সেদিন সরকারবাবু বললে—আসুন, আসুন ভূতনাথবাবু, কী কপালই করে এসেছিলেন—একেবারে দশাসই কপাল মশাই।
—কেন, কী হলো?
–আর কী হবে, নিন, এখানে সই করুন।
—এ কী?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, এবার থেকে ওভারসিয়ারদের খাতায় আপনার নাম উঠেছে। বলেছিলাম না আপনাকে, আপনি কি আর বেশি দিন বিলবাবু থাকবেন? তা এমন কপাল দেখলেও আনন্দ হয়, মশাই! বাবুর নিজের হুকুম—দেখছেন কি, সই করুন।
বারো টাকা থেকে একেবারে কুড়ি টাকা। সমস্ত শরীরে কেমন রোমাঞ্চ হয় ভূতনাথের। সরকারবাবু বললে–কালীঘাটে গিয়ে মায়ের পূজো দিয়ে আসবেন আগে, ওই বিপিনবাবু, বিজয়বাবু আজ তিন বচ্ছর বিলবাবুই রয়ে গেলেন, একটি পয়সা মাইনে বাড়লো না আর আপনার তো পোয়াবারো।
সরকারবাবুর কথাগুলো ঠিক নিছক উল্লাস প্রকাশ নয়। তবু সব সহ্য করাই ভালো।
ভূতনাথ বললে—আমার সেই ছুটির দরখাস্তখানার কী হলো?
—ছুটি তো আপনার হয়ে গিয়েছে, সাত দিনের তো—কবে থেকে যাচ্ছেন? আপনার হলে গিয়ে সবই স্পেশ্যাল ব্যাপার আপনার ছুটি আটকায় কে, বলুন?
ইদ্রিসও খুব খুশি হয়েছে। বলে—তা হোক ওভারসিয়ারবাবু, এবার যেন আর আপনার দস্তুরি ছাড়বেন না তা বলে-ইঞ্জিনিয়ার বাবুরা পর্যন্ত নেয়, আর আপনার নিলেই দোষ। বলে—মাসে যদি পাঁচ টাকাও হয় তো বছরে কত হলো ইয়ে হিসেব করুন।
ভূতনাথ বলে—চাকরিটা থাকলেই বাঁচি ইদ্রিস, কত কষ্টের চাকরি তা তুমি জানবে কী করে!
অথচ এই কলকাতায় আসবার জন্যে একদিন ছোটবেলায় মিত্তিরদের টিপ-চালতে গাছের ডগায় উঠেছিল ভূতনাথ। কিন্তু সেই স্বপ্নের কলকাতার সঙ্গে তার চোখে-দেখা কলকাতা কি মিলেছে। হয় তো মিলেছে কিম্বা হয় তো মেলেনি। কিন্তু মনে হয় এখানে না এলে সে বুঝি মানুষের মহাযাত্রার মিছিল এমন স্পষ্ট করে দেখতে পেত না। সেই ব্রাহ্মসমাজ, সেই ভারত-সভা, সেই উনবিংশ শতাব্দীর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দিয়ে আজ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে মহাযাত্রা শুরু হয়েছে তার পরিচয় পেতো না। জানতে পেতো না কেমন করে ধীরে-ধীরে মানসলোকের সঙ্গে মর্তলোকের সমন্বয় সাধন হয়। কেমন করে সনাতন শাশ্বত ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আজ ভূতনাথ জানতে পেরেছে মানুষেমানুষে কোনো বিচ্ছেদ নেই। সমস্ত মানুষ এক জাত। তাই একের পাপের শাস্তি অন্যকে গ্রহণ করতে হয়, প্রবলের উৎপীড়ন দুর্বলকে সহ্য করতে হয়। একজনের পাপের ফল সকলকে ভাগ করে নিতে হয়। অতীতে ভবিষ্যতে, দূরে দূরান্তে, হৃদয়ে-হৃদয়ে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে অভিন্ন। এ-ও কি কম শিক্ষা। তাই সুবিনয়বাবু বলতেন—’বিশ্বানি দুরিতানি পরাসুব’। বিশ্বপাপ মার্জনা