কিন্তু মনে আছে বহুদিন পরে যেবার বাঘের উপদ্রবের ভয়ে জঙ্গল কাটার হিড়িক পড়লো ফতেপুরে, দেখা গেল, সে-বটগাছের চিহ্নও নেই। কবে মাটি হয়ে সব শেষ হয়ে গিয়েছে, শুধু বড়-বড় গাছ সেই জায়গায় জন্মে এতদিন আড়াল করে রেখেছিল সেটাকে।
ছোটবাবুর দিকে চেয়ে দেখতে-দেখতে সেই কথাই ভূতনাথের মনে পড়লো প্রথমে।
বংশী বললে—শালাবাবু রয়েছেন, আদালতে যাওয়া, তদ্বিরতদারক করা, সবই করবেন উনি। আপনি ভেবে-ভেবে শরীর খারাপ করবেন না আজ্ঞে।
ছোটবাবু শুনে কিছু বললেন না। শুধু মুখ দিয়ে শব্দ করলেন–হুম।
কী গম্ভীর সে শব্দ। মনে হলো যেন সঙ্গে-সঙ্গে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাসও পড়লো তার।
বেরিয়ে এসে বংশী বললে—দেখলেন তো শালাবাবু, কী মানুষ কী হয়েছে!
ভূতনাথ কিন্তু কিছুই শোনেনি। শুধু দেখেছে ছোটকর্তাকে। আর মনে পড়েছে ফতেপুরের সেই বটগাছটার কথা। একদিন কত পাখী আশ্রয় নিয়েছিল তার ডালে-ডালে। বর্ষাকালে কত রকম পাখী আসতে ফল খেতে। তারপর যখন টলে পড়লে তখনও যেন সজীব। গাছে আগাছায় ভরে যখন জায়গাটা আবার ঢেকে গেল, তখনও যেন ভূতনাথ বটগাছটার কথা ভুলতে পারেনি।
বংশী বলেছিল—ছোটমা আপনার ওপর খুব রাগ করেছেন আজ্ঞে।
-কেন রে?
বংশী বললে—আপনি বলেছিলেন, বরানগরে নাকি একদিন নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে।
ভূতনাথ থমকে দাঁড়ালো একবার। বললে—আজ আর যাবো না রে, দেশ থেকে ফিরে একদিন নিয়ে যাবে, বলিস ছোটমাকে। বংশী বললে-কিন্তু ছুটুকবাবুর কাছে একবার যাবেন না?
দুপুরবেলা ছুটুকবাবু কোর্টে যায়। কোর্ট থেকে ফিরতে রাত হয় নিশ্চয়ই। ছুটুকবাবুর একটা চিঠি নিয়ে গেলে হয় তো কাজ হতে পারে। ম্যানেজারের কাছে শোনা ছিল সেদিন। এলগিন রোড-এর বাড়িতে কেউ থাকে না আজকাল। ননীলালের শাশুড়ী থাকেন পটলডাঙায়। তাকে যদি কোনো রকমে ধরা যায় তবে কাজ হতে পারে।
ভালোই হয়েছে। ভূতনাথের একবার মনে হয়-হয় তো ভালোই হয়েছে। এরও হয় তো প্রয়োজন ছিল। যখন দক্ষিণ দিক থেকে ঝাপটা এসে জানালা-দরজায় লাগে, একটা অদ্ভুত শব্দ হয় বাতাসের। থর-থর করে কেঁপে ওঠে সমস্ত। মনে হয়, বদরিকাবাবু যেন আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। ভূতনাথ দুই হাত দিয়ে কান দুটো বন্ধ করে। বড় কষ্ট হয় শুনতে। বদরিকাবাবুর হাসিতে যেন পৈশাচিক একরকম উল্লাস আছে। মনে হয়, ও শুনতে না পেলেই যেন ভালো। এক-একদিন আর সহ্য হয় না। রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে ভূতনাথ। দোকানপাট আলো লোকজন দেখে সব আবার ভুলে যেতে চেষ্টা করে।
তবু পটলডাঙায় ননীলালের বাড়ির সামনে গিয়ে কেমন সঙ্কোচ হতে লাগলো। কাল দেশে চলে যাবে ভূতনাথ। আজকে একবার শেষ চেষ্টা করা দরকার।
এ-বাড়িতে ননীলালের সঙ্গে আগে অনেকবার এসেছে। কিন্তু ননীলাল ছাড়া আর কারো সঙ্গে তো পরিচয় নেই তার। কাকে ডাকবে, কার কাছে আবেদন-নিবেদন জানাবে তার।
ছুটুকবাবুর কাছেও গিয়েছিল ভূতনাথ। এমন চেহারা দেখবে ছুটুকবাবুর ভাবতে পারা যায় নি। কালো কোট গায়ে। পুরোপুরি উকিলের পোক। ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামলো।
—এই যে ভূতনাথবাবু, রেওয়াজ কেমন চলেছে আজকাল? ছুটুকবাবুর গালে যেন আরো মাংস লেগেছে। পা-ও ভারী হয়ে গিয়েছে। হাঁটতে কষ্ট হয় বেশ।
এসে ধপাস করে বসে পড়লে চৌকির ওপর। সব শুনে বললে–সে হলে তো খুব ভালোই হতো—কিন্তু হচ্ছে কী করে?
