–জল স্থল মরুত ব্যোম, পশু মনুষ্য দেবনোক
তুমি সবার সৃজনকার, হৃদাধর ত্রিভুবনেশ।
তুমি এক, তুমি পুরাণ, তুমি অনন্ত সুখ সোপান,
তুমি জ্ঞান, তুমি প্রাণ, তুমি মোক্ষধাম…
পাশের ব্রজরাখালের দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। হাতে তাল দিচ্ছে আর লম্বা লম্বা চুল ভর্তি মাথাটা মাতালের মতো দুলছে–আর চোখ দিয়ে অঝোরধারে জল গড়িয়ে পড়ছে। সুবিনয়বাবুরও সেই অবস্থা। কিন্তু আশ্চর্যজবার মা আপন মনে মাথা নিচু করে একমনে বুনে চলেছেন, সঙ্গীত তার কানে যাচ্ছে। কিনা কে জানে।
এক সময়ে গান থামলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
সুবিনয়বাবু নিস্তব্ধতা ভাঙলেন। বললেন—তাল কেটেছি নাকি ব্ৰজরাখালবাবু——? আপনি ভালো খোল বাজিয়ে—আর চৌতালটা আপনার ঠিক ধরতেও পারি না আমি-সুরের দিকে নজর দিতে গেলে আমার তালটা ওদিকে আবার গোলমাল হয়ে যায়। তারপর জবার দিকে চেয়ে বললেন—দেখলে তো মা, তুমি ভূতনাথ নাম শুনে হাসছিলে—যে ভূতনাথ সে-ই মহেশ, সে-ই ব্ৰহ্ম, সে-ই বিষ্ণু—সবই সেই এক ধ্রুব নিবিকার অনন্ত জ্ঞান-স্বরূপ পরমাত্মা—উপনিষদ বলেছে ‘একং রূপং বহুধা যঃ কবোতি’—যিনি এক রূপকে বহুপ্রকার করেন—
এবার মহিলাটি আবার মুখ তুললেন, বললেন—কেন তুমি বার বার জবাকে বকছো বলো তো-ও তো হাসেনি।
জবা বললে—না বাবা, আমি হেসেছিলাম।
সুবিনয়বাবু দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন—কেন হেসেছিলে মা, ভূতনাথবাবুকে দেখে, ঠিক বললো তো।
এবার ভূতনাথ কথা কইলে। বললে হাসলেনই বা উনি, আমি তো সে-জন্যে কিছু মনে করিনি–রাধাও হাসতো।
—রাধা কে? প্রশ্ন করলেন সুবিনয়বাবু।
–নন্দজ্যাঠার মেয়ে—ভূতনাথ জবাব দিলে।
ব্ৰজরাখাল বুঝিয়ে দিলে—আমার পরলোকগতা স্ত্রীর কথা বলছে বড়কুটুম।
—রাধা হাসতো, রাধার সই হরিদাসী হাসত, হরিদাসীর বর হাসতো, আন্না হাসতে, রাধার বিয়েতে বাসর ঘরে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল—তোমার মনে আছে ব্ৰজরাখাল? তা হাসুক গে—আমি কিছু মনে করি না—বলে ভূতনাথ নিজেই হাসলো।
কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। জবা হাসলো, সুবিনয়বাবু হা হা করে হাসলেন, ব্ৰজরাখালও হেসে উঠলো। জবার মা হাসলেন কিনা দেখা গেল না। তিনি নিজের মনেই বুনতে লাগলেন, মুখ নিচু করে।
সুবিনয়বাবু হাসতে হাসতে বললেন-জরাখালবাবু, আপনার বড়কুটুমটি বেশ লোক—ভূতনাথবাবুকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
অতদিনের কথা। এখন সব মনে নেই। কিন্তু সুবিনয়বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরবার পথে ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল—তুমি বলছিলে ওঁরা ব্রাহ্ম, কিন্তু বেশ লোক ওঁরানা ব্ৰজরাখাল?
আমি তো ওঁকে খারাপ লোক বলিনি বড়কুটুম—লোক খুব ভালল, বেশ আমুদে মানুষ, ওঁদের সমাজের একনিষ্ঠ সভ্যও বটেন টাকাও আছে অনেক, কিন্তু মনে ওঁর শান্তি নেই।
—কেন?
–মাঝে মাঝে ওঁর ওই স্ত্রীর মাথা খারাপ হয়ে যায়, তখন ওঁকে ঘরে বন্ধ করে রাখতে হয়—যখন ভালো থাকেন তখন কেবল আপন মনে একটা কিছু নিয়ে বুনে যান—তা ওসব নিয়ে তোমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই তুমি তোমার চাকরিটা মন দিয়ে করে যাবে।
রাস্তায় আসতে আসতে ভূতনাথ কেবল সেই কথাটাই ভাবছিল—অমন প্রাণখুলে হা হা করে হাসতে পারেন কী করে সুবিনয়বাবু!
