বউবাজার স্ত্রীট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাধববাবুর বাজার পেরিয়ে সোজা উত্তরে চলতে লাগলো দুজনে।
এক ঘণ্টা সময় লাগলো পৌঁছতে।
বাড়ির সামনে বড় সাইনবোর্ডের ওপর লেখা-মোহিনী-সিন্দুর কার্যালয়।
দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ছোটখাটো আপিসের মতন। চেয়ার-টেবিল সাজানো। কাগজ-পত্র গোছানো রয়েছে। পরিপাটি পরিচ্ছন্ন।
কে একজন এগিয়ে এল সামনে। এসে বললে—বাবু আপনাদের বসতে বলেছেন, আপনারা কি বনমালী সরকার লেন থেকে আসছেন—
খানিক পরে আবার ফিরে এল লোকটা। এসে ব্রজরাখালকে বললে—আপনাকে ওপরে ডাকছেন।
ভূতনাথকে বসতে বলে ব্রজরাখাল ওপরে চলে গেল। ঘরটার চারধারে চেয়ে দেখলো ভূতনাথ। আপিস ঘর। দেয়ালের গায়ে অনেকগুলো ফটো টানানো। ভূতনাথ কাউকে চেনে না। অনেকগুলো সাহেব মেমদের ছবি। সোনালি ফ্রেমে বাঁধা। সদর দরজার মাথার ওপর দেয়ালের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে— “ব্ৰহ্মকৃপাহি কেবলম।
সমস্ত বাড়িটা নিস্তব্ধ। ভূতনাথ চুপচাপ অনেকক্ষণ বসে রইলো। খানিক পরে কোথা থেকে যেন গানের শব্দ কানে এল।
ধন্য ধন্য তুমি বরেণ্য নমি হে জগত বন্দন
প্রণতজনে কৃপাবিধানে ঘুচাও কলুষ বন্ধন।
সত্যসার নির্বিকার সৃজন পালন কারণ
জীবনে মরণে শ্মশানে ভবনে জীবনের অবলম্বন
পূর্ণ পরম অনাদি চরম, অনন্ত জ্ঞান নয়ন
ওতপ্রোত তোমাতে চিত জগত-চিত্তরঞ্জন।
অযাচিত দয়ার সিন্ধু, দুঃখ দারিদ্র ভঞ্জন,
পবিত্র পাপনাশন পতিতজন পাবন।।
গান গাইছে একজন মহিলা। ভূতনাথ অভিভূতের মতন সমস্ত গানটা শুনলে। তারপর আবার সব নিস্তব্ধ। একা একা বসে থাকতে ভূতনাথের কেমন অসহ্য লাগছিল।
খানিক পরে আবার সেই লোকটা ঘরে এসে বললেআপনাকে ওপরে ডাকছেন বাবু।
ভূতনাথ লোকটার পেছন পেছন গিয়ে হাজির হলে ভেতরের বারান্দায়। সেখানে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠবার রাস্তা। ওপরে উঠে লোকটা পাশের একটা ঘরের দরজা খুলে বললে—ভেতরে যান।
দরজা খুলতেই ভূতনাথ দেখলে। প্রকাণ্ড এক ঘর। মাঝখানে এক গোল টেবিলের চারপাশে নিচু নিচু চেয়ারে বসে আছেন সবাই। আর সব মুখ অচেনা। কেবল ব্রজরাখালের দেখা পেলে। একপাশে।
ভূতনাথকে নিজের পাশের চেয়ারে বসিয়ে ব্রজরাখাল বললে— এই হলো আমার বড়কুটুম, এখন আপনার হাতেই এর ভার দিলাম। নেহাৎ গ্রাম্য সরল ছেলে—এখনও শহরের হাওয়া গায়ে লাগেনি।
সামনের ভদ্রলোক একমুখ দাড়ি গোঁফ নিয়ে হাসতে লাগলেন। হা হা করে হাসি। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন—বেশ নামটি। ভূতনাথ-ভূতনাথ। কয়েকবার নামটা উচ্চারণ করলেন মুখে। তারপর বললেন—শিবের আর-এক নাম ভূতনাথ। উপনিষদে পড়েছি ‘ন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যঃ–ওই শিবেরও বিত্ত নেই— বিভব নেই—ভোলানাথ।
ভূতনাথ বললেবামুনগাছির পঞ্চানন্দের দোর ধরে হয়েছি কি না, তাই পিসীমা আমার নাম রেখেছিল ভূতনাথ….