ভূতনাথ বললে—ননীলালকে যদি একটা চিঠি লিখে দেন আপনি, তা হলে সে আর ‘না’ করতে পারবে না।
–ননীলাল!
ভূতনাথ বললে—ননীলালই তো মালিক—সে বললে সব হবে।
ছুটুকবাবু বলে—কিন্তু ননীলাল তত আর কলকাতায় নেই এখন, সে তত বাইরে।
—তা সেখানেই একটা চিঠি লিখে দিন।
ছুটুকবাবু কী যেন ভাবলে একবার। তারপর বললে-মামলা তো কাল। ওদিকে চিঠি যেতে এক মাস, আর আসতেও এক মাস—সে কি এখেনে? দু’ মাসের আগে তো আর তার উত্তর আসছে না।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু ননীলাল আসছে না কেন?
ছুটুকবাবু বললে—সে তত আর ফিরে আসবে না, জানেন না বুঝি?
—ফিরে আসবে না, সে কী?
–না, সে সেখানে মেম বিয়ে করে সুখে-স্বচ্ছন্দে আছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে, সে আর আসবে না-এখানে খবরও দিয়েছে। সেখানেও ব্যবস-ট্যাবসা শুরু করে দিয়েছে নাকি শুনেছি। তুখোড় ছেলে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিল ওর আদর্শ-বর্ণে-বর্ণে সব তাকেই ফলো করছে।
ভূতনাথ কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে রইল খানিকক্ষণ। কোথায় সেই কেষ্টগঞ্জের ডাক্তারের ছেলে ননীলাল! তার সেই চিঠিখানা বোধহয় এখনও আছে ভূতনাথের টিনের বাক্সে। শেষ পর্যন্ত যে ননীলালের এমন পরিণতি হবে, কে জানতো! অবাক লাগে ভাবতে! এখানেই তো সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারতো। অত বড় বাড়ি করেছিল এলগিন রোড-এ। অনু জুট মিল। অত কয়লার খনি। অত লোক-জন, অত আয়, অত খাতির। এতেও বুঝি তৃপ্তি হলো না তার। ননীলালদের বুঝি কিছুতেই তৃপ্তি নেই।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—ওর এখানকার কারবার কে দেখছে। তাহলে?
—ওর শালারা, চালু করে দিয়েছিল ননীলাল, এখন চলবে না কেন? না-চলবার কী আছে?
কোথাকার জল কোথায় গড়িয়ে যায় কে বলতে পারে। ননীলালের খবর শুনে ঠিক অবিমিশ্র আনন্দ যেন হয় না। কোথায় যেন একটু বেদনা লুকিয়ে থাকে। ঠিক প্রকাশ করে বলা যায় না কেন অমন হয়। অথচ ননীলালের এ-গৌরবে ভূতনাথের তত আনন্দ হবারই কথা!
ছুটুকবাবুর কাছ থেকে কোনো সাহায্যের আভাষ না পেয়ে ভূতনাথ নিজেই এসে পটলডাঙার বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়েছে। বাড়িটার আপাদমস্তক লক্ষ্য করে দেখলে। কোথাও কারো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। দারোয়ানকে ডেকে বললে—বাড়িতে বাবুরা আছে?
