-খুব চিনি। বলরামপুরের কালী মুখুজ্জের ছোট মেয়ের বিয়ে দিলাম আমি—তারই কাণ্ড তো বলছি।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—বলরামপুরের রামহরি ভট্টাচার্যের নাম শুনেছো?
–রামহরি ভট্টাচার্যি? দাঁড়ান, খাতা খুলতে হবে বলে সত্যি-সত্যিই খাতা খুলতে গেল প্রকাশ।
ভূতনাথ বললে—না, না, খাতা খুলতে হবে না এখন, তার বংশের কেউ আছে এখন জানো?
প্রকাশ বলে—খাতা না দেখে সে কি বলতে পারি ঠাকুরমশাই, আর এ-খাতায় যদি না থাকে তো অন্য খাতা দেখতে হবে, বংশতালিকা না রাখলে চলবে কেন আমাদের, যে-ব্যবসার যা নিয়ম, এ-খাতাতে আপনারও পূর্বপুরুষের নাম-ধাম মিলে যেতে পারে, তেমন করে খাতা রাখতে পারলে কত উপকার দেয়, এই দেখুন না, কালী মুখুজ্জের মেয়ের মাত্তর দু’মাস বয়েস সবে, বললেন—পাত্তোর খুঁজে দিতে হবে—কুলীন পাত্তোর—পারবে?
আমি বললাম—এ আর বেশি কথা কি—তা তিনি একটা টাকা দিলেন রাহা-খরচা।
–দু’ মাসের কনে?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, প্ৰেথম মেয়ের বিয়ে নিয়ে এক কাণ্ড হয়ে গিয়েছিল কিনা—মেয়ের যখন পাঁচ বছর বয়েস সেই সময় চুরি হয়ে গিয়েছিল মেয়ে—এক ভঙ্গ কুলীন চুরি করে নিয়ে গিয়ে তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কিনা—সেই ভয়েই এই মেয়েরও বয়েস বাড়বার আগেই বিয়ে দিচ্ছেন।
একাশ বেশ জমিয়ে গল্প বলতে পারে। কিন্তু রাত হয়ে গিয়েছে। বড়বাড়িতে ফিরতে হবে। এতক্ষণ হয় তো বংশী অপেক্ষা করে-করে শুয়ে পড়েছে। ভাত ঢাকা আছে চোরকুইরিতে। গেট-এর চাবি খুলে অন্ধকারে ঢুকতে হবে। আজকাল ও-বাড়িকে বাইরে থেকে যেন অন্ধকার ভূতের বাড়ি মনে হয়। কিন্তু একবার চোরকুরির ভেতর ঢুকতে পারলে আর কিছু মনে থাকবে না। আজকাল সমস্ত মনটা জুড়ে বসে আছে জবা। জবাকে নিজের ঘরের মধ্যে কল্পনা করে নিয়ে অনেক সম্ভব-অসম্ভব ঘটনা ঘটানো যায়। মনে করে নেওয়া যায়—সেই জবা তার এই চোরকুইরিতে এসেছে। এসে হয় তো তারই বিছানায় বসেছে। এক সময়ের মনিব, আজ তার স্ত্রী—ভাবতেও যেন শিউরে ওঠে সমস্ত শরীর। কতদিন কতভাবে কত অপ্রিয় কথা বলেছে। পাড়াগেঁয়ে বলে কত ঠাট্টা করেছে তাকে। জবার ছোঁয়া হাতের রান্না পর্যন্ত কখনও খায়নি ভূতনাথ। অথচ…
অন্ধকার রাত্রে মনে হয় যেন জবার শাড়ির খসখস শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। যেন জবার চুলের গন্ধ ঘরের বাতাসে ভাসছে।
তারপর সত্যি-সত্যিই ভূতনাথ চোরকুঠুরির শক্ত তক্তপোশটার ওপর চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করে। সমস্ত রাত্রিটা একরকম অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে কাটে। মাথার মধ্যে সমস্ত যেন গোলমাল হয়ে যায়। মনে হয় সমস্ত ঘটনাটা যেন স্বপ্ন। স্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য, অসম্ভব, অলৌকিক।
পরদিন বংশীও অবাক হয়ে গিয়েছে। বংশী বলে—এ কি, আপনি যে বললেন আজ দেশে যাবেন?
