সুবিনয়বাবু যেমন ভালো লোক, তাকে এই নিয়ে বিব্রত করতে কেমন যেন লাগলো। ব্রজরাখালকে বললেও হয়। কিন্তু ব্ৰজরাখালই বা কী ভাববে। হয় তত এর পরে চাকরিটাই হাতছাড়া হবে শেষ পর্যন্ত। এত কষ্টের চাকরি।
বাড়িতে ফিরে এসে ব্ৰজরাখাল বলে—কী গো বড়কুটুম, কেমন চাকরি বাকরি চলছে—কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো?
না, কষ্ট আর কী! অন্য কিছু কষ্ট তো নেই তার। তবু মুখ ফুটে বলতে গিয়ে কেমন বাধে যেন। কিন্তু একদিন বলেই ফেললে। বললে—আজকে চালটা একটু বেশি নাও ব্রজরাখাল।
—কেন? পেট ভরে না বুঝি?
—ভরে।
–তবে?
ভূতনাথ বললে—আজ সকাল সকাল খেয়েছি ওবেলা, আর খিদেটাও পেয়েছে একটু বেশি।
সত্যি পিসীমার মতো কে আর সামনে বসিয়ে খাওয়াবে ভূতনাথকে। পেটের কাপড় সরিয়ে পিসীমা পেট দেখে তবে ছাড়ান দিতে। খা একটু দুধ দিয়ে। হরগয়লানী নতুন গরুর দুধ দিয়ে গিয়েছে, তার চাছি পড়েছে এতখানি—তাই দিচ্ছি আর নতুন আমসত্ত্ব। ও ভাত ক’টা ফেলিসনে আর, আজ খাজা কাঁঠালটা ভাঙছি, বোস একটু—কত সব আদর, কত ভালোবাসা।
সন্ধ্যেবেলা নিজের ঘরটাতে বসে ভূতনাথ সেই আগেকার কথাগুলো ভাবে। ব্ৰজরাখাল বড়বাড়ির ভেতরে বাড়ির ছেলেদের পড়াতে চলে গিয়েছে। ডান দিকে নিচু একতলা বাড়িটার বারান্দায় এখন কেউ নেই। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে ইব্রাহিম কোচোয়ান আর ইয়াসিন সহিস। ঘরের ভেতরে টিম টিম করে বাতি জ্বলছে। বোরখা পরা দু একটা মূর্তি কখনও সখনও ছাদের দিকে এসে পড়ে। আর দক্ষিণ দিক থেকে দাসু মেথরের ঢালের চাটির শব্দ ভেসে ভেসে আসে। উত্তরের সদর গেটের দু পাশে রেঢ়ির তেলের বাক্স বাতি দপ দপ করে জ্বলছে—যেন দিন হয়ে গিয়েছে ওখানটায়—ঠিক যেমন রাস্তায় আলো জ্বলে তেমনি। ব্রিজ সিং-এর ডিউটি নয় এখন। নাথু সিং বন্দুক উচিয়ে পুতুলের মতন কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে পাহারা দিচ্ছে।
ব্ৰজরাখালের বাঁয়া তবলা জোড়া নিয়ে এবার বসলো ভূতনাথ। আগেকার অনেক বোল আবার তার মনে আসতে শুরু করেছে। চর্চাটা রাখা ভালো তো। আর তাছাড়া সন্ধ্যেটা এই অচেনা দেশে কাটেই বা কী করে। প্রথমটা আস্তে আস্তে। তারপর একবার লয়-এর স্রোতে গা ঢেলে দিলে আর কোনো দিকে খেয়াল থাকে না। অন্ধকার ঘর। শুধু চাঁদনী রাত থাকলে—দক্ষিণের জানালাটা দিয়ে ঘরে আলো এসে পড়ে। আর ওধারের বাগানের টগর আর চাপা ফুলের গন্ধতে ঘর ভুর ভুর করে সারা রাত। আর তারপর ছুটুকবাবুর আসরে শুরু হয় আর একজোড়া বাঁয়া তবলার চটি। হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ঘাটগুলো বেঁধে নেয় তানপুরার সঙ্গে। এক দিকে তানপুরা ছাড়তে থাকে আর সঙ্গে সঙ্গে সাধা গলার শব্দ বেরিয়ে আসে। খেয়াল দিয়ে কোনো দিন আরম্ভ হয় আসর, কোনো দিন হয় না। কিন্তু জমে বেশি ঠুংরিতে নয় টপ্পায়। সেটা বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে শোনা যায়। নিধুবাবুর টপ্পা।
