-আমি এখুনি যাচ্ছি ছোটমা।
—আর শোন?
বংশী থমকে দাঁড়ালে আবার।
-–মিয়াজানকে গাড়ি জুততে বল—আমি বেরোববা?
–তুমি বেরোবে ছোটমা?
–হ্যাঁ, বেরোবো, বসে-বসে সব মাইনে খাচ্ছে, কোনো কাজ নেই, এতগুলো লোক কী করে সারাদিন, আমি হিসেব চাই, ছোটকর্তার অসুখ বলে সবাই ফাঁকি দিতে আরম্ভ করেছে নাকি?
তারপর ভূতনাথকে ডেকে বললে—সেজেগুজে তৈরি হয়ে নে—আমার সঙ্গে যাবি তুই ভূতনাথ!
ভূতনাথের কেমন ভয় করতে লাগলো। বললে—কোথায়?
—বরানগরে।
ভূতনাথ কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু বংশী চুপি-চুপি বললে— বলুন-হ্যাঁ, যাবো।
বাইরে এসে ভূতনাথ বললে—বৌঠান কি কিচ্ছু জানে না বংশী? বাড়ি বিক্রি হবার কথা শোনেনি নাকি?
বংশী বললে—নেশা হলে আজ্ঞে কিছু মনে থাকে না ছোটমা’র। ওই যে গাড়ি বার করতে বললে আমাকে–তা কোথায় গাড়ি, বাড়ি যে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে, বিধু সরকার মেজবাবুর সঙ্গে যে কবে চলে গিয়েছে গরাণহাটায়, ছোটমা’র কিছু আর খেয়াল নেই শালাবাবু।
ভূতনাথ বললে—যদি আমাকে ডাকে আবার?
বংশী বললে—আর ডাকবে না শালাবাবু, ঘুমিয়ে পড়লেই সব ভুলে যাবে, কৈানো খেয়াল থাকবে না, দেখলেন না সে-রকম সাজ-গোজেরও বাহার নেই, কোথায় কী গয়না টাকাকড়ি আছে, তাও মনে থাকে না, ওই চিন্তা আলতা পরিয়ে চুল বেঁধে দিয়েছে, গা ধুইয়ে দিয়েছে তাই অমন দেখছেন—কিন্তু নিজের কিছু খেয়াল নেই।
ভূতনাথের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চায়। বৌঠান জানেও না বড়বাড়ির কী সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। জানতে চায়ও না বোধহয়। মনে হয়—সব তেমনি আছে বুঝি। তেমনি একান্নবর্তী পরিবার। তেমনি লোকজন, চাকর, ঝি, গাড়ি, ঘোড়া, পাল্কি, বেহারা, বাগান সব আছে। অন্দরমহলের পর্দার আড়ালে থেকেথেকে বাইরের জগতের কোনো খবরই রাখবার প্রয়োজন মনে করে না। ভাবে এখনও বুঝি দেউড়িতে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজ সিং বন্দুক নিয়ে। এখনও সুখচর থেকে টাকা আসে। এখনও হুকুম করলেই তামিল করবার লোক এসে হাজির হবে।
বংশী বলে—আমরা দুই ভাই বোনে দুজনকে দেখছি শালাবাবু, আমি দেখি ছোটবাবুকে আর চিন্তা দেখে ছোটমাকে। নেশার ঘোরে মাঝে-মাঝে কত বকে চিন্তাকে, বলে—আজকাল সবাই ফাঁকি দিচ্ছে কাজে—তা জানে না তো আমরা মাইনের লোভে কাজ করছি না এখানে—মাইনে যে কতদিন পাইনি তার তো হিসেব নেই।
—মাইনে না পেয়ে এ-রকম কতদিন চালাবে বংশী?