০৫. মোহিনী-সিঁদুর
‘মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসে চাকরি হয়ে গেল ভূতনাথের।
বার-বাড়িতে রাত্রে শোয়া আর সকাল বেলা স্নান করে একটু জলখাবার খেয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে আপিসে পৌঁছনো। তা হেঁটে যেতে ঘণ্টাখানেকের রাস্তা। সকাল থেকেই কাজ শুরু। দুপুর বারোটার সময় ডাকতে আসে ঠাকুর—বাবু ভাত বেড়েছি—
তাড়াতাড়ি হাতের কাজটা রেখে হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে খেতে বসা। একতলায় বাড়ির পেছন দিকের সমস্ত ঘরটাই রান্নাঘর। তারই এক কোণে এক একদিন আসন পেতে জলের গ্লাশ দেয় ঠাকুর। কলাপাতার ওপর গরম গরম ভাত ফেলে দেয়, হাতায় করে। বলে—মধ্যিখানটায় একটু গর্ত করুন তো-ডাল দিই—
এক রাশ গরম ভাতের ওপর গরম ডাল পড়ে। তারপর আলুকুমড়োর একটা তরকারি দেয় এক থাবা। কোনো দিন শাকচচ্চড়ি গাদাখানেক।
ছোট বেলায় ফতেপুরে মাছ না হলে খেতে পারতো না ভূতনাথ। তা পরের বাড়ি। এমনিতেই খেতে লজ্জা করে। তার ওপর আবার চাওয়া।
আরো ভাত দিলে যেন ভালো হতো। কিন্তু ঠাকুর যেমন তাড়া দেয়, তাতে কেমন লজ্জা হয়। একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ভূতনাথ-মাছ নেই ঠাকর?
ঠাকুর বলেছিল—গোণাগুন্তি মাছ—সে তো সব ওপরে চলে গিয়েছে—তারপর তাড়া দিয়ে বলে—একটু হাত চালান বাবু, হাবুর মা এখুনি এসে আবার এটো পাড়বে।
সুতরাং কোনো রকমে খাওয়া সেরে নিয়ে আবার কাজে বসতে হয়। কাজ না কাজ। হাজার হাজার প্যাকেট ভর্তি সিঁদুর। সেই কাগজের কৌটোয় সিঁদুর ভরা-তারপর মুখ বন্ধ করে ছাপানো লেবেল লাগিয়ে দেওয়া। এক একটি কৌটোর দাম—আড়াই টাকা। এক মাসের ব্যবহারের জন্য আড়াই টাকা। কত দূর দূর দেশে যায়। কোথায় রাজসাহী, চট্টগ্রাম, সিহাচলম, পেনাঙ, আন্নামালাই, জাভা, বোর্নিও–
ফলাহারী পাঠক সিঁদুর ভরে, প্যাকেট আঁটে, লেবেল লাগায়–
আর চিঠিপত্র লেখে ভূতনাথ। মনি-অর্ডার এলে সুবিনয়বাবুর কাছে পাঠিয়ে দেয়। ভি-পি. করে পার্সেল যায়। যত এজেন্ট আছে, তাদের কাছে পাঠাতে হয় হ্যাণ্ডবিল। নানান ভাষায় লেখা হ্যাবিল। হ্যাণ্ডবিল-এ লেখা থাকত–
‘অদ্ভুত ত্বড়িৎশক্তি সম্পন্ন সিঁদুর। মোহিনী-সিঁদুরে’র গুণে মুগ্ধ হইয়া হাজার হাজার নরনারী অসংখ্য প্রশংসাপত্র পাঠাঁইয়াছেন। কোনো মানুষের জীবনে হতাশ হইয়া আত্মহত্যা করিবার মতো অবস্থা আসিলে ইহার এক প্যাকেট পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারেন। যাঁহারা জীবনে প্রিয়পাত্র কিম্বা প্রিয়পাত্রীর প্রেম পাইতে চান; প্রিয়জনকে আপনার বশীভূত করিতে চান, প্রণয়িনীকে যদি আপনার করতলগত করিতে চান, কিম্বা যে স্ত্রীলোক আপনাকে ঘৃণা করে, অবজ্ঞা করে বা দূরে পরিহার করে তাহাকে যদি হৃদয়েশ্বরীরূপে লাভ করিতে চান, আমাদের এই বহু পরীক্ষিত বহু প্রশংসিত ‘মোহিনী-সিঁদুর’ পরীক্ষা করিয়া দেখুন। স্বামী-স্ত্রী, প্রভু-ভৃত্য, পিতা-পুত্র, শিক্ষক-ছাত্র, গুরু-শিষ্য সকলের পক্ষেই অপরিহার্য। নিত্য হাজার হাজার গ্রাহক ইহার কল্যাণে বিষময় সংসারে অপার শান্তিলাভ করিতেছেন। ইহা ছাড়া মকদ্দমায় জয়লাভ, দূরারোগ্য ব্যাধির উপশম, নিরুদ্দিষ্ট প্রিয়জনের সাক্ষাৎলাভ ইত্যাদি নানা বিষয়ে ইহার দ্বারা কার্যসিদ্ধি হয়। এক স্ত্রী এই মোহিনী-সিঁদুর’ ব্যবহার করিয়া তাহার পানাসক্ত স্বামীকে পুনরায় সংসারাশ্রমে ফিরাইয়া আনিয়াছে, আর একজন দারিদ্র্য লাঞ্ছিত হতভাগ্য লটারীতে বিশ সহস্র অর্থ পাইয়া সুখে কালযাপন করিতেছে, আর একজন…বিফলে মূল্য ফেরৎ…সংসারে শান্তি ফিরাইতে, হতভাগ্যদের সৌভাগ্য সঞ্চারে, অপুত্রককে পুত্ৰ মুখ দেখাইতে, ঋণীকে অঋণী করিতে, প্রবাসীকে ঘরে ফিরাইতে, ইহা অদ্বিতীয়.. ইত্যাদি ইত্যাদি–