করো। আজও ভূতনাথ তাই তার মেসের ঘরটার মধ্যে ভাঙা তক্তপোশের ওপর শুয়ে প্রার্থনা জানায়—যে-দেবতা সকল মানুষের দুঃখ গ্রহণ করেছেন, যার বেদনার অন্ত নেই, যার ভালোবাসারও অন্ত নেই, তার ভালোবাসার বেদনা যেন সমস্ত মানব সন্তান মিলে গ্রহণ করি। তাই তো মনে হয় যেখানে প্রেম সব চেয়ে গভীর, আঘাত বুঝি সেইখানেই সব চেয়ে নিষ্ঠুর হয়ে বাজে। যার হৃদয় কোমল, তাকেই সমস্ত বেদনা বইতে হবে। যাদের গায়ে পুলিশের লাঠি লাগে তাদের বেদনা তত কঠিন নয়, কিন্তু ঘরের কোণের পটেশ্বরী বৌঠানের আঘাতই যেন সব চেয়ে করুণ, সব চেয়ে কঠিন। শহরে না এলে কি এমন করে এই পরম সত্যকে কখনো জানতে পারতো ভূতনাথ।
৪৪. ছোটবৌঠান সেদিন কী রাগই করেছিল
ছোটবৌঠান সেদিন কী রাগই করেছিল যে। বললে— একদিন তুই ‘মোহিনী-সিঁদুর’ কিনে দিয়েছিলি তাই ছোটকর্তাকে ফিরে পেয়েছি—কিন্তু আর কোনো দিন কোনো জিনিষ চেয়েছি তোর কাছে?
ভূতনাথ অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বৌঠান আবার বললে—শুধু তোর কাছে কেন, কারো কাছেই আর কোনোও দিন কিছু চাইব না ভূতনাথ—চাওয়ার দিন আমার ফুরিয়ে গিয়েছে, এবার ছোটকর্তার অসুখটা ভালো হয়ে গেলেই আমি সুখী, আর কিছু কামনা নেই আমার, তোরা সবাই বেইমান।
ভূতনাথ তবু চুপ করে রইল।
তারপর বৌঠান আবার বলেছিল—তোর যদি কোনো কষ্ট হয়ে থাকে, আমাকে বলিসনি কেন? এখানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো অসুবিধে হচ্ছে? শোয়া-থাকার কোনো অসুবিধে?
ভূতনাথ তবু চুপ করে রইল! আজ বৌঠানের মুখের যেন বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। চোখ দুটো লাল জবাফুলের মত। সারাদিন ধরে বোধহয় মদ খেয়েছে। বিছানার ওপর পা ছড়িয়ে বসে আছে। পায়ে আলতা পরেছে। এখনি এই বিকেলবেলা বুঝি খোঁপা বেঁধেছে। পাতা কেটেছে। কপালে সিঁদুরের টিপ লাগিয়েছে। নাকে হীরের নাকছাবি। বৌঠানের সুডৌল শরীর যেন টলোমলো করছে নেশার ঘোরে।
অথচ কী এমন বলেছিল ভূতনাথ! ভূতনাথ শুধু বলতে এসেছিল-সে দেশে যাবে।
কেন দেশে যাবে, ক’দিনের জন্যে যাবে তা না জেনেই অনেক গুলো কথা শুনিয়ে দিলে বৌঠান।
বৌঠান বললে—কেউ তোকে কিছু বলেছে? আমি যতদিন আছি কেউ তোকে কিছু বলুক দিকি? দারোয়ান দিয়ে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবো না এখনি—এ-বাড়িতে হাজার গণ্ডা লোক রয়েছে কী জন্যে? বসে-বসে তত সব মাইনে খাচ্ছে—বড়বাড়ির কর্তারা কি মরেছে। তারপর চিৎকার করে ডাকলে-বংশী
বৌঠানের চিৎকার সমস্ত ফাঁকা বাড়িটায় যেন একবার প্রতিধ্বনি তুললো।
বংশী এল। বৌঠান বললে–সরকার মশাইকে বলগে যা, ভূতনাথের জন্যে জামা-কাপড় যা দরকার যেন সরকারী তহবিল থেকে দেয়, আর আমার নামে খরচার খাতায় লিখে রাখে।
