ঠাকুর এমনি কথায় কথায় কেবল গল্প বলতেন। গল্প শুনে চুপ করে রইলাম। তখনও যেন বিশ্বাস হলো না। ঠাকুর বুঝলেন। বুঝে হাসলেন এবার। বললেন–ওই গিরীশকে জিজ্ঞেস করে দেখ—ওকে বলেছিলাম যখন প্রথম ও এসেছিল—শুধু দিনের মধ্যে দু’বার নাম-জপ করতে, একবার খাবার আগে, আর একবার শোবার আগে। ও শেষ পর্যন্ত পেরেছে। তুই-ই বা পারবি না কেন। তার বেশি তোকে কিছু করতে হবে না। মা তোর কাছে আর কিছু চায় না রে বোকা ছেলে। তারপর হাসি থামিয়ে নৱেনের দিকে চেয়ে বললেন–ওরে দেখ, ব্ৰজরাখালের বিশ্বাস হচ্ছে না। ওরে এ-সংসারে যত মত তত পথ যে,—কোনও মতটাই নিখুত নয়। তা ভেবে তোর কী দরকার। তুই যা করছিস করে যা-সংসারের সমস্ত জীবের মধ্যেই শিবকে পাবি। আর যদি না-ই পাস তাতেই বা কী। মা তো তোর মনের কথা জানে রে। এই দেখ না, সবাই ভাবে তার হাতঘড়িটাই ঠিক সময় দেয় কিন্তু কোনও ঘড়ির সঙ্গে কোনও ঘড়ির তো মিল নেই—অথচ আসলে সঠিক সময়টা যে কী তা কেউ জানে না—তা নাই বা জানলো, তাতে কারো কোনও কাজের ক্ষতি হচ্ছে?
গল্প করতে করতে কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে কারোর খেয়াল ছিল না। ভূতনাথ একমনে ব্রজরাখালের কথা শুনছিল। হঠাৎ চমক ভেঙে ব্ৰজরাখাল বললে—যা হোক—রাধার কাছে সেই কথা দিয়েছিলুম তার ভূতোদাদাকে কলকাতা দেখাবে। তা
এন্তোদিন মনে ছিল না, তোমার চিঠি পেয়ে মনে পড়লো।
রাত্রে ভূতনাথ বললো-ও বাঁয়া তবলা কার ব্রজরাখাল।
ব্ৰজরাখাল বিছানা পাততে পাততে বললেও আমারই, এককালে আমিই বাজাতাম—-তারপর এখন বাজাই খোল, দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সামনে খোল বাজিয়ে আর তবলা ভালো লাগে না।
শোবার আগে ব্রজরাখাল বললে–ঠাকুরকেই দেখলে না বড়কুটুম, কলকাতার আর কী দেখলে তবে…তা হলে পরশুদিন যাওয়া মনে রেখো, আবার ভুলে যেও না যেন—আমার ছুটি আছে সেদিন।
—কোথায়? ভূতনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে।
—এরই মধ্যে ভুলে বসে আছো, তোমার চাকরি হে—মাইনে এখন পাবে সাত টাকা করে, আর এক বেলা ওখানেই খাবে। বেশ নিষ্ঠাবান ধার্মিক লোক সুবিনয়বাবু। নববিধান সভার ব্রাহ্ম ওঁরা—
—সে কী ব্ৰজরাখাল।
—সে তুমি বুঝবে না এখন—ব্রজরাখাল পাশের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে।
পাশের ঘরে শুয়ে অনেকক্ষণ ভূতনাথের ঘুম এল না। সেই কালকের মতো ঘোড়ার পা ঠোকার শব্দ, অনেক চাকরের গোলমাল। তারপর রাত্রি বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে সেই তন্দ্রার মধ্যে কালোয়াতি গানের সঙ্গে তবলার ঠেকা। অনেক রাত্রে লোহার গেট খোলার ঘড় ঘড় শব্দ। আর তারপর…তারপরের কথা আর ভূতনাথের মনে থাকবার কথা নয়।
শেষ পর্যন্ত চাকরি হলো ভূতনাথের। সাত টাকা মাইনে আর এক বেলা খাওয়া। তা সাত টাকাই কি কম।
ব্ৰজরাখাল বললে—সাত টাকাই কি কম। আমি তো এল.এ. পাশ করে দশ টাকায় ঢুকেছিলাম। তুমি লেখাপড়া-জান ছেলে, বিদ্যে রয়েছে পেটে—দেখবে, ও সাত টাকাই শেষে সতেরো টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে দেরি হবে না। তুমি কিছু দ্বিধা করে না তা বলে।
দ্বিধা নাকি ভূতনাথের আছে! দ্বিধা কিসের। ব্রজরাখালের বিনাভাড়ার ঘরে থাকা আর একবেলা খাওয়া আবার সাত টাকা নগদ মাস গেলে। জলখাবার, জামাকাপড় নিয়ে মাসে তিন টাকাই খরচ হোক—তারপর চার টাকা করে জমা! কত বাবুয়ানি করবে করো না!
