ভূতনাথ বলে-ঘুমোন না তো—করেন কী?
–ছোটমা যে নেখাপড়ি জামে শালাবাবু, বই পড়ে-নয় তো গল্প করে চিন্তার সঙ্গে—নয় তো পুতুলের জামাকাপড় তৈরি করে দুজনে। ছোটমা’র পুতুলের সঙ্গে চিন্তার পুতুলের বিয়ে হয়। আমরা মুচি খাই—রসমুণ্ডি খাই—নয় তো পূজো হয় যশোদাদুলালের–
—সমস্ত রাত? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে।
—হ্যাঁ মাঝে মাঝে সমস্ত রাত।
তারপর যখন খবর পেছোবে যে, ছোটকর্তা ফিরেছে, তখন আলো নিভবে ছোটমা’র ঘরের। চিন্তা ঘরের দরজায় হুড়কো বন্ধ করে ছোটমা’র ঘরের মেঝের ওপর ছোটমা’র বিছানার পাশে শুয়ে পড়বে।
এ সমস্ত বহুদিন আগের ঘটনা। কিন্তু অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের বাঁকা তৃতীয়ার চাঁদের মতন সমস্ত এখনও আঁকা আছে ভূতনাথের মনে।
‘মোহিনী-সিঁদুরে’র আপিসে ঢুকে খাওয়ার কথাটা মনে পড়লেই কেমন যেন ঘৃণা হতে ভূতনাথের। বরাবর পেটুক মানুষ। ভালো জিনিষ খাওয়ার দিকে বরাবরের ঝোঁক তার। বড়বাড়িতে রাত্রের খাওয়া তেমন পছন্দ হয় না। ব্ৰজরাখাল নিরামিষাশী। তাছাড়া নিজের হাতে সে রান্না করে। বাজার করারই সময় হয় না তার। আর এই ষড় রিপুকে বশে আনতেই সে ব্যস্ত। কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য কোনোটাকেই সে প্রশ্রয় না দেবার পক্ষপাতী। সাধন পথে ওরা বড় অন্তরায়।
কিন্তু কালীঘাটের পাঁঠা এনে যখন পেছনের বাগানে বেঁধে রাখা হয়, পরের দিন মাংস খাবার জন্যে, তখন সারা দিন রাত কী চিৎকারটাই না করে। এক একদিন অন্দরের রান্না-বাড়ির আব্রু পেরিয়ে বাইরে ভেসে আসে গরম মশলা আর মাংসের গন্ধ। সারা বাড়িটা সে গন্ধে মাতাল হয়ে যায়।
ব্ৰজরাখালের নাকেও গন্ধ যায়। নাকে কোঁচার কাপড় চাপা দেয়। বলে—জালালে দেখছি।
ভূতনাথ বলে—গন্ধটা ভালো লাগছে না তোমার ব্রজরাখাল? পেঁয়াজ রসুন আর…।
ব্ৰজরাখাল বলে—রাখো তোমার পেঁয়াজ রসুন–শরীরের পক্ষেও কি এত সব মশলা পত্তর ভালো হে—কেবল তমো গুণ বাড়ায়, ও সব তামসিক খাওয়া।
কিন্তু ভূতনাথের পক্ষে লোভ সম্বরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্ৰজরাখাল বলে–বুঝি, তোমার রাতের খাওয়াটা সুবিধের হচ্ছে না—কিন্তু সুবিনয়বাবুর বাড়িতে দুপুরবেলাটা তো ভালোই খাও।
কিন্তু ব্রজরাখালকে তার অসুবিধের কথাটা যেন বলতে কেমন বাধে।
সেদিন সকালবেলা আপিস যাওয়ার মুখে হঠাৎ বংশী এসে ডাকলে—শালাবাবু।
সার্ট আর ধুতিটা তখন পরা হয়ে গিয়েছে। জুতোটা পায়ে গলিয়ে বেরোবার বন্দোবস্ত করছে সে। ব্ৰজরাখাল তখন রান্নাঘরে রান্নায় ব্যস্ত।
বাইরে থেকে বংশী আবার ডাকলে—শালাবাবু।
—কী রে বংশী?
