সুবিনয়বাবু হঠাৎ জুতোসুদ্ধ পা’টা মেঝের ওপর সজোরে ঠুকে বললেন—আঃ, কী বলেছে তাই বলে? বাজে কথা শুনতে চাই না
—আজ্ঞে ও বলেছিল ওদের সঙ্গে এমন করলে আমি এখানে টিকতে পারবো না-ওই পর্যন্ত আমাকে অপমান কিছু করেনি
সুবিনয়বাবু বললেন-তা হলে বলতে আর বাকি রেখেছে কি? তোমায় দু’ ঘা জুতো মারলে কি সন্তুষ্ট হতে ভূতনাথবাবু? বলে ঠাকুরের দিকে ফিরে বললেন—যা তুই, এ-বাড়ির চাকরি গেল তোর—এখানে তো টিকতে পারলিই নে, গায়েও টিকতে পারবি কি না পরে ভাববো–
যে-কথা সেই কাজ। আর মুহূর্ত মাত্র দেরি নয়। ঠাকুর নিজের কাপড়-গামছা গুছিয়ে পুটলি বেঁধে নিয়ে তৈরি হলো। ” তারপর চোরের মতন দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।
সেদিনকার সেই ঘটনায় ভূতনাথের মনটা যেন কেমন বিমর্ষ হয়ে গিয়েছিল। সুবিনয়বাবু বলেছিলেন—তোমরা ইয়ং বেঙ্গল বড় মিমিনে ভূতনাথবাবু, সেইজন্যেই সবাই তোমাদের অপমান করতে সাহস পায়-গুণ্ডার ভয়ে মেয়েদের পুরে রেখেছে পর্দার মধ্যে আর ওদিকে গোরার ভয়ে তেত্রিশ কোটি লোক দেশটাকে পরাধীন করে রেখেছে—তোমাদের গলায় দড়ি জোটে না—
ঠিক এমন কথা সুবিনয়বাবুর মুখ থেকে শোনবার আশা করেনি ভূতনাথ। আমতা আমতা করে বললে—আমি কিন্তু বুঝতে পারিনি—
সুবিনয়বাবু আরো উত্তেজিত হয়ে উঠলেন—তা হলে বলতে চাও-জবা মা মিথ্যে কথা বলেছে–
হঠাৎ জবার দিকে চোখ পড়তেই জবা বলে উঠলো—আমি যে নিজের কানে সব শুনেছি ভূতনাথবাবু, আপনি ঠিক বলুন তো ঠাকুর আপনাকে শাসিয়ে ছিল কি না?
ভূতনাথ বললে কিন্তু সে তো অন্য কারণে–
—কী কারণে, বলুন—জবা জবাবের জন্যে উদগ্রীব হয়ে রইলো।
ভূতনাথ কী উত্তর দেবে বুঝতে পারলে না। একটু ভেবে বললে—ঠাকুর বলছিল, আমি নাকি পেট ভরে খেতে পাই না বলে আপনার কাছে নালিশ করেছি।
সুবিনয়বাবু বললেন—আমার তো তাই বক্তব্য—তুমি এতদিন নালিশ করোনি কেন ভূতনাথবাবু?
জবা বাবার দিকে চেয়ে জবাব দিলে—ভূতনাথবাবু বোধ হয় ভেবেছিলেন আমি কম করে ভাড়ার বার করে দিই।
—তুমি তাই ভেবেছিলে নাকি, ভূতনাথবাবু?—সুবিনয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
ভূতনাথ কিছু জবাব দেবার আগেই জবা বললে আপনি যা ভেবেছিলেন বাবা, ভূতনাথবাবু তেমন লোক নন। দেখলেন তো, ব্ৰজরাখালবাবু বলেছিলেন—সরল পাড়াগাঁয়ের ছেলে—এখন বুঝুন—আচ্ছা, আপনাকে কম খেতে দিয়ে আমার কী স্বার্থ আছে বলুন–আপনার সঙ্গে আমার কীসের সম্পর্ক? আপনি চাকরি করবেন, মাইনে নেবেন, পেট ভরে খেয়ে যাবেন সেটা আপনার ন্যায্য পাওনা-অসুবিধে হয় নালিশ করবেন–
—ঠিক কথা, জবা ঠিক কথাই বলেছে—তুমি এতদিন নালিশ করোনি কেন ভূতনাথবাবু?