—আর জন্মে বোধ হয় ছোটবাবুর কাছে দেনা করেছিলাম আজ্ঞে। তাই শোধ করছি খেটে, দেশে যে কী করে সব চালাচ্ছে ভগমান জানে। বিয়ে করে এস্তোক কত বছর যে আর দেশে যাইনি, আমার শ্বশুর যেতে লিখেছে বার-বার, কী করে এ-অবস্থায় যাই বলুন তো। তা ছোটমাও আর বেশিদিন বাঁচবে না হুজুর, ওই নেশার ঘোরেই একদিন অজ্ঞান হয়ে দম বেরিয়ে যাবে, দেখবেন।
৪৫. ভোর বেলা ট্রেন
ভোর বেলা ট্রেন! সকাল-সকাল উঠতে হবে। ছোট টিনের বাক্সটা গুছিয়ে রেখেছে ভূতনাথ। বৌঠানের দেওয়া কাপড়জামা সব। বাক্সটা পরিষ্কার করতে গিয়ে ননীলালের সেই পুরোনো চিঠিটা তলায় এক কোণে পড়ে রয়েছে দেখলে। আশ্চর্য। সেই ননীলালই-বা কোথায় আজ! ধাপে-ধাপে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। নিজের দেশ, সমাজ ছেড়ে, স্ত্রী, আত্মীয়, স্বজন পরিত্যাগ করে কত দূরে গিয়ে রইল। কিন্তু কীসের আকর্ষণে? প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর হতে পেরেছে কি শেষ পর্যন্ত। দ্বারকানাথ যেমন নীল আর রেশমের কুঠি করেছিলেন, ননীলাল কি তেমনি পাট আর কয়লার সঙ্গে জীবনকে জড়িয়ে দিয়েছিল? আর তারপর? তারপরের পথ কি ননীলালের জানা আছে? ননীলালই বলেছিল—এ যুগের খৃস্ট, চৈতন্য আর বুদ্ধ হচ্ছে শেঠ, শীল আর মল্লিক। ভূতনাথ ভাবতে চেষ্টা করে—ননীলাল কি তার ইষ্টদেবতার সন্ধান আজ পেয়েছে? সে তো মেম সাহেবদের রূপের মোহে ভোলবার ছেলে নয়! সে তো বলেছিল একবার—মেয়েমানুষের নেশা এখন কেটে গিয়েছে ভাই, ও যে-বিন্দি, সে-ই মিসেস গ্রিয়ারসন—এখন কেবল চাই টাকা! টাকার নেশা কি তার মিটেছে! সে কি তৃপ্তি পেয়েছে? শান্তি পেয়েছে?
আবার মনে হয় হঠাৎ যেন জবা এসে ঘরে ঢুকেছে। ঘরে ঢোকবার সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত ঘরখানা যেন গন্ধে ভরে গেল। মাঘোৎসবের দিন যেমন করে সাজতে জবার তেমনি সাজ। শুধু মাথায় ঘোমটা, সিঁথিতে সিঁদুর। এইটুকু কেবল তফাৎ। দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়ে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। হাতে এক গেলাশ জল।
জবা বলে—আমায় ক্ষমা করো তুমি।
ভূতনাথ বললে—আমিই কি জানতাম?
—ছি, ছি, আমায় কিন্তু ক্ষমা করো তুমি।
ভূতনাথ বললে—কেন, তুমি আমার সংসারে এলে?
জবা বললে—সে উত্তর তো দিয়েছি আমি।
–শুধু সংস্কার, শুধু দুটো মন্ত্র আর একটা ষড়যন্ত্রের জন্যেই তোমার দুর্ভোগ, নইলে তোমার জীবন তত অন্য রকম হতো—তাতে তুমি সত্যিকারের সুখী হতে হয় তো।
জবা বলে-বার-বার তুমি কেন একথা বলো?
ভূতনাথ বলে—সত্যি বলছে জবা?
-সত্যি না তো কি মিথ্যে? মিথ্যে তো বলি না আমি, তুমি আমায় বিশ্বাস করে, কোনো দুঃখ নেই আমার।
-কিন্তু এ-কথা তোমায় কে বলতে শেখালে জবা?
-এ-কথা আমি জ্ঞান হওয়া থেকেই শিখে এসেছি যে, ঠাকুমা’র সঙ্গে কত শিব পূজো, কত ব্ৰত করেছি, কত ঠাকুর প্রণাম করেছি, ঠাকুমা যে আমায় সব শেখাতো।
–কিন্তু সুপবিত্র, তাকে ভুলতে পারবে তো?
সঙ্গে-সঙ্গে জবার হাত থেকে জলের গেলাশটা ঝনাৎ করে মাটিতে পড়ে ছত্রখান হয়ে গেল। সে-শব্দে ভূতনাথেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছে। চোরকুঠুরির মধ্যে চোখ মেলে ভূতনাথ দেখে সে একলা অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে। কেউ কোথাও নেই। শেষ রাতের নিস্তব্ধ কলকাতা শহর। রাস্তায় কয়েকটা ঠেলাগাড়ি চলার শব্দ শুধু। আর রাস্তায় বুঝি জল দেওয়া হচ্ছে। দু একজন বুঝি জাগছে। ওপাশে অনেক দূর থেকে গঙ্গার বুকের ওপর একটা জাহাজের বাঁশী বেজে উঠলো। হয় তো জাহাজের বাঁশী নয়, জুটমিলের। কারখানা হয়েছে অনেক ওদিকে। হয় তত বা ননীলালেরই জুটমিল। কে জানে।