বাইরে আসতেই বংশী হঠাৎ কাছে সরে এল। চারিদিকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে গলাটা নিচু করলে। বললে একটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে।
-কী কথা রে—ভূতনাথ উদগ্রীব হয়ে রইল।
বংশী ইতস্তত করে বললে—ছোটমা আপনাকে একবার ডেকেছেন।
-–ছোটমা? ছোটমা কে? বড়বাড়িতে ছোটমা একজনই মাত্র। তবু কি জানি কেন ভূতনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে ছোটমা কে রে!
–আজ্ঞে ছোটকর্তার বউঠাকরুণ, ছোটবউঠাকরুণ এ-বাড়ির—
কানে কথাটা স্পষ্টই শুনতে পেলে ভূতনাথ। কিন্তু যেন বিশ্বাস হলো না। বললে—আমাকে না মাস্টারবাবুকে?
–মাস্টারবাবুকে নয়, আপনাকে, আমি ঠিক শুনেছি।
এত লোক থাকতে তাকে যে কেন ছোটবউঠাকরুণ ডাকবে তা বুঝতে পারলে না ভূতনাথ। এত আবু চারিদিকে। এতদিন আছে এ-বাড়িতে কোনো দিন কোনো সূত্রে বাড়ির কোনো মেয়েবউকে দেখবার সৌভাগ্য হয়নি ভূতনাথের। চারদিকে ঝিলিমিলি, পর্দা, পাল্কি—সব চিকে ঢাকা। বাড়ির ভেতরেও বাইরের পুরুষদের যাওয়া নিষেধ। সে-বাড়ির বউ তাকে ডাকছে—সে কী রকম? ছোটমা’র নাম শুনেছে চাকর-বাকরদের কাছে। তাদের কথাবার্তা থেকে ছোটবউঠাকরুণ সম্বন্ধে একটা ধারণাও করে নিয়েছে। কিন্তু বাইরের অজ্ঞাত পুরুষকে ছোটবউঠাকরুণ ডেকে দেখা করতে চেয়েছেন—তাই বা কেমন বিচিত্র ব্যাপার! তাছাড়া এ তো আর সুবিনয়বাবুর বাড়ি নয়। তাঁরা হলেন ব্রাহ্ম। জবাময়ী ভূতনাথের সামনে বেরিয়েছে, কথা বলতেও তার আপত্তি নেই হয় তো কিন্তু তা বলে বড়বাড়ির ছোটবউ?
ভূতনাথ বললে—কী জন্যে, কিছু বলেছেন নাকি তোমার ছোটমা?
—তা কিছু বলেনি।
ভূতনাথ কী বলবে ভেবে পেলে না। ব্ৰজরাখালকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত যাবার আগে।
বংশী বললে—তা হলে আমি সন্ধ্যেবেলা আপনাকে ডেকে নিয়ে যাবো কী বলেন?
ভূতনাথ ‘আচ্ছা’ বলে আপিসে বেরিয়ে পড়লো।
যথাসময়ে ঠাকুর এসে সেদিনও ডাকলে—ভাত বেড়েছি বাবু।
০৬. সেদিন তেমন কিছু গোলমাল হলো না
সেদিন তেমন কিছু গোলমাল হলো না। কিছু তরকারিও দিলে পাতে। তবু গত কয়দিন ধরে যেমন ব্যবহার করছিল, তার চেয়ে যেন কিছুটা ভালো। ভূতনাথ নিজের মনে মনে লজ্জিত হলো। ঠাকুরের ওপর অন্যায় করে সে অবিচার করছিল এ ক’দিন। হয় তো তার কোনো হাত নেই। আসলে তার জবা দিদিমণিই হয় তো। ভাঁড়ার থেকে চাল-ডাল তরকারি দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। জবাময়ীর তাচ্ছিল্যের প্রমাণ ভূতনাথ তো আগেই পেয়েছে। যেদিন ব্ৰজরাখালের সঙ্গে সে প্রথম চাকরি হবার দিন এসেছিল। বাপ-মা–পিসীমা’র দেওয়া নামই সকলের থাকে। জবার নামও রেখেছিল সুবিনয়বাবুর কালীভক্ত হিন্দু বাবা। নিজের নামের জন্যে সকলকে পরের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। তা ছাড়া ‘ভূতনাথ’ নামটার মধ্যে কোথায় যে হাস্যকরতা আছে তা ভেবে পাওয়া যায় না। সকলেরই ঠাকুর-দেবতার নাম। সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের একজন দেবতা মহেশ্বর