প্রেমে কী সুখ হোত–
আমি যারে ভালবাসি সে যদি ভালবাসিত।
কিংশুক শোভিত ঘ্রাণে,
কেতকী কণ্টক বিনে
ফুল হোত চন্দনে, ইক্ষুতে ফল ফলিত—
কোনো দিন আরো বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে শোন যায়—মেজকর্তার গাড়ির শব্দ। তখন সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। বনমালী সরকার লেন-এর দূর থেকে ইব্রাহিম গাড়ির ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে আসে, ঘোড়ার গতি মন্থর হয়ে যায়। ব্রিজ সিং ঘড় ঘড় শব্দ করে গেট খুলে দেয়। তারপর সেই গাড়ি এসে দাঁড়ায় খাজাঞ্চীখানা আর বৈঠকখানার মধ্যে লম্বা গাড়ি-বারান্দার তলায়। পাশের ঘর থেকে মেজকর্তার চাকর বেণী শব্দ পেয়ে ছুটে যায় নিচে। দরজা খুলে হাত ধরে নিয়ে যেতে হবে তাকে। এক একদিন পা দুটো খুব টলে। সেদিন বেণীর ঘাড়ে ভর দিয়ে চলেন। অন্দর মহলে আর যান না, বাইরে বসবার ঘরে ঢালা ফরাস তাকিয়া পাশবালিশ আছে, সেইখানেই শয্যা পাতেন। কচিৎ কদাচিৎ যদি কখনও ইচ্ছে হয়, সোজা চলে যান মেজগিন্নীর শোবার ঘরে। কিন্তু মেজগিন্নীর ঘুম বড় সাংঘাতিক। একবার ঘুমোলে কার সাধ্য জাগায় তাকে।
বংশী বলে—বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে মেজকর্তা দমাদম লাথি মারতে থাকেন—ঘরের ভেতরে মেজগিন্নীরও যত ঘুম, গিরিরও ঘুম তত।
শেষে বুঝি গিরির ঘুম ভাঙে। মস্ত বড় ঘোমটা টেনে দরজা খুলে দেয়। তারপর নিজের বিছানাটা গুটিয়ে নিয়ে বাইরে এসে বারান্দায় আবার পাতে।
কিন্তু ছোটকর্তা আসেন আরো অনেক রাতে। যখন রাত প্রায় শেষ হবার উপক্রম। তখন কেউ জেগে থাকে না। টেরও পায় না কেউ। ঘুমে ঢোলে ব্রিজ সিং। ছোটবাবুর সাদা ওয়েলার-জোড়া পায়ে ঠকঠক শব্দ করে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ঢং ঢং বাজে ছোটবাবুর ল্যাণ্ডোলেটের ঘণ্টা। ভেতরে জেগে বসে আছেন তিনি একলা। বেশি কথার লোক নন। গাড়ি এসে গাড়িবারান্দার নিচে দাঁড়ালে নিজেই নামেন। বংশী দরজা খুলে বাতিটা জ্বেলে দেয় ঘরের। এক এক করে গায়ের জামা, হাতের হীরের আংটি, পায়ের জুতো খুলে নেয়। তারপর নতুন কোঁচানো ধুতি এগিয়ে দিতে হবে—সেটা পরে শুয়ে পড়বেন।
এ-সব বংশীর কাছে শোনা। এমনি দিনের পর দিন। রাতের পর রাত।
কিন্তু যদি ভূতনাথের এই ঘরের ছাতের ওপর ওঠা যায়, দেখা যাবে অন্দর মহলের সব আলোগুলো এখন নেভানো। বউদের মহলের বারান্দায় শুধু ঝিলমিলির ফাঁক দিয়ে টিম টিম করে জ্বলছে একটা তেলের ঝাড়। কিন্তু সব চেয়ে উজ্জ্বল বাতিটা জ্বলছে ছোটমা’র ঘরে।
বংশী বলে—ছোটমা তো ঘুমোয় না–সমস্ত রাতই পেরায় ঘুমোয় না।
