হ্যাণ্ডবিল ছাড়া পাঁজিতে বিজ্ঞাপনের পাতায় বড় বড় হরফে লেখা থাকতে ‘মোহিনী-সিঁদুর’—‘মোহিনী-সিঁদুর’–
স্বদেশে বিদেশে, বাঙলায়, ইংরেজীতে, জার্মানী, চীন, জাপানী, তারপর হিন্দুস্থানী, গুজরাটী, গুরুমুখী, পুস্তু সর্ব ভাষায় সর্বত্র এই ‘মোহিনী-সিঁদুরে’র বিজ্ঞাপন।
যত বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো–তত বিক্রির অর্ডার। প্রশংসাপত্রও আসতো অসংখ্য। এক প্যাকেট ব্যবহার করে যারা অল্প ফল পেয়েছে, তারা আরো দু’ প্যাকেটের অর্ডার দিতো।
আরো দুটি পণ্য ছিল সুবিনয়বাবুর। মোহিনী আংটি আর ‘মোহিনী আয়না।
গুণাগুণ অল্পবিস্তর তিনটেরই এক। কিন্তু তিনটের মধ্যে নামডাক ‘মোহিনী-সিঁদুরে’রই বেশি। মোহিনী-সিঁদুরে’র চিঠি পত্র লিখতে লিখতেই হাত ব্যথা হয়ে যেত ভূতনাথের।
আপিস ঘরের পেছনে গুদাম ঘরে ফলাহারী পাঠকের আপিস বা কারখানা। ফলাহারী হেড আর তার দশজন য়্যাসিস্টেন্ট। তারাও হিন্দুস্থানী। আপিসের ছুটির পর যখন তারা বেরোয়, তখন মাথা থেকে পা পর্যন্ত লালে-লাল হয়ে গিয়েছে শরীর।
সিঁদুর ঢালাঢলি, কৌটোয় ভরা, লেবেল আঁটা আর তারপর প্যাকিং করার পর পোস্টাপিসে ডাকে পাঠানো সমস্ত ভার ফলাহারীর। কিন্তু তদারক করতে হবে ভূতনাথকে। কোন্ অর্ডারটি কখন এল, সেটা রেজিস্ট্রি করা, কত তারিখে ডেসপ্যাচ করা হলো— সেটি লিখে রাখা। এজেন্টদের চিঠি লেখা, ভি-পি’র ফরম পূরণ করা।
সুবিনয়বাবু এক একবার সকালের দিকে তদারক করতে আসতেন। বলতেন—কাজকর্ম কেমন হচ্ছে ভূতনাথবাবু—
কালো চাপকান গায়ে, পরনে পায়জামা, কোঁচানো চাদর বুকের ওপর ক্রসের মতন লটকানো। পায়ে কখনো চটি কখনও য্যালবার্ট। এটা সেটা দেখতেন। বলতেন—চমৎকার হচ্ছে ভূতনাথবাবু—বলে একটু পরেই চলে যেতেন। হাসি হাসি মুখ। সদাশিব মানুষ। টাকার ব্যাপারটা নিয়ে যেতে হত ওপরে। ওপরে সেই বড় ঘরটায় বসে থাকতেন তিনি। কখনও আপিসের কাগজপত্র নিয়ে। কখনও বই নিয়ে। হয় তো হেলান দিয়ে একটা কিছু পড়তেন। আশে পাশে সাধারণত কেউ থাকে না।
সই করবার আগে একবার জিজ্ঞেস করেন—এটা ভালো করে দেখে নিয়েছেন ভূতনাথবাবু-তারপর আবার বই-এর দিকে মনোযোগ দেন। বাঁধানো বই সব। আলমারিতে থাকে থাকে সাজানো। দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কামিনীকুমার’, ‘হংসরূপী-রাজপুত্র’, ‘বিজয়-বসন্ত’ প্রভৃতি আরো অনেক বই। সোমপ্রকাশ, ‘বিবিধার্থ-সংগ্রহ’, ‘রহস্য-সন্দৰ্ভ’, ‘ব্রাহ্মিক দিগের প্রতি উপদেশ, ‘ব্ৰহ্মসঙ্গীত ও সংকীর্তন।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয় না। একটু পরেই নিচে চলে আসতে হয়।
তারপর ঠাকুর রোজকার মতো ডাকতে আসে—বাবু ভাত বাড়া হয়েছে—খেতে আসুন।
সেই গরম ভাতের ওপর ডালের গর্ত, আর এক থাবা, তরকারি। প্রত্যহের আপিসের কাজের মধ্যে খাওয়াটা যেন এক শাস্তির মতন অসহ্য হয়ে উঠলো।
ফলাহারীদের অন্য ব্যবস্থা। দুপুর বেলা কারখানা ঘরের মধ্যেই পেতলের কাঁসি বেরোয় এক একটা করে। কাগজের ঠোঙা করে ছাতু বেঁধে আনে কাপড়ে, সেটা ঢালে, তার ওপর ঢালে জল। অতি সংক্ষিপ্ত সরল প্রণালী। খাওয়ার পর বাঁ হাতে জলের ঘটিটা উপুড় করে মুখের মধ্যে। কী খাটতে পারে সব! সিঁদুর ঘাঁটতে ঘাঁটতে লাল হয়ে যায় চোখ মুখ—তবু ক্লান্তি নেই। তারা মাইনে পায় পাঁচ টাকা করে। মাসে মাসে মনি-অর্ডার করে তিন টাকা দেশে পাঠায়।
ঠাকুর সেদিন যথারীতি ডাকতে এসেছে। রান্নাঘরের কোণে আসন পেতে বসিয়ে ভাত আর ডাল দিয়ে ঠাকুর বললে—আজ ওই দিয়েই খেতে হবে বাবু-তরকারি হবে না।
ভূতনাথ মাথা উচু করে বললে সে কি?