ভূতনাথ বললে-যাওয়া আর হলো কই? মামলার দিন পড়লো কাল। ছুটুকবাবুর কাছে গিয়েছিলাম—সমস্ত দিন তাইতেই নষ্ট হলো।
-কী হলো মামলার?
ভূতনাথ বলে—আমি কেঁদে গিয়ে পড়লাম ছুটুকবাবুর কাছে, বললাম আপনি ‘দিন’ নিয়ে নিন, নইলে বড়বাড়িরই বদনাম, যদি ওরা পুলিশ-পেয়াদা দিয়ে বাড়ি দখল করে সে কি তখন ভালো হবে?
–দিন পড়লে কবে?
ভূতনাথ বললে—সে আবার একমাস পরে শুনানি হবে, তখন যা হয় ভাবা যাবে। এখন তো চিঠি লিখে দেওয়া হয়েছে ননীলালের কাছে, ছুটুকবাবু পুরানো বন্ধু, এ-কথাটা কি আর রাখবে না তার। কত টাকাকড়ি নিয়েছে এককালে ছুটুকবাবুর কাছে, মনে আছে তার নিশ্চয়ই।
বংশী বললে—যাই, খবরটা একবার দিয়ে আসি ছোটবাবুকে ঝপ করে, বড় ভাবছিলেন ক’দিন আজ্ঞে।
—কিছু বলেন নাকি?
-না, বলেন না কিছু, কেবল আকাশের দিকে চেয়ে চুপ করে ভাবেন সারাদিন, আমি তো বুঝতে পারি সব—শুনলে খুশি হবেন খুব।
—আর ছোটমা, ছোটমা ভাবছেন না?
বংশী বলে—ছোটমা’র ওসব ভাবনা নেই শালাবাবু, ছোটমা’র কেবল ঠাকুরপুজো আর ওই…
-মদ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, এখন আর কামাই দেন না আজ্ঞে, যতদিন যাচ্ছে তত বাড়ছে যেন, কেন যে এমন দশা হলো, ভগমান জানে।
ভূতনাথও আর যেন ভেবে ঠিক করতে পারে না। কেন এমন হয়। তবু সুবিনয়বাবুর কথাগুলো বারবার মনে পড়ে—তিনি বলতেননিজেকে ছোট বলে ভাবছি বলেই, ছোট চিন্তায়, ছোট বাসনায়, মৃত্যুর বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকছি বলেই হয় তত জীবনের অমৃতরূপ প্রত্যক্ষ হচ্ছে না। তাই বুঝি শরীরে দীপ্তি নেই, মনে নিষ্ঠা নেই, কাজে ব্যবস্থা নেই, চরিত্রে শক্তি নেই। জগৎজোড়া নিয়মের সঙ্গে, শৃঙ্খলার সঙ্গে সৌন্দর্যের সঙ্গে মিল হচ্ছে না কারো। মনে হয়—তাই বুঝি মৃত্যুকেই চরম ভয় বলে মনে করি, ক্ষতিকেই চরম বিপদ বলে ধারণা করি। শ্রম বাঁচিয়ে চলি, নিন্দা বাঁচিয়ে চলি কিন্তু সত্যকে বাঁচিয়ে চলি না, ধর্মকে বাঁচিয়ে চলি না, আত্মার সম্মান বাঁচিয়ে চলি না। অথচ চোখের সামনে ব্ৰজরাখালকে দেখেছে, সুবিনয়বাবুকে দেখেছে—তবু তাদের মতন প্রাণমন খুলে কেন বলতে পারে না—আমি ধ্বংসকে স্বীকার করবে না, এই মৃত্যুকে মানবব না—আমি অমৃতকে চাই—নমস্তেহস্তু!
সেদিন রূপচাঁদবাবু জিজ্ঞেস করছিলেন—ওদিকে আর গিয়েছিলেন নাকি, সুবিনয়বাবুর বাড়ি? জবা-মা কেমন আছে?
ভূতনাথ বললে—দু’তিন দিন যাইনি—তবে ভালোই আছেন।
রূপচাঁদবাবু বললেন—আমি যাবো-যাবে করেও যেতে পারছি, কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, কোনো অসুবিধে হলে আমায় বলবেন, লজ্জা করবেন না যেন জবা-মা’র হয় তো বলতে লজ্জা হতে পারে।
