সমস্ত স্বপ্নটা আবার পুরোপুরি ভেবে দেখতে লাগলো ভূতনাথ সত্যি এ কেমন করে হয়। ভূতনাথেরই মনগড়া কথাগুলো জবার মুখ দিয়ে যেন বলিয়ে নিয়েছে সে। কিন্তু আশ্চর্য কথা আট-ন’ বছর পর্যন্ত জবা ছিল বলরামপুরে, তার মধ্যে একবার জানতেও পারলো না!
সুবিনয়বাবুকে জবার ঠাকুমা পরে আর একটা চিঠিতে লিখেছেন —“তোমাকে লুকাইয়া এ চিঠি লিখিতেছি, উনি জানিতে পারিলে অনর্থ বাধাইবেন। কিন্তু এখানে কাহাকেও জানানো হয় নাই। কেবল পাত্র পক্ষ জানে আর পুরোহিত মশাই জানেন। জানি না জবার কপালে কত দুঃখ আছে। উনি সদা-সর্বদা জবাকে চোখেচোখে রাখেন, বাড়ির বাহিরে যাইতে দেন না, পাছে তুমি বা তোমার লোক হরণ করিয়া লইয়া যাও। জবার শ্বশুরবাড়ি লোকেরা আর একদিনও আসে নাই, নিতান্ত অনিচ্ছার বিবাহ বলিয়া তাহারাও আর খোঁজ করেন না। আমরা লোক পাঠাঁইয়াছিলাম,কিন্তু শুনিলাম পাত্রের পিতার মৃত্যু হইয়াছে—বাড়িতে শুধু একমাত্র পিসীমা আছে”।
পরে আর একটা চিঠিতে লিখেছেন-“বাবা, তোমার পত্র পাইলাম, অনেকদিন সংবাদ না পাইয়া বড় মনোকষ্টে ছিলাম, আমার কপালে অনেক দুঃখ ছিল তাই তোমার মতন সন্তান পাইয়াও নিকটে থাকিতে পারি না, জবা ভালো আছে, জবার শরীর ভালো আছে—জবাকে আশীর্বাদ করিতেছি সে সুখী হইবে। মায়ের ইচ্ছায় যাহা হইয়াছে, তাহার তো আর নড়চড় নাই—সুতরাং সকলই তাহার ইচ্ছা বলিয়া জানিবা…”
এই রকম অনেকগুলো চিঠি লিখেছেন সুবিনয়বাবুর মা। নিজে লিখতে জানতেন না তাই গোপনে পাড়ার কোনো লোককে দিয়ে লিখিয়েছেন। আর সুবিনয়বাবু সমস্ত চিঠিগুলো সযত্নে রক্ষা করে এসেছেন আজ পর্যন্ত।
আর একটা চিঠিতে একবার ঠাকুমা লিখেছিলেন—“শুনিলাম পাত্র পক্ষ সংবাদ পাইয়াছে জবা আমার নাতনী হইলেও, হিন্দু-কন্যা নহে। এই সংবাদ লোকমুখে পাইবার পর তাঁহারা বড়ই অসন্তুষ্ট হইয়াছেন, তাহারা বলিতেছেন আমরা ঠকাইয়া জবার সহিত হিন্দু পাত্রের বিবাহ দিয়াছি…শুনিতেছি তাহারা নাকি আবার পুত্রের বিবাহ দিবেন…শুনিয়া অবধি মন খারাপ হইয়া আছে, কিছুই ভালো-মন্দ বুঝিতে পারিতেছি না। এখন মায়ের ইচ্ছার উপরই সমস্ত নির্ভর করিতেছে, আমরা অবোধ মনুষ্য মাত্র, মায়ের লীলা বুঝিবার শক্তি আমাদের নাই—অহরহ মাকে ডাকিতেছি, এখন মা যা করেন।”
ভোরবেলা ট্রেন। সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেই রওনা দিয়েছে ভূতনাথ।
বংশী বলেছিল—কবে আসছেন আবার?
