—তাঁরই এক নাম ভূতনাথ! আর সুবিনয়বাবুর বাবার নামই তো রামহরি। রামহরি ভট্টাচার্য। তার বেলায়!
সেদিন সুবিনয়বাবুই গল্প করেছিলেন প্রথম যেদিন দীক্ষা নিলাম সে কী কাণ্ড ভূতনাথবাবু—শুনুন তবে—
জবা সুবিনয়বাবুর মাথার পাকা চুল তুলে দিচ্ছিলো। বললে— আমি সে গল্প দশবার শুনেছি বাবা।
–তুমি শুনেছো মা, কিন্তু ভূতনাথবাবু তো শোনেন নি—কী ভূতনাথবাবু, আপনি শুনেছেন নাকি। তারপর ভূতনাথের উত্তরের প্রতীক্ষা না করেই বললেন–আর শুনলেই বা—ভালো জিনিষ দশবার শোনাও ভালো বলে সুবিনয়বাবু গল্প শুরু করেন–
এই যে ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র ব্যবসা দেখছেন, এ আমার বাবার। বাবা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু, তান্ত্রিক, কালীভক্ত। ছোটবেলায় মনে পড়ে-বাড়ির বিগ্রহ কালীমূর্তির সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যান করছেন—‘ত্বমেকং জগৎকারণং বিশ্বরূপং’–।কালীমন্ত্র জপ করতে করতেই তিনি স্বপ্নে এই মন্ত্র পান। সেই মন্ত্রপূত সিঁদুরই ‘মোহিনী-সিঁদুর’ নামে চলে আসছে। তা বাবা ছিলেন বড় গরীব, ওই যজন-যাজন নিয়েই থাকতেন, কিন্তু বোধ হয় দারিদ্র্যের জন্যেই দয়াপরবশ হয়ে কালী ওই মন্ত্র দিয়েছিলেন যাতে সংসারে স্বাচ্ছল্য আসে—আমরা মানুষ হই—দু মুঠো খেতে পাই— মনে আছে খুব ছোটবেলায় বাবা শেখাতেন—বাবা তোমরা কোন্ জাতি? তারপর নিজেই বলতেন—বলো, আমরা ব্রাহ্মণ।
আবার প্রশ্ন—কোন্ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ? নিজেই উত্তর দিতেন বলল, দাক্ষিণাত্য বৈদিক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। তারপর প্রতিদিন পূর্বপুরুষের নাম মুখস্ত করাতেন।
—তোমার নাম কী?
—তোমার পিতার নাম কী?
—তোমার পিতামহের নাম কী?
পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধপ্রপিতামহ-সকলের নাম মুখস্ত করাতেন আমাদের। এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই তাঁকে, বুঝলেন ভূতনাথবাবু–। মনে আছে আমি ছোটবেলায় হুকে। কলকে নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসতুম। দিনের মধ্যে অন্তত দশ-বারোটা মাটির কলকে ভাঙতুম—তা বাবা দেখতাম সেই উঠোনের ধারে বসে বসে আমার জন্যে মাটির কলকে তৈরি করে শুকিয়ে পোড়াচ্ছেন। তখন এক পয়সায় আটটা কলকে সে-পয়সাও খরচ করবার মতো সামর্থ্য ছিল না তাঁর।
তারপর অবস্থা ফিরলো। “মোহিনী-সিঁদুরের কৃপায় চালা থেকে পাকা বাড়ি হলো—দোতলা দালান কোঠা হলো—মা’র গায়ে গয়না উঠলো। আর আমি এলাম কলকাতায় পড়তে। সেই পড়াই আমার কাল হলো, আমি চিরদিনের মতো বাবাকে হারালাম। গল্প বলতে বলে হঠাৎ থেমে যান সুবিনয়বাবু।
জবা বলে-থামলেন কেন—বলুন–
সুবিনয়বাবু তেমনি চোখ বুজে মাথা নাড়তে লাগলেন—না আর বলবো না—তোমাদের আমার গল্প শুনতে ভালো লাগে না।
—না, ভালো লাগে বাবা, ভালো লাগে, আপনি বলুন-জবা আদরে বাবার গায়ের ওপর ঢলে পড়লো।
—আপনার ভালো লাগছে, ভূতনাথবাবু—সুবিনয়বাবু এবার ভূতনাথের দিকে চোখ ফেরালেন।
ভূতনাথ বললে—আপনি আমাকে ‘আপনি’ ‘আজ্ঞে বলেন— আমি বড় লজ্জা পাই।
—তবে তাই হবে—আচ্ছা, তুমি মা একবার জানালা দিয়ে দেখে এসো তত তোমার মা ভাত খেয়েছেন কি না?
