইরে চলে আসছিল। অন্ধকারে রাস্তায় পা বাড়াতে গিয়ে পেছনে যেন জবার গলার আওয়াজ পেলে—
—শুনুন।
ভূতনাথ আবার ফিরলো।
জবা বললে–বৈজুকে সঙ্গে নিয়ে যান—রাত্তির হয়ে গিয়েছে—এদিককার রাস্তাটা খারাপ—আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসুক ও–
ভূতনাথ মুখ তুলে জবার চোখের দিকে চেয়ে দেখলে। কথাটার মধ্যে বিদ্রূপের খোঁচা আছে যেন!
কিন্তু অন্ধকারে জবার মুখ স্পষ্ট দেখা গেল না।
ভূতনাথ আর সময় নষ্ট না করে রাস্তায় পা বাড়ালো। কেন মিছিমিছি সে আবার ফিরে এল। কার কাছে সে ক্ষমা চাইলে! কে জানে, কী সমাজের মানুষ এরা সবাই। রাধা, আন্না, হরিদাসী তারা তো কেউ এমন আড়ষ্ট করে কথা বলতো না। শহরের সব মেয়েরাই কি এমনি? না শুধু ব্রাহ্মসমাজের মেয়েরাই এই রকম।
ভূতনাথ চলতে চলতে বললে—না, সঙ্গে কারোর যাবার দরকার হবে না—আমি মেয়েমানুষ নই।
০৭. বনমালী সরকার লেন
বনমালী সরকার লেন-এর বড়বাড়ির সামনে আসতেই ব্রিজ সিং দেখতে পেয়ে ডাকলে—এ শালাবাবু, এ শালাবাবু—এ–
ভূতনাথ প্রথমটায় অবাক হয়ে গেল। তাকে হঠাৎ ডাকে কেন? তারপর বললে—কী দারোয়ান?
–আরে আপনাকে ছুটুকবাবু ডাকিয়েছেন–
ভূতনাথ আরো অবাক হয়ে গেল। ছুটুকবাবু তাকে ডাকবেন কেন! ব্ৰজরাখাল কিছু জানে নাকি। ছুটুকবাবু তাকে চিনলেই বা কী করে! বড়বাড়িতে কে-ই বা তাকে চেনে। সবার অলক্ষ্যে আস্তে আস্তে রোজ বাড়িতে এসে ঢোকে সে——আবার সকালবেলা নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় চাকরি করতে। কারুর সঙ্গে পরিচয় বা আলাপ করবার সাহসও হয় না তার। বংশী অবশ্য আসে মাঝে মাঝে। নিজের সমস্যা নিয়ে সে বিব্রত। তার কাছেই এ-বাড়ির সকলের নাম শুনেছে সে। স্নান করতে গিয়ে ভিস্তিখানার মধ্যে অন্য চাকর-বাকরদের সঙ্গে কথাবার্তা কয়েছে একটু কিন্তু সে সামান্যই।
ওই ভিস্তিখানার পাশ দিয়ে যেতেই একদিন লোচন ধরেছিল। খোঁচা খোঁচা কদমফুলের মতো দাড়ি। গলায় দু’ সারি কণ্ঠী। একটা চোখ বোধ হয় ট্যারা। বুড়ো মানুষ বটে।
তখন আপিস যাবার তাড়া ছিল। কোনোরকমে একটুখানি জল নিয়ে স্নান সেরে হাঁটা দিতে হবে। কিন্তু ভিস্তিখানায় তখন জল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। জল তুলছে শ্যামসুন্দর। সকাল বেলায় এ-বাড়িতে বিশেষ তাড়াহুড়ো থাকে না। কর্তারা বেলা করে ওঠেন। তাই বেলাতেই কাজের চাপ।