ভূতনাথ বলেছিল—কাল, নয় তো পরশু ঠিক।
তা শেয়ালদ’ স্টেশনে যখন পৌচেছে ভূতনাথ তখন বেশ সকাল। ট্রেন ছাড়তে দেরি আছে। ধীরে-সুস্থে টিকিট কেটে ট্রেনে গিয়ে বসার সময় আছে। চারদিকে ঝাঁট দেওয়া চলেছে। ট্রেনে গিয়ে পৌঁছুবে মাঝদে’তে সেই বিকেল নাগাদ। তারপর ফতেপুর। সোজা হাঁটা রাস্তা। মাঝখানে শুধু ইছামতি নদী পার হওয়া। তা নদীতে খেয়া আছে। গ্রামে পৌঁছুতে সেই যার নাম রাত। সন্ধ্যে হতে-না-হতে নিশুতি হয়ে যাবে সব।
বড় জোর বারোয়ারিতলায় নিতাই ঘোষের দোকানে টিম-টিম করে রেড়ির তেলের দেয়াল গিরিটা তখনও জ্বলছে। রাস্তায় অত রাতে পায়ের শব্দ পেয়েই নিতাই হয় তো চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করবে
-কেনা যায় গো?
—আমি নিতাই, আমি—বলবে ভূতনাথ।
—আমি কেডা, বাড়ি কনে?
–ওরে, আমি ভূতো।
–ওমা, ভূতোদা’—কী সর্বনাশ কবে ফিরলে?
নন্দজ্যাঠাও খুব অবাক হয়ে যাবে বৈকি! উঠোনের ধারে সেই আতাগাছটার ধারে গিয়ে ডাকবে—জ্যাঠাইমা-–ও জ্যাঠাইমা–
নন্দজ্যাঠা হয় তো তখন অকাতরে ঘুমোচ্ছ আট চালায়। জ্যাঠাইমা অত সকালে শোয় না। তখনও হয় তো কথা সেলাই করছে, নয় তো সলতে পাকাচ্ছে পিদিমের। ডাক শুনে সেখান থেকেই বলবে—কে ডাকে গাকে তুমি?
-আমি ভূতত, জ্যাঠাইমা।
-ওমা, ভূতো, কোত্থেকে—বলেই মরি-বাঁচি করে ছুটে আসবে, পিদিমটা হাতে নিয়ে। বলবে—ওমা, দেখোদিকি, একটা খপর দিতে হয় তো। আয়-পা ধো এখেনে, এই জলচৌকিতে বোস, ঘটিতে জল আছে। থাক-থাক, হয়েছে, ভালো আছিস তো?
জ্যাঠাইমা’র পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকাবে ভূতনাথ। তারপর জিজ্ঞেস করবে-জ্যাঠা কোথায়? ঘুমুচ্ছে বুঝি?
হাত পা মুখ ধুয়ে, ভূতনাথ বসবে বোয়াকে। ওই বাঁধানো বোয়াকে বসেই কতদিন রাধার সঙ্গে গল্প হয়েছে ছোটবেলায়। কতদিন গল্প করতে-করতে রোয়াকের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শেষে জ্যাঠাইমা এসে ডেকে দিয়েছে।-ওরে ভূতো, তোর পিসী ডাকছে, ঘরে গিয়ে শুগে যা।
সে কতকাল আগের কথা। সমস্ত গ্রামটা যেন চোখের ওপর ছবির মতন ভেসে ওঠে। গাঙে যাবাঃ পথে বটগাছের বুরি ধরে কতদিন দোল খেয়েছে ভূতনাথ। আম কুড়িয়েছে কত বাদলের রাতে। কত যে আম! ধামা ধামা। কাঁচা আমগুলো মাটিতে পড়ে ফেটে চৌ-চাকলা হয়ে যেত। সে-আম পাতা পেতে তক্তপোশের তলায় সাজিয়ে রাখতে পিসীমা। বলতো-বোটাঅলা আমগুলো আমায় দে—দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
রাত্তির বেলায় বাঁশঝাড়ের সেই মড়মড় শব্দ। চারদিক নিস্তব্ধ, কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ মড়মড়মড় শব্দে একটা বাঁশ দুলে উঠলো আগাপাশতলা। পিসীমা বলতো-ও ভূতের বাঁশ–বাঁশে ভর দিয়ে ভূত মাটিতে নামলো।
সন্ধ্যেবেলা রান্নাঘরের দিকে যেতে কী যে ছমছম করতে গা’টা। কিন্তু সকাল বেলা আবার যে-কে সেই। মধু কেরষাণ গরু-বাছুর চরাতে তারই তলা দিয়ে মাঠে চলেছে। হাতে লাঠি। সেই রকম একটা তেলালো লাঠির জন্যে কত খোশামোদ করেছে মধু কেরণকে। অথচ কত সামান্য জিনিষ!