জবা তেমনি উত্তেজিত হয়ে বলে চললো—উনি ঠাকুরের কথাই ধ্রুব বলে জেনেছিলেন, আর আমাকেই চোর বলে ঠিক করেছিলেন–তাই রাগ করে আপনার কাছে ভাত খাবেন না বলেছিলেন— বাবা আপনি ভূতনাথবাবুকে জিজ্ঞেস করুন তো সত্যি করে উনি বলুন যা বলছি আমি সত্যি কি না?
–সত্যি তুমি তাই ভেবেছিলে নাকি ভূতনাবাবু?
জবা আবার বলতে লাগলো—কিন্তু ভাগ্যিস আমি নিজের কানে শুনতে পেলাম কথাটা। উত্তেজনার মুখে জবা যেন আরো কী কী সব বলে গেল, সব কথা ভূতনাথের কানে গেল না। ঘটনাচক্র এমনই দাঁড়ালো যেন ভূতনাথই আসল অপরাধী ভূতনাথই যেন সমস্ত ষড়যন্ত্রের মূলে। আসামী একমাত্র সে-ই। সুবিনয়বাবু আর তার মেয়ে দুজনে মিলে ভূতনাথের অপরাধেরই যেন বিচার করতে বসেছেন। ভূতনাথের চোখ কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো।
যখন আবার তার সম্বিৎ ফিরে এল তখন খেয়াল হলো সুবিনয়বাবু বলছেন—অন্যায় যারা করে তাদের যতখানি অপরাধ, সেই অন্যায় যারা ভীরুর মতো সহ্য করে তাদের অপরাধও কি কম সুরেন বাড়য্যে মশাই-এর কথাটা ভাবব তো একবার, একরকম বিনাদোষেই তাঁর সেদিন চাকরি গেল— ভাবো একবার গোরাদের অত্যাচারের কথা–পয়সা দিয়েও রেলের কামরায় সাহেবদের সঙ্গে একসঙ্গে যাবার অধিকার নেই—সত্যি কথা বললে হয় রাজদ্রোহ-বুটের লাথির চোটে চা-বাগানের কুলির পিলে ফেটে গেলেও প্রতিবাদ করলে হয় জেল—এমনি করে আর কতদিন অত্যাচার সহ্য করবে ভূতনাথবাবু? একদিকে গোঁড়া বামুনদের অত্যাচার, বিলেত গেলেই, মুরগী খেলেই জাতিচ্যুত। আর একদিকে সাহেবদের লাথি-ইয়ং বেঙ্গল তোমরা, তোমরাই তো ভরসা—আমরা আর ক’দিনের–
অভিভূতের মতে কখন যে ভূতনাথ রাস্তায় বেরিয়েছে, কখন বাড়ির পথে চলতে শুরু করেছে খেয়াল ছিল না। গোলদিঘীর কাছে আসতেই খোলা হাওয়ার স্পর্শ লেগে সমস্ত শিরা উপশিরাগুলো যেন আবার সজীব হয়ে উঠলো। ভূতনাথের মনে হলো যেন কিছুক্ষণ আগে তার আপাদমস্তক বেঁধে কেউ চাবুক মেরে ছেড়ে দিয়েছে। সমস্ত শরীরে যেন এখনও তার যন্ত্রণার সঙ্কেত। সুবিনয়বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে আসবার সময় সে তো কিছু বলে আসেনি। আত্মপক্ষ সমর্থনের কথা নয়। কিন্তু ওদের ভুল সংশোধনের চেষ্টাও তো ও করতে পারতো। কিম্বা ক্ষমা ভিক্ষা। জবাকে নীচ প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা তো তার ছিল না। ঠাকুরকেই সে তত অবিশ্বাস করে এসেছে। ঠাকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগই তো সে করতে গিয়েছিলো।
আবার ফিরলে ভূতনাথ। চারদিকে বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। তবু যত অন্ধকারই হোক, যত রাত্ৰিই হোক আজ, ‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে ফিরে গিয়ে আবার তাকে দুজনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে।