জবা চলে গেল।
সুবিনয়বাবু বলতে লাগলেন—যেবার সেই ডায়মণ্ডহারবারে ঝড় হয়—সেই সময় আমার জন্ম-সে এক ভীষণ ঝড়, বোধ হয় ১৮৩৩ সাল সেটা-কলকাতায় সেই প্রথম গুলাউঠো হলো—জন্মেছি ঝড়ের লগ্নে—সারাজীবনটা কেবল ঝড়ের মতনই বয়ে গেল, দীক্ষাও নিলাম আর পৈতেও ত্যাগ করলাম—বাবাকেও একটা চিঠি লিখে দিলাম সব জানিয়ে—বাবা খবর পেয়ে নিজেই দৌড়ে এলেন। এসে নিয়ে গিয়ে দেশে একটা ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রাখলেন একমাসের মধ্যে আর ঘরের বাইরে বেরোতে পারলাম না—আমি একেবারে বন্দী।
জবা এসে বললে–মা এখনও ভাত খায়নি—বলেছে আপনাকে খাইয়ে দিতে হবে।
-ও, তা হলে বাবা, আমি জবার মাকে ভাত খাইয়ে আসি, আবদার যখন ধরেছেন তখন কিছুতেই তো আর ছাড়বেন না।
ভূতনাথের বিস্মিত দৃষ্টির দিকে চেয়ে বললেন—জবার মা’র অসুখটা আবার বেড়েছে কি না কাল থেকে বেশ ভালো থাকেন মাঝে মাঝে—কিন্তু আবার…
সুবিনয়বাবু চলে গেলেন। যাবার সময় বললেন—তুমি বসো মা জবা, ভূতনাথবাবুর সঙ্গে গল্প করো—আমি তোমার মাকে ভাতটা খাইয়ে আসছি।
হঠাৎ ভূতনাথ কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠলো। তবু কথা বলতে চেষ্টা করলে–তোমার মা’র এ-রকম অসুখ কতদিনের?
জবা মাথা নিচু করে বসেছিল, কথাটা শুনেই মাথাটা বেঁকিয়ে চাইলে ভূতনাথের দিকে। বললে—আপনি আবার আমার সঙ্গে কথা কইছেন!
—কেন? ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল—কেন? এমন কোনো কড়ার ছিল নাকি যে জবার সঙ্গে কথা বলতে পারবে না সে।
–যদি আমি আবার হেসে ফেলি। সেদিন সুনীতি-ক্লাশে বাবা রিপোর্ট করে দিয়েছেন।
-সুনীতি-ক্লাশ? সে কোথায় আবার?
—সুনীতি-ক্লাশ জানেন না, যেখানে আমি বোজ রোববার সকালবেলা যাই। এ সপ্তাহে সবার রিপোর্ট ভালো, সুজাতাদি আর স্মৃতিদিরা দুজনেই এবারে very good পেয়েছেন, সরল, সুবল, ননীগোপাল…
–ননীগোপাল? কোন ননীগোপাল? কী রকম চেহারা বলল তো-ভূতনাথ উদগ্রীব হয়ে উঠলো। সেই গঞ্জের স্কুলের হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর ছেলে যদি হয়!
—চেনেন নাকি তাকে? ভারি দুষ্ট, আমাকে বাবা যা পয়সা দেন হাতে, জানতে পারলেই কেড়ে নেবে-খালি লজেঞ্জ খাবে। মিস পিগট যদি একবার জানতে পারেন—নাম কাটা যাবে ওর।
ভূতনাথ বললে—একদিন যাবদ তোমাদের সুনীতি-ক্লাশে দেখবে আমাদের ননীগোপাল কি না—
—আপনাকে যেতে দেবে কেন?
—তুমি বলবে আমি তোমার দাদা।
