—আপনি তত হিন্দু, আপনি কী করে আমার দাদা হবেন! যারা ব্রাহ্ম তারাই শুধু ওখানে যেতে পায়।
-কী শেখায় সুনীতি-ক্লাশে?
–নীতি শিক্ষা দেয়–সত্য কথা বলা, গুরুজনদের ভক্তি করা, পরমেশ্বরের উপাসনা করা আর ব্ৰহ্ম সঙ্গীত।
—তোমার গান আমার খুব ভালো লাগে, সেদিন শুনেছিলাম—
—আমি রাঁধতেও পারি—আমার জন্মদিনে আমি মুরগী বেঁধেছিলাম—সবাই…।
—তোমরা মুরগী খাও? ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল।
–রোজ রোজ খাই।
—কে রাঁধে?
—কেন ঠাকুর—ওই যে ঠাকুর আছে—ও—
-–ঠাকুর তত হিন্দু।
—তা হোক, রাঁধে—আপনি খান না? বাবা বলেন-মুরগ খেলে শরীর ভালো হয়—
ভূতনাথের কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করতে লাগলো। তা হোক—চাকরি করতে হলে এ-সব উৎপাত সহ্য করতে হবে। হঠাৎ ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, ভাঁড়ারের জিনিষ কে বের করে দেয় বোজ?
—আমি, কেন? ও তো লেখা আছে সব ‘র আমল থেকে—আমি সেই দেখে দেখে বের করে দিই—আগে মা-ই দিতে, তারপর আমার ভাই মারা যাওয়ার পর থেকেই মা’র শরীর খারাপ হয়ে গেল—আমিই তারপর থেকে…কিন্তু ও-কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?
ভূতনাথ উত্তর দেবে কি না ভাবছে এমন সময় সুবিনয়বাবু এসে পড়লেন। বললেন—তোমার মাকে খাইয়ে একেবারে ঘুম পাড়িয়ে এলাম মা,—তা যাক গে যে-কথা বলছিলাম ভূতনাথবাবু—সেই দীক্ষা নেবার পর—সুবিনয়বাবুর গল্প চলতে লাগলো। পুরোনো দিনের কাহিনী। ঝড়ের লগ্নে জন্ম। ঘরের মধ্যে বসে থাকতেন সুবিনয়বাবু। আর দলে দলে গ্রামের আশে পাশের বাড়ির মেয়েরা জানালা দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দেখতো। পৈতে ত্যাগ করেছে, ধর্ম ত্যাগ করেছে, এ কেমন অদ্ভুত জীব। কেউ কেউ মা’কে জিজ্ঞেস করতো-মাঠাকরুণ তোমার ছেলে কথা কয়? মুড়ি খেতে দেখে মেয়েরা অবাক হয়ে গিয়েছে–এই তো মুড়ি খাচ্ছে মাঠাকরুণ,
এ তো সবই আমাদেরই মতন।
ভাত খেতে বসে ভূতনাথের এই সব গল্পের কথাই মনে পড়ছিল। খাওয়ার পর উঠে হাত ধুয়ে চলে যাবার সময় ঠাকুর হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো-বাবু
–কী বলো–
ঠাকুরের চোখ দুটো যেন জ্বলছে। লাল টকটকে। ভয় পাবার মতন। গাঁজা খায় নাকি?
ঠাকুর ভূতনাথের আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বললেবাবুর কাছে আপনি আমার নামে নালিশ করেছেন?
—নালিশ! ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল।
—হ্যাঁ নালিশ! কিন্তু এ-ও বলে রাখছি, আমাদের সঙ্গে এমনি করলে এখানে আপনি তো টিকতে পারবেন না
—সে কি, কী বলছো ঠাকুর তুমি?
—হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, কত কেরানীবাবুকে দেখলাম, যদি ভালো চান তো বুঝে শুনে চলবেন—বলে হন্ হন্ করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ঘটনাটা এক মিনিটের বটে। প্রথমটা থতমত লাগিয়ে দেয়। কিন্তু একটু ভাবতেই ভূতনাথ শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালো। খুব সামান্য ঘটনা তো নয়। আর একদিনও দেরি করা চলবে না এর পর। কিন্তু কী-ই বা উপায় আছে! নিজের টেবিলে এসে আবার কাজে মন দিলে ভূতনাথ। কিন্তু চোখের সামনে কিছু যেন স্পষ্ট দেখা যায় না। ঝাঁ ঝাঁ করছে মাথা। চাকরির জন্যেই সমস্ত অপমান আজ সহ্য করতে হলো তাকে।
হঠাৎ বাইরে থেকে ঘরে ঢুকলেন সুবিনয়বাবু।
মুখ তুলতেই চোখোচোখি হয়ে গেল। যথারীতি কুশল প্রশ্ন করে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ভূতনাথ হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পেছন পেছন গিয়ে বললে—আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল স্যার
থমকে দাঁড়ালেন তিনি। এমন করে কখনও তো কথা বলে ভূতনাথবাবু! বললেন—খুব জরুরী কথা? কেমন যেন তোমাকে উদ্বিগ্ন দেখছি ভূতনাথবাবু?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি আর এখানে খাবো না কাল থেকে। আমার চাল নেওয়া যেন বন্ধ হয়—
কথাটা শুনে চুপ করে রইলেন সুবিনয়বাবু। একবার চেয়ে দেখলেন ভূতনাথের দিকে। কিন্তু দাড়ি গোঁফের প্রাচুর্যের মধ্যে মুখের কোনো ভাবান্তর প্রকাশ পেলো না। তারপর হঠাৎ ‘আচ্ছা তাই হবে’–বলে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন।
ভূতনাথ নিজের টেবিলে এসে আবার বসলো। কাজ করতে আর মন বসে না। এখানে খাওয়া তো বন্ধ, তারপর! তারপর ব্ৰজরাখাল ভরসা। ব্রজরাখালকে মুক্তি দিতে পারলে না ভূতনাথ। এবারও সেই ব্রজরাখালেরই ওপর নির্ভর করতে হবে।
কিম্বা যদি খাওয়ার কোনো বন্দোবস্ত না হয়, তাকে অন্য কোনো চাকরির চেষ্টা দেখতে হবে। ব্রজরাখাল ওদিকে চেষ্টা করতে থাকুক, ভূতনাথ নিজেও ঘুরে চেষ্টা করবে। তারপর যা হয় হোক।
কিন্তু বিকেলবেলা আপিস থেকে বেরোবার আগেই হঠাৎ ডাক এল।
ফলাহারী পাঠক এসে বললে—মালিক আপনাকে একবার ডাকছে,কেরানীবাবু—
ফলাহারী পাঠকের হাসি মুখ দেখে ভূতনাথের কেমন যেন অবাক লাগলো। জিজ্ঞেস করলে—কী ব্যাপার ফলাহারী।
ফলাহারী বললে—নিজের চোখে গিয়ে দেখুন বাবু–
দোতলায় নয়। একতলায় ওপরে ওঠবার রাস্তাতেই সুবিনয়বাবুর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। একেবারে রান্নাঘরের দিক থেকেই শব্দটা আসছে।
সামনে গিয়ে ভূতনাথ আরো অবাক। সুবিনয়বাবু একলা নন। জবাও পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
সুবিনয়বাবু সিংহ-গর্জনে বলছেন—রাখ রাখ হাত বেড়ি রাখ— এখনি ঘর থেকে বের হয়ে যা
ঠাকুর ঠক ঠক করে সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
সুবিনয়বাবু আবার চিৎকার করে উঠলেন—বেরিয়ে যা এখনি, এক মুহূর্তও আর তোকে স্থান দেওয়া চলবে না—বেরিয়ে যা, হাতা বেড়ি রাখ—
জবা পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে সব শুনছে—
হঠাৎ ভূতনাথকে দেখেই সুবিনয়বাবু বললেন—ঠাকুর তোমায় কী বলেছে ভূতনাথবাবু বলো তো? এসো এদিকে সামনে এসো–
ভূতনাথ কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেল। সুবিনয়বাবুর এ-মূর্তি কখনও সে দেখেনি আগে। বললে-তেমন কিছু বলেনি আমাকে ঠাকুর—আপনি…।
