–কোন্ বাবু? ছোটবাবু না বড়বাবু?
—যে-কোনো বাবু।
দারোয়ান বললে—এই কাগজটাতে নাম-ঠিকানা লিখে দিন, ভেতরে নিয়ে গিয়ে দেখাবো বাবুদের।
কাগজে ভূতনাথ নিজের নাম আর বড়বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলে।
দারোয়ান কাগজ নিয়ে ভেতরে চলে গেল। অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে ভূতনাথকে। মনে হলো—বৌঠানের জন্যেই এই চেষ্টা। নইলে বড়বাড়ির জন্যে ভূতনাথের কীসের মাথাব্যথা। আজ যদি মামলার ফলে বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়, কোথায় যাবে বৌঠান! অথচ আশ্চর্য, বৌঠান বোধহয় সে-কথা একবার ভাবেও না। বংশীর কাছে শুনেছে আজো নাকি তেমনি তেতলার ঘরখানার মধ্যে পালঙে বসে বৌঠান যশোদাদুলালের পূজো দেয়, আলতা পরে, ঘুমোয়, চিন্তার সঙ্গে গল্প করে আর একটা-একটা করে গয়না তুলে দেয় বংশীর হাতে।
বংশী বললে—সমস্ত সিন্দুক প্রায় খালি হয়ে গিয়েছে শালাবাবু!
ভূতনাথ বলেছিল—তুই কেন এনে দিস বংশী?
বংশী বলে-ভুবন স্যাকরা তো সন্দেহ করে আমাকে, জানেন, ভাবে বুঝি চোরাই মাল। সেদিন আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছিলো হুজুর। আমি বললাম—চোরাইমাল যদি হবে তো রোজ-রোজ এত চুরি করবে কোখেকে?
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—এখন কতখানি করে খায় রোজ?
বংশী বলে—বাড়ছে হুজুর, দিন-দিনই নেশা বাড়ছে যে, এখন সকালে একবোতল আনি, দেখি বিকেলের মধ্যে সেটা শেষ হয়ে গিয়েছে—আবার আজকাল দামী-দামী মদ আনতে বলেন—আমি প্রথম-প্রথম আনতুম না আজ্ঞে, কিন্তু বুঝতে পারি, বড় কষ্ট হয় ছোটমা’র, না-খেলে শরীর খারাপ হয়, কিছু খেতে পারে না, ঝিমোয় সারাদিন-ঝিম মেরে থাকেন। আমার নিজেরই তখন কষ্ট হয়, ভারী নেশা করে ফেলেছেন—ছোটমার’ই বা কী দোষ।
বংশী আবার বলে—সেজখুড়ি গজগজ করে সারাদিন, বলেখাবে না যদি কেউ তো রান্না কিসের জন্যে—এত ভাত নষ্ট হলে গেরস্থের অকল্যণ হয় যে। তা নেই-নেই যে এত—তার মধ্যেও কত কী যে রান্না হয় কী বলবোছোটবাবুর মুখের কাছে সব দিতে হবে, তেতো, ভাজা, ডালনা, ডাল, ঝোল, অম্বল, সেই আগেকার মতন—দেখছেন তো, কিন্তু মুখে পুরেই বলে—থুঃ থুঃ।
অথচ দেখুন, মুদির দোকানে দেনা হয়েছে। সেদিন তাগাদা করছিল। দু’মাস হয়ে গিয়েছে, এখনও শোধ হলো না, ওরা বলবেই তো–ছোটমাকে বললেই—সিন্দুক খুলে একটা কিছু-না–কিছু গয়না বার করে দিয়ে বলেদিগে যা শোধ করে।
ননীলালের বাড়ির সামনে তা প্রায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হলো।
দারোয়ান এক সময়ে ফিরে এসে বললে—দেখা হবে না। বাবুদের সময় হবে না এখন।
ভূতনাথ কী বলবে যেন ভেবে পেলে না। তারপর জিজ্ঞেস করলে-বাবুরা বাড়িতে আছেন?