—সব ফুরিয়ে গিয়েছে, কম করে ভাড়ার থেকে আনাজ বেরুলে আমি কী করবো বাবু—ভাড়ার তো আমার হাতে নয়।
ভূতনাথ ভাবলে তাও তো বটে। বললে—ভাড়ারের ভার তবে কার ওপর?
“আজ্ঞে সে তো হাবার মা’র হাতে জবা দিদিমণি পাঠিয়ে দেয়। ভূতনাথ বললে—হাবার মাকে একবার ডাকো দিকি।
এল হাবার মা। আধ-ঘোমটা দিয়ে দাঁড়ালে দরজার একপাশে।
ঠাকুর বললে—ওই তো হাবার মা এসেছে—ওকে জিজ্ঞেস করুন।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—আমাদের খাবার জন্যে আনাজ তরকারি কিছু দেওয়া হয়নি—তোমাকে?
ঘোমটার ভেতর থেকে আবার মা কী বললে বোঝা গেল না।
ঠাকুর বুঝিয়ে বললে তাকে–আনাজ-তরকারি কিছু তোমাকে আজ দেওয়া হয়নি-কেরানীবাবু তোমাকে জিজ্ঞেস করছেন।
–আজ্ঞে হ্যাঁ, দেওয়া হয়েছিল। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে-আজ কম দেওয়া হয়েছিল কি?
—যেমন বরাদ্দ থাকে তেমনি দেওয়া হয়েছিল।–কতখানি বরাদ্দ থাকে?–আমি নেকাপড়া জানিনে, যা বরাদ্দ থাকে তাই নিয়ে আসি। হাবার মার কাছ থেকে কোনো প্রশ্নের সমাধান যে পাওয়া যাবে এমন মনে হলো না।
এবার ভূতনাথ ঠাকুরকে বললে–তুমি বলো কর্তাদের যে, বরাদ্দ যেন বাড়ানো হয়—যা দেওয়া হয়, তাতে পেট ভরে না কারো—সারাদিন খাটবো-খুটবো, না খেতে পেলে তোমরাই বা কাজ করতে পারবে কেন—তোমরাও তো উপোষ করবে।
ঠাকুর বললে—তা তো ঠিক বাবু—কিন্তু কর্তাদের ও-কথা বলতে পারবো না।
–কেন পারবে না,সবাই খেতে পেলে কি না-পেলে তা তো তোমাকেই দেখতে হবে?
ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করে ভূতনাথ জানতে পারলে—এ-বাড়ির নিয়ম প্রতিদিন সকাল বেলা জব দিদিমণি ভাড়ার খুলে তালিকা দেখে দেখে সারাদিনের জিনিষ একসঙ্গে বের করে দেয়। বাড়ির লোকজন ছাড়া চাকর-ঠাকুর-ঝি, কেরানীবাবু, গরু-ঘোড়-পাখী সকলের খাবার জিনিষ দিয়ে দেয়। চাকরদের তামাক পর্যন্ত। চাল ডাল তেল নুন তরি-তরকারি, কাঁচা আনাজ, ঘোড়ার দানা, গরুর খোল, ভূষি, চুনি সমস্ত। সমস্ত ওজন করে মেপে দেওয়া। কম পড়বার কথা নয়।