ব্ৰজরাখালের কেনা নতুন জামা-কাপড় জুতো পরে রওনা দিলে ভূতনাথ ব্ৰজরাখালের সঙ্গে। রাস্তায় বেরিয়ে ব্রজরাখাল বললেখুব মন দিয়ে কাজ করবে বড়কুটুম—দেখো আমার বদনাম না হয়। ওরা আবার ব্রাহ্ম কিনা।
–ব্রাহ্ম মানে? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে।
—এই তোমরা যেমন হিন্দু, উনি তেমনি ব্রাহ্ম—অর্থাৎ এই দুর্গা কালী গণেশ ও-সব পূজো টুজো করেন না-বলেন পুতুল পূজো, তা সে-সব নিয়ে তোমার কী দরকার—তুমি চাকরি করবে মন দিয়ে-ফাঁকি দেবে না, ব্যস চুকে গেল ল্যাঠা।
ভূতনাথ বললে—আমাকে আমার হিন্দুধর্ম ছাড়তে যদি বলেন–
–তা তো বলবেনই—ব্রজরাখাল বললে।
—তা হলে?
—তুমি ছাড়বে না।
—তাতে যদি চাকরি যায়?
–যাবে, যাবে। তা বলে তো আর রাতারাতি ধর্ম বদলাতে পারে না। ধর্ম হলে তোমার মনের বিশ্বাসের ব্যাপার–আর যদি মনে করো সাত টাকাই তোমার কাছে বড় তা হলে হবে ব্রাহ্ম, ব্রাহ্মসমাজে গিয়ে নেবে দীক্ষা।
ভূতনাথ উত্তর দিলে না। চুপ করে ভাবতে ভাবতে চললো। খানিক পরে বললে—এ-চাকরিতে তোমার মত আছে তো ব্রজরাখাল—তোমার মত না থাকলে দরকার নেই চাকরির। শেষে হয় তো গরু-শোর খেতে বলবে।
ব্ৰজরাখাল বললে—না না ওসব ভয় তোমার নেই। সুবিনয়বাবু লোক খুব ভালো, আমার চেয়েও ভালো, তবে একটু গোঁড়া। তাতেই বা তোমার কী! ওর ধারণা কেশববাবু যা বলেন তাই-ই ঠিক তাই-ই ধ্রুব আর কারোর কথা কিছু নয়। না হয় তাই-ই বললেন, তাতে তোমারই বা কী আর আমারই বা কী।
ভূতনাথ ব্ৰজরাখালের কথা কিছু বুঝতে পারলে না।
ব্ৰজরাখাল বলেই চললো—অথচ দেখো বড়কুটুম, আমার ঠাকুর বলতেন—ও হিন্দুধর্মই বলো আর খৃস্টধর্ম কিম্বা ইসলামধর্মই বলো, সব চর্চা করে দেখেছি—দেখলাম আসলে সেই ভগবানকেই সবাই ডাকে—শুধু বিভিন্ন নামে। একটা পুকুরের যেমন অনেকগুলো ঘাট থাকে তার এক ঘাটে হিন্দুরা ঘড়ায় করে ‘জল’ তোলে। আরেক ঘাটে মুসলমানেরা মশকে করে পানি তোলে, আর একটা ঘাটে খৃস্টানরা তোলে ‘ওয়াটার’—আসলে সেই জলই তো সবাই-এর লক্ষ্য—শুধু নামটা নিয়ে মারামারি।