খুক খুক করে পাশ থেকে হাসির শব্দ এল।
ভদ্রলোক বললেন—ছি মা, হাসতে নেই, এ-হাসি তোমার চাপল্যের লক্ষণ মা–ভূতনাথবাবু ঠিকই বলেছেন—সেই ব্রহ্মেরই কত নাম—পঞ্চানন্দও এক নাম তার—আপনি কী বলেন ব্ৰজরাখালবাবু
ভূতনাথ ব্ৰজরাখালের উত্তরের দিকে কান না দিয়ে দেখলে যে হাসছে সে একটি মেয়ে। অনেকটা রাধার বয়সী। কিম্বা হয় তত রাধার চেয়েও কিছু বড়। কিন্তু বড় সুন্দর দেখতে। তখনও হাসিটা মুখে লেগে রয়েছে তার। ভূতনাথের চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি আবার হাসিতে ফেটে পড়তে যাচ্ছিলো—কিন্তু কেন জানি না বোধহয় বাবার মুখ চেয়েই চেপে গেল। মেয়েটির পাশে আরেকজন মহিলা বসে আছেন। বোধ হয় মেয়েটির মা। দুই হাতে কী একটা বুনছেন। সেই দিকেই নজর তার। মাঝে মাঝে এক-একবার সুবিনয়বাবুর দিকে তাকাচ্ছেন।
-আমার বাবা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু বুঝলেন ব্রজরাখালবাবু–
সুবিনয়বাবু দাড়িতে হাত বুলোত বুলোতে গল্প করতে লাগলেন।—ভারি গোঁড়া হিন্দু—কালীভক্ত—প্রতি শনিবার মধ্যরাত্রি পর্যন্ত কালীপূজো করে রোববার দিন জল গ্রহণ করতেন—আমার এই খুকু যখন হলে উনি নাম রাখলেন জবাময়ী কালীর যেমন জবা—শিবের তেমনি ধুতুরা—তুমি হাসছিলে মা, কিন্তু ভূতনাথবাবুর নামটা আমার ভারি পছন্দ হয়েছে-সেই গানটা গাও তো মা–
এতক্ষণে মহিলাটি হাতের বোনা বন্ধ করে চোখ তুললেন একটু।
–আর তুমি গাইতে বলল না ওকে–এখনি যদি গলা ভাঙিয়ে বসে থাকে, আসছে শনিবার দিন গাইতেই পারবে না যে একেবারে।
ব্রজরাখাল জিজ্ঞেস করলে—আসছে শনিবার গান-বাজনা আছে নাকি?
সুবিনয়বাবু বললেন—আসছে শনিবার আমার জবার জন্মদিন কিনা—তা হলোই বা জন্মদিন—জবার গলায় এ-গানটা আমার ভারি মিষ্টি লাগে ব্ৰজরাখালবাবু-খাটি জয়জয়ন্তীর ধ্রুপদগাও—গাও না মা-বলে সুবিনয়বাবু নিজেই হাতে তাল দিতে দিতে ধরলেন—
–নাথ, তুমি ব্ৰহ্ম, তুমি বিষ্ণু, তুমি ঈশ, তুমি মহেশ, গান থামিয়ে ব্রজরাখালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন—চৌতালে তাল দিয়ে যান তো-বলে আবার আরম্ভ করলেন
—নাথ, তুমি ব্ৰহ্ম, তুমি বিষ্ণু, তুমি ঈশ, তুমি মহেশ,
তুমি আদি, তুমি অন্ত, তুমি অনাদি, তুমি অশেষ—
হঠাৎ এক সময় ভূতনাথের মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত কোকিল যেন এক সঙ্গে গান গেয়ে উঠলো। আকাশ বাতাস অন্তরীক্ষের সমস্ত অশ্রুত সুর এক সঙ্গে ধ্বনিত হয়ে উঠলো। মধুকামারের পাল-যাত্রায় শ্রীকণ্ঠ হাজরাও বুঝি খেদের গান এমন করে গাইতে পারে না। অবাক হয়ে ভূতনাথ দেখলে, বাবার সঙ্গে জবাও গলা মিলিয়ে গাইছে—মুখে তার সে বিদ্রূপের হাসি আর নেই, চোখ অর্ধমুদ্রিত—স্থির মূর্তিতে এক অলোকসামান্য জ্যোতি বেরুচ্ছে। সেই মুহূর্তে জবাকে যেন আরো সুন্দর দেখাতে লাগলো।