দারোয়ান বললে—আছে, লেকিন মোলকাত হবে না।
হবে না তো হবে না। বড়লোকদের বাড়িতে নিয়মই আলাদা। হয় তত বসে গল্প করছে নয় তো শুয়ে আছে। দেখা করলে কী এমন অসুবিধে হতো! দুটো মাত্র কথা। কতটুকু সময়ই বা লাগতো। কিন্তু দরকার নেই। যাদের সময়ের অত দাম, একদিন তারাই আবার সময় কাটাবার পথ খুঁজে পাবে না। একদিন চৌধুরীবাবুদেরই কী হাঁক-ডাক কম ছিল! সবাই তটস্থ। কোথায় গেল সব। দেখতে-দেখতে, কপুরের মতো উবে গেল তো! সুবিনয়বাবু বলতেন-ভোগই মৃত্যু, ত্যাগই হচ্ছে জীবন-তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথাঃ, ত্যাগ করে ভোগ করতে শেখা এ ভারতবর্ষের নিজস্ব উপলব্ধি—এ আর কোনো দেশে খুঁজে পাবে না ভূতনাথবাবু। কিন্তু ননীলাল কি চৌধুরীবাবুরা কেউ তো সেকথা মানে নি। আর ব্ৰজরাখালের কথাই তো আলাদা।
রাস্তায় বেরিয়ে সেদিন হঠাৎ বহুদিন বাদে প্রকাশ ময়রার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কাঁধে নতুন গামছা। দাড়ি গোঁফ পরিষ্কার করে কামানো। চেহারাটাও যেন ভালো হয়েছে।
ভূতনাথকে দেখেই বললে-পেন্নাম হই ঠাকুরমশাই।
ভূতনাথ বললে-তুমি এত রাত্রে কোথায় প্রকাশ?
—আর ঠাকুরমশাই, ব্যবসাই বলুন, চাকরিই বলুন, কিছুই পোষালো না, শেষকালে সেই ঘটকালি নিয়েই আছি এখন। কাল আপনাদের দেশে যাচ্ছি, একটা বিয়ে আছে, যাবেন নাকি?
ভূতনাথের কেমন যেন একটা প্রশ্ন উঠলো মনের ভেতর।
-আচ্ছা, প্রকাশ তুমি তো এ-পর্যন্ত অনেক বিয়ে দিয়েছে, কী বলে?
—তা দিয়েছি ঠাকুরমশাই, এই খাতাখানা খুললে পাকা হিসেব বলতে পারি আপনাকে।
হিসেব দেখতে সেদিন চায়নি ভূতনাথ। হির্সেবের দরকারও ছিল না তার। শুধু বলেছিল–ছোট-ঘোট ছেলেমেয়ের বিয়ে কখনও দিয়েছো তুমি?
-আজ্ঞে হ্যাঁ, এই তো সেদিন, শ্রাবণ মাসে বেগমপুরের বিধু গাঙ্গুলীর ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলাম—মাত্র দু বছর বয়েস।
—দু’ বছর?
প্রকাশ দাস গল্প পেলে আর থামতে চায় না। বলে-দু’ বছর তো ভালো আপনার, দু’মাস বয়েসে বিয়ে দিয়েছি।
–দু’ মাস বয়েস কনের?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, দু মাস মাত্তোর—বাড়জে মশাই বলছিলেন, আমার দু’বছরের ছেলের জন্যে একটা পাত্রী দেখে দিতে পারে। প্রেকাশ? আমি বললাম—প্রেকাশের হাতে সব রকম পাত্তোর পাবেন বাড়জ্জে মশাই। তা তাই খুঁজে দিলাম, বাড়জ্জে মশাই খুব খুশি। খুব আয়োজন করেছিল আজ্ঞে, তিন রকমের মিষ্টি, চার রকমের মাছ, দু রকমের ডাল, পাকা ফলার, কাঁচা ফলার —সব রকম ব্যবস্থা ছিল। বাড়জ্জে মশায়কে চেনেন না আপনি–আপনাদেরই জেলার লোক তো?
প্রকাশ ময়রা সেই বিয়েরই গল্প করতে লাগলো। বলে–তবে শুনুন ব্যাপারটা—ভারী এক মজার কাণ্ডবলরামপুরের কালী মুখুজ্জের দুই মেয়ে ছিল, জানেন?
–বলরামপুর? বলরামপুর চেনো নাকি? ভূতনাথ সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছে।
